প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: বিপ্লব নয়, সংহতিও নয়; প্রতিবিপ্লব ও প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্থান

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
৭ নভেম্বর ১৯৭৫। এই দিনে তৎকালীন সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতাগ্রহণ করেন। যদিও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপ্রতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ৬ নভেম্বর তারিখে খন্দকার মোশতাকের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির শূন্যপদে আসীন হন। একই সঙ্গে তিনি প্রধান সামরিক শাসক পদও অলংকৃত করেন। ফলে জেনারেল জিয়াউর রহমান ডেপুটি চিফ অফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনেস্ট্রেটর পদ দখল করেন। রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক শাসক পদে আসীন হলেও সেনানিবাস থেকে আগত সেনা প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। রাষ্ট্রপতি ছিলেন নামমাত্র। জেনারেল জিয়াউর রহমানের আকস্মিক ক্ষমতা গ্রহণের পেছনে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের দ্ব›দ্ব-সংঘাত, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জাসদের গণবাহিনী এবং কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের বোঝাপড়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছিলো। খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ২ নভেম্বর তারিখে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অফিসারদের চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছিলো তার ফলে খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু পদত্যাগের আগেই ১৫ আগস্টের ঘাতকদের ৩ নভেম্বরের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার পর খুনিরা ৩ তারিখেই দেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমায়। সেই অবস্থায় খালেদ মোশারফের নেতৃত্বাধীন সামরিক কর্মকর্তাগণ রাষ্ট্রক্ষমতায় কাদের প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেছিলেন। দেশের বেতার-টিভি বন্ধ থাকায় দেশে কী ঘটছিলো সে সম্পর্কে জনগণকে কোনো তথ্য ক্ষমতা গ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তাগণ দিতে পারছিলেন না।

দেশে একটা গুমট অবস্থা বিরাজ করছিলো। এই পরিস্থিতিতে জাসদের গণবাহিনী কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যুক্ত কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা ভিন্নভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সম্মুখে নিয়ে আসেন। সেনাবাহিনীর কর্মচারীদের মধ্যে জাসদের ব্যাপক প্রভাব ছিলো। তারা ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। দেশের অভ্যন্তরে তখন খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ক্ষমতার পালা পদলকে আওয়ামী লীগের যোগসাজশে ভারতীয়দের ক্ষমতা দখল হিসেবে প্রচার চালানো হতে থাকে। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরেও নানা বিভ্রান্তি ও অফিসার হত্যা এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে ক্ষমতা দখলের একটি পরিকল্পনা জেনারেল জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। ৭ নভেম্বরের ভোরেই সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জাসদ সমর্থিত সেনা গণবাহিনীর কর্মচারীদের হাতেই খালেদ মোশারফ এবং লে. এটিএম হায়দার নিহত হন।

জাসদ সমর্থিত সেনা গণবাহিনীর কিছু সদস্য এবং কিছু কর্মকর্তা সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমানকে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন করেন এবং ডেপুটি সামরিক চিফ শাসকের দায়িত্বে আসীন করেন। একই সঙ্গে সেনানিবাস থেকে ট্যাঙ্কসহ সেনাবাহিনীর অধস্তন এসব গণবাহিনীর সমর্থিত কর্মচারীরা বিপ্লবের  দিয়ে বেরিয়ে আসে। জেনারেল জিয়াউর রহমান কথা দিয়েছিলেন যে তিনি শহীদ মিনারে কর্নেল তাহেরে সঙ্গে এক সমাবেশে মিলিত হবেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত আসেননি। যদিও সারাদিন জাসদের গণবাহিনী নেতাকর্মী-সমর্থকগণ, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জাসদ সমর্থিত সেনা কর্মচারীদের সঙ্গে সেনা জনতা ভাই ভাই  দিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের আশেপাশে বেশ মহড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান দ্রতই জাসদের প্রতিশ্রæত অবস্থান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এ ব্যাপারে তিনি সেনা কর্মতাদের অনেকেরই সমর্থনও পান। তাছাড়া সেনা ছাউনিতে জাসদ সমর্থিত সেনা কর্মচারীরা বিপ্লবের নামে যেসব ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছিলো, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুযোগ বুঝে হত্যা, আক্রমণ এবং বাড়াবাড়ি করছিলো তারা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সুযোগ করে দেয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব দেওয়ার। তিনি সেই সুযোগে জাসদের স্বপ্নের বিপ্লব বিলাসিতার সঙ্গে ব্যবচ্ছেদ ঘটান, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রাথমিকভাবে নিজের অবস্থানকে সংহত করার উদ্যোগ নেন। এর পরেই জাসদের সঙ্গে তার মধুচন্দ্রিমার অবসান ঘটে।

তিনি উপ- প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা নিজের হাতে পুরোপুরিভাবে নিয়ে নেন। এরপর সামরিক শাসক হিসেবে তিনি জাসদকেও আর ছাড় দেননি। একের পর এক নেতাদের গ্রেপ্তার করতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী দিনগুলো ছিলো সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা তার বিশ^স্তদের সঙ্গে নিয়ে একদিকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যারা ১৫ আগস্টের হত্যার পর সেনাকমান্ড প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশকে ফিরিয়ে আনা এবং খালেদ মোশারফকে নিয়ে একসঙ্গে ২ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা দমনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের চাকরিচ্যুত করা, সামরিক আদালতে বিচার করা ও অনেককে মৃত্যুদ প্রদানে ভ‚মিকা রাখেন। বস্তুত ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরেও কোনো সংহতি, ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং আস্থার ভাব তৈরি করা হয়নি। অসংখ্য সেনাকর্মকর্তা নানা অভিযোগে নিহত হন, চাকরি হারান। গোটা সেনাবহিনী এক অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত কাটিয়েছিলো। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং দ্ব›দ্বই ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ৩০ মে তারিখে জিয়াউর রহমানের হত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সংঘটিত হয়েছিলো।

অন্যদিকে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে বিখ করা, জাসদকেও একইভাবে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া, প্রগতিশীল অন্যান্য সংগঠনগুলোর কণ্ঠরোধ করা ছিলো একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক সংগঠনকে রাজনীতি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বেশিরভাগ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, সিপিবি ও জাসদ নেতাকর্মী দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলানো হলো। রাজনীতিতে আদর্শের জায়গা কঠিন করে দেওয়া হলো। এরপর ১৯৭৮ সালে উগ্র ডান, বাম ও সুবিধাবাদীদের নিয়ে তিনি নিজেই রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নিজে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেন এবং ওই পদে আসীন হোন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে নিজের দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতিয়ে আনেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী জামায়াতসহ সকল নিষিদ্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলকে দেশের রাজনীতিতে ৭ নভেম্বর- উত্তরকালে তিনি ভিন্ন নামে ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত করতে থাকেন। গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনার সকল ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশকে কার্যত জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আদর্শের ধারায় পরিচালিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।

ওপরে ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে যেসব ঘটনা ঘটেছিলো, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে মৌলিকভাবে যেসব বিপরীত প্রবাহ সৃষ্টি করা হয়েছিলো তা পর্যালোচনা করে রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিপ্লব, ক‚টনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে যাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে তারা এর কি মূল্যায়ন করবেন? ৭ নভেম্বর তারিখে জিয়াউর রহমানকে যারা ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন তারা হঠকারী বিপ্লবী কিছু আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বিপ্লব সম্পর্কে তাদের কোনো ঐতিহাসিক জ্ঞান ছিলো না। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, হত্যা, সংঘাত, অপপ্রচার ইত্যাদি ঘটিয়ে কোনোদিন কোনো বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের জন্য থাকতে হয় সমাজ প্রগতির আদর্শের ধারার রাজনৈতিক প্রশিক্ষিত দল ও নেতৃবৃন্দ। যাদের বিপ্লব পরবর্তীকালে রাষ্ট্র সমাজকে বিপ্লব পূর্ববর্তীকালের পশ্চাৎপদতাকে কাটিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মৌলিক রূপান্তর ঘটানোর সুচিন্তিত পরিকল্পনা থাকে, জাসদের তা ছিলো না। জাসদ ভর করেছিলো সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কিছু কর্মচারীদের ওপর যারা রাজনীতি সচেতন ছিলো না। বিপ্লব সম্পর্কে তাদের কোনো প্রাথমিক ধারণা ছিলো না। সেকারণেই তারা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার পরে সিনিয়র কর্মকার্তাদের অমান্য ও হত্যা করার মতো উচ্ছৃঙ্খলতায় জড়িয়ে পড়েছিলো। একই সঙ্গে তারা ভারতবিরোধিতার  দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় ফেলে দেয়। একটা জুজুর ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে সেনানিবাসে হত্যাকা এবং বাইরে বিপ্লব বলে প্রচার করার মধ্যে রোমান্টিকতা, উন্মত্বতা, পৈশাচিকতার প্রকাশ পায়। সেই মুহূর্তে জাসদের গণবাহিনী এবং তাদের নেতৃত্বের ভ‚মিকা ছিলো গোটা পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।

জিয়াউর রহমানসহ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সেই পরিস্থিতিতে জাসদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু ১৫ আগস্টের পর থেকে ৭ নভেম্বর কিংবা তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছিলো তার সঙ্গে বৃহত্তর জনগণের সমর্থন বা অংশগ্রহণ ছিলো না। তাহলে কীভাবে ৭ নভেম্বরকে সৈনিক জনতা সংহতি দিবস বলা যায়? বিপ্লব তো অনেক পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিষয়। জিয়াউর রহমান ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। জাসদের রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো নৈকট্য ছিলো না। কর্নেল তাহের তাকে দিয়ে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে যে ‘তথাকথিত বিপ্লব’ সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন তা ছিলো স্বপ্নবিলাসী, অ্যাডভেঞ্চারিজম ধারা পরিচালিত। সেটি ৭ নভেম্বরের অপরাহ্ন থেকেই প্রমাণিত হয়ে যায়। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের পথেও হাঁটেননি, জাসদের বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি সামান্যতম দুর্বলতা দেখাননি। বরং তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে বাংলাদেশকে ১৮০ ডিগ্রি উল্টোপথে নিয়ে গেলেন। একারণেই এটি স্বাধীনতাবিরোধী পথ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন ছিলো।

তাই সেটিকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বিপরীত ধারায় দেশকে নিয়ে গেলেন। সেকারণেই ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়কে ইতিহাসের বিচারে প্রতিবিপ্লবের অধ্যয় হিসেবে দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। প্রতিবিপ্লব হচ্ছে বিপ্লববিরোধী কাজ। ৭ নভেম্বরের ক্ষমতা দখলের পর যা কিছু ঘটেছিলো তা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও মুুক্তিযুদ্ধবিরোধীকেই রাষ্ট্র রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সুতরাং ৭ নভেম্বর তারিখে জনতার সঙ্গে সৈনিকের কোনো সংহতি প্রকাশের অবকাশ ছিলো না। বিপ্লবের নাম যারা উচ্চারণ করেন তারা প্রতিবিপ্লবী ছাড়া আর কিছু হতে পারেন না।
লেখক : শিক্ষাবিদ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত