প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বন্যাজয়ী ধান বিনা ধান-১১ ও বিনা ধান-১২

নিউজ ডেস্ক: ময়মনসিংহের পরানগঞ্জের ক্ষুদ্র চাষি আবু বকর সিদ্দিক। ধারদেনা করে তিনি গত মৌসুমে এক বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছিলেন। আশা ছিল, ধান ঘরে তুলেই টাকা শোধ দেবেন। তাঁর সেই আশায় বাদ সাধে অতিবৃষ্টি। একদিকে ব্রহ্মপুত্রের ধেয়ে আসা পানি, অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে ধানক্ষেত তলিয়ে কয়েক দিনেই পচে যায় ধানের চারা। গত বছরের চার দফা বন্যা এমন অনেক চাষির স্বপ্নই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমনের ফলন কম হওয়ার সুযোগ নেন সুবিধাভোগী চাল ব্যবসায়ীরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব বলছে, প্রতিবছর ২০ লাখ হেক্টর জমির ফসল অতিবৃষ্টি, হঠাৎ বন্যা ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আমনের গড় ফলনও কমিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতি পাল্টে দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে বন্যাসহিষ্ণু আমন ধানের জাত। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বিনা ধান-১১ ও বিনা ধান-১২ জাতের ধান চাষ করে সফলতার পথে হাঁটছেন অনেক চাষি। প্রচলিত জাতের ধানগাছ পানিতে ডুবে গেলে তিন-চার দিনেই পচে যায়, কিন্তু এ দুটি ধানের জাত প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে টিকে থাকে। যদি এর চেয়ে বেশি সময় পানির নিচে থাকে তবে ধানগাছ পচে গেলেও পানি নেমে গেলে ফের জন্মায়। পানি সরে গেলে ধানগাছের গোড়া থেকে আবার চারা গজিয়ে ওঠে আগের মতোই। বিনার বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জাত দুটি আমন ধানের উৎপাদনকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে। চাষির ধান উৎপাদন ঝুঁকি ও খরচ কমাবে।

জাত দুটির ধান আবাদের সুবিধা বলতে গিয়ে বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, জাত দুটিতে রয়েছে ছয় ধরনের সুবিধা। প্রথমত, বন্যাপ্রবণ বা পাহাড়ি ঢলপ্রবণ এলাকায় ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা নেই। কারণ এটি দীর্ঘদিন জলমগ্নতা সহ্য করতে পারে। দ্বিতীয় বড় সুবিধা হলো, প্রচলিত জাতের ধানের উৎপাদন যেখানে ১৪০ থেকে ১৫০ দিন লাগে, সেখানে এই ধান উৎপাদনে সময় লাগে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ দিন। বীজতলাসহ সর্বোচ্চ ১২০ দিন। এই সময়টা কৃষক সরিষা বা শাকজাতীয় ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। তৃতীয় সুবিধা হলো, এ ধানের বীজ কৃষক নিজেই সংরক্ষণ করতে পারেন। বাজার থেকে কিনতে হয় না। অর্থাৎ কৃষকের বীজের খরচ লাগে না। চতুর্থত, আমাদের আমনের গড় ফলন যেখানে হেক্টরপ্রতি আড়াই লাখ টন, সেখানে বন্যামুক্ত স্বাভাবিক পরিবেশে হেক্টরপ্রতি এ জাতের ধান হয় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন। বন্যা আক্রান্ত হলেও সাড়ে চার টন পর্যন্ত উৎপাদন হবে। এ ছাড়া জীবনকাল কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও কম। অক্টোবরের দিকে গোখাদ্যের সংকট দেখা দেয়। এই জাতের ধান আবাদে দ্রুত ফলন হয় বলে এ থেকে খড় পাওয়া যায় দ্রুত। এতে গোখাদ্যের সংকট অনেকটাই দূর হয়। সার্বিকভাবে ধানের উৎপাদন ও দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা যায়। এতে দেশে ফসলের উৎপাদন বাড়বে।

এ দুই জাতের ধান চাষে কৃষকও বেশ খুশি। ময়মনসিংহের ছাতিয়ানতলার চাষি মো. আবু সায়ীদ বলেন, ‘আমি আগে বোরো আর আমন এ দুই ফসল করতাম, কিন্তু এ বছর বিনা ধান-১১ চাষের কারণে বোরো ধান চাষের আগে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময় পাচ্ছি। এ সময়টাতে আমি সরিষা চাষ করতে পারব। এতে আমার একটা ফসল বেশি হলো। এ ছাড়া বন্যার জলমগ্নতার সুবিধা তো আছেই। তাই এটি চাষ করা লাভজনক।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব বলছে, দেশে প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যার কারণে জলমগ্নতায় ধানের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন কমে যায়। প্রতিবছর বোরোর গড় ফলন যেখানে হেক্টরপ্রতি প্রায় সাড়ে চার টন, সেখানে আমনে ফলন হেক্টরপ্রতি আড়াই টন। গত বছর গড়ে প্রতি হেক্টর জমিতে আমনের ফলন হয়েছিল ২.৫৬ টন। ওই বছর লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ২.৬৫ টন।

ডিএইর তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ১১ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ৩৭ জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আনুমানিক ১২ লাখ ৮১ হাজার বিঘা জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমন ধানের। বোনা ও রোপা আমন মিলে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার জমির ফসল নষ্ট হয়েছিল।

২০১৩ সালে বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ জাত দুটি অনুমোদন পায়। এরপর প্রতিবছর কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ করে প্রদর্শনী প্লট করে আসছে বিনা। গত বছর দেশজুড়ে এক হাজার কৃষকের মধ্যে এক বিঘা করে জমির জন্য বীজ, প্রশিক্ষণ ও সার্বিক সহায়তা দেওয়া হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, জাত অনুমোদনের ছয় বছর হলেও এটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে দুই বছর আগে। বিশেষ করে গত বছরের বন্যার পর থেকে। তবে যে পরিমাণ চাহিদা আসছে, সে পরিমাণ বীজ দিতে পারছে না বিএডিসি। সাধারণত জুন-জুলাইতে রোপণ করা হয় রোপা জাতের এই আমনের চারা। তার আগে বীজতলা তৈরি করতে হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ধান কাটা যায়। – কালের কণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত