প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মানবপাচার চক্রের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

সুজন কৈরী: [২] রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ ও কসবা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে মানবপাচার চক্রের ৮ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- চক্রের মূলহোতা নাইম খান ওরফে লোটাস (৩১), তার সহযোগী নুরে আলম শাহরিয়ার (৩২), রিমন সরকার (২৫), গোলাম মোস্তফা সুমন (৪০), বদরুল ইসলাম (৩৭), খোরশেদ আলম (২৮), সোহেল (২৭) ও হাবিব (৩৯)।

[৩] শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর তুরাগ, উত্তরা, রমনা, পল্টন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় চক্রটির কাছ থেকে ১৪টি পাসপোর্ট, ১৪টি নকল বিএমইটি কার্ড, একটি সিপিইউ, একটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার, দুই বক্স খালি কার্ড, পাঁচটি মোবাইল ফোন, একটি চেক বই, পাঁচটি নকল সিল উদ্ধার করা হয়েছে।

[৪] শনিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩ অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, কয়েকজন ভুক্তভোগী র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে অভিযোগ করেন একটি চক্র তাদের ভ্রমণ ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে পাঠাতে চেয়েছিলো। কিন্তু বিএমইটি ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স কার্ড ছাড়া অবৈধভাবে বিদেশ যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে টাকা ফেরত চান তারা। তখন মানবপাচারকারী চক্র নকল বিএমইটি ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স কার্ড তৈরি করে ভিকটিমদের সরবরাহ করে। ওই নকল কার্ড নিয়ে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন করতে গেলে বিমানবন্দরে কর্তব্যরত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সদস্যরা কার্ড নকল হিসেবে শনাক্ত করেন এবং ভুক্তভোগীদের বিদেশ যাত্রা স্থগিত করেন। পরে ভিক্টিমরা চক্রটির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কোনও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি এবং ভিক্টিমদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

[৫] গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ও অনুসন্ধানে র‌্যাব জানতে পেরেছে, এইচএসসি পাস নাইম খান চক্রটির মূলহোতা। তিনি দুবাই প্রবাসী। চলতি বছরের মে মাসে তিনি দেশে ফিরেন। তিনি ২০১২ সালে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে দুবাই যান। সেখানকার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দুবাই শ্রম বাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা থাকায় দুবাইয়ের কিছু প্রতিষ্ঠান ভ্রমণ ভিসায় সেখান অবস্থানকারীদের ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে কাজের বৈধতা দেয়। ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নাইম মানবপাচারে জড়িয়ে পড়েন।

[৬] নাইম দুবাই ও বাংলাদেশে তার পরিচিতদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন। ভুক্তভোগীরা রাজি হলে দুই থেকে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ভ্রমণ ভিসায় দুবাই নিয়ে যান নাইম। তবে ভ্রমণ ভিসায় যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ কাজের সুযোগ পেলেও অধিকাংশই কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এভাবে নাইম সাত বছর ধরে পাঁচ শতাধিক মানুষকে দুবাই পাচার করেছেন। মানবপাচার থেকে অর্জিত অবৈধ উপার্জন দিয়ে তিনি দুবাইয়ে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেন এবং নিজে রেসিডেন্স ভিসার অনুমোদন নেন।

[৭] জিজ্ঞাসাবাদে নাইম জানিয়েছেন, দুবাইয়ে ফারুক নামে তার একজন সহকারী রয়েছে এবং গ্রেপ্তার নুরে আলম শাহরিয়ার বাংলাদেশে তার মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। শাহরিয়ার ভিক্টিমদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দেন। শাহরিয়ারের কসবা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় কম্পিউটার কম্পোজ ও ফটোকপির দোকান রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকেই ভিক্টিমদের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কিছু ভিক্টিম বিএমইটি ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স কার্ড ছাড়া বিদেশ যেতে অস্বীকৃতি জানালে শাহরিয়ারের মাধ্যমে বিএমইটি কার্ড জালিয়াত চক্র মানবপাচার চক্রের সাথে জড়িত হয়।

[৮] র‌্যাব-৩ এর সিও বলেন, বিএমইটি কার্ড জালিয়াত চক্রের মূলহোতা হাবিব এবং খোরশেদ। তারা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে নিজেদের আড়ালে রেখে বিশ্বস্ত লোকজনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের নকল বিএমইটি কার্ড সরবরাহ করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে নাইম বিএমইটি কার্ড ছাড়াই মানবপাচার করছেন। ভুক্তভোগীরা বিএমইটি কার্ড দাবি করলে শাহরিয়ার তার চাচা গ্রেপ্তার গোলাম মোস্তফা সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি একটি বিএমইটি কার্ড দেন। পরে নাইম ভিক্টিমদের বিএমইটি কার্ড সংগ্রহ করতে শাহরিয়ারের মাধ্যমে ১৩টি পাসপোর্ট গোলাম মোস্তফার কাছে হস্তান্তর করেন। গোলাম মোস্তফা ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে ১টি বিএমইটি কার্ড হিসেবে ওই পাসপোর্ট গ্রেপ্তার বদরুলের কাছে হস্তান্তর করেন। বদরুল ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ১টি বিএমইটি কার্ড হিসেবে ওই পাসপোর্ট খোরশেদের কাছে হস্তান্তর করেন। খোরশেদ ৬৫০টাকার বিনিময়ে ১টি বিএমইটি কার্ড হিসেবে ওই পাসপোর্ট গ্রেপ্তার হাবিবের কাছে হস্তান্তর করেন। হাবিব পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে জাল বিএমইটি কার্ড তৈরি করেন। এরপর জাল বিএমইটি কার্ড খোরশেদ ও বদরুলের হাত হয়ে সুমনের কাছে পৌঁছায়। গ্রেপ্তার রিমন শাহরিয়ারের নির্দেশে জাল বিএমইটি কার্ড সুমনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে মূলেহোতা নাইমের কাছে পৌঁছে দেন। নাইম ফ্লাইটের আগে ভিক্টিমদের কাছে জাল বিএমইটি কার্ড সরবরাহ করেন।

[৯] গ্রেপ্তার সোহেল স্থানীয় দালাল হিসেবে কাজ করেন। জাল বিএমইটি কার্ড তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে হাবিব জানান, তিনি মহসিন নামের একজনের কাছ থেকে খালি কার্ড কিনেন। প্রকৃত বিএমইটি কার্ড স্ক্যান করে তিনি নিজেই গ্রাফিক্স তৈরি করেন। তারপর ভিক্টিমের পাসপোর্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কার্ডের পিছনে তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয় এবং বদরুলের নির্দেশমত রিক্রুটিং লাইসেন্সের নম্বর বসিয়ে দিতেন।

[১০] লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, হাবিব চার বছর ধরে ভিজিটিং কার্ড, আইডি কার্ডের ডিজাইন এবং প্রিন্টের ব্যবসা করছে। ওই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কাস্টমারদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থের বিনিময়ে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নকল কার্ড তৈরি করে সরবরাহ করতেন। মানবপাচারকারী ও বিএমইটি কার্ড জালিয়াত চক্রের ফাঁদে পড়ে ভিক্টিমদের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে যায়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত