প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী, প্রধানমন্ত্রীকে হোম ওয়ার্ক করে বুঝতে হবে

কামরাল হাসান মামুন, ফেসবুক থেকে, গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করে টিভি অন করেই দেখি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সাধারণত সরকারি সফরে বিদেশ গেলে ফিরে এসে সাংবাদিক সম্মেলন করেন যা খুবই ইতিবাচক। যদিও ওখানে যারা আমন্ত্রিত হন কিংবা প্রশ্ন করার সুযোগ পান তারা কেউই তোষামোদি আর নিজেদের স্বার্থের প্রশ্ন ব্যতীত প্রশ্ন খুব কমই করে। তবে গতকাল কাকতালীয়ভাবে টিভি অন করেই দেখি সিনিয়র সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খান প্রাইম মিনিস্টারকে প্রশ্ন করছেন। আজ পর্যন্ত কোন সাংবাদিককে দেখিনি দেশের উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে। উনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ শুরু হওয়া মাত্রই আমার বড় কন্যা বিয়াংকা তার রুম থেকে দৌড়ে টিভি রুমে আসে। ও ভেবেছে এটি আমার প্রশ্ন কারণ প্রশ্ন যেটি করা হচ্ছিল সেই কথাগুলো ও সারাক্ষন বাসায় শুনে কিংবা লেখায় পড়ে। নাইমুল ইসলাম খানের প্রশ্নটি এবং প্রধানমন্ত্রীর উত্তরটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলেধরার চেষ্টা করেছি।

সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান: “আপনি প্রায়ই, এমনকি আজকেও কয়েকবার বলেছেন। প্রায়ই গবেষণার গুরুত্বের কথা বলেন। এইটা কেবল আজকের অনুষ্ঠান না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আপনাকে খেয়াল করলে বোঝা যায় আপনি গবেষণাকে কতটা গুরুত্ব দেন। এই প্রসঙ্গে বলি বাংলাদেশে অনেক মেগা প্রজেক্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নিয়েছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখনো বিশ্ব মানের কোন বিশ্ববিদ্যালয় নাই। প্রথম ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে না। আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ এখন চলমান, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, আপনারও নিজের বয়স এখন ৭৪ এবং আগামী বছর ৭৫ হবে। আপনি কি বাংলাদেশে কয়েকটি বা অন্তত একটি দিয়ে শুরু করেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব মানে নেওয়ার জন্য গবেষণার দরকার হবে, বিদেশী গবেষক শিক্ষক আনার দরকার হবে, কিছু বরাদ্দের প্রয়োজন হবে, অতিরিক্ত বরাদ্দের দরকার হবে। আপনার কি মনে হয় আপনি একটা উদ্যোগ নিবেন যে অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে বিশ্ব মানে নিয়ে যাওয়া। তার শতবর্ষে।”

আমাদের প্রধানমন্ত্রী: “দ্বিতীয় যেই বিষয়টি আপনি তুলেছেন, গবেষণার বিষয়টি। আসলে আমি সব সময় গবেষণায় বিশ্বাসী। এবং এইটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন যেন গবেষণা করতে একটু অনীহা। গবেষণা এবং পাবলিকেশন এইটা যে কত দরকার! আমি কিন্তু আজকে না। আমি যখন থেকেই বাংলাদেশে এসেছি তখন থেকেই কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনি যাই তখন সব সময় টিচারদের, ছাত্রদের বলতাম যে যেকোন ব্যাপারে গবেষনা করতে হবে। সেটা ছাড়া কখনো উন্নতি সম্ভব না। আলাদা টাকা বরাদ্দ সেটাও কিন্তু আমরা দিয়েছি। এবং আপনি জানেন যে আমি একটা স্পেশাল ফান্ড করেছি। যাকে প্রাইম মিনিস্টার্স এডুকেশন ফান্ডস। সেখানে যারা উচ্চ শিক্ষা বা গবেষণা করে তাদের জন্য কিন্তু টাকা দেওয়া হয়। সেই সাথে সাথে আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকেও কিন্তু সেই গবেষণা বিষয়ে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছি। আমরা বঙ্গবন্ধুর নামে একটা ট্রাস্ট ফান্ডও করে দিয়েছি। সেটি আলাদা এবং সেখান থেকেও কিন্তু গবেষণার জন্য টাকা দেওয়া হয়।
কিন্তু এই জায়গাটি একটা জিনিস যে আমি বলব যে আমি আরেকটা হিসাব নিয়েছিলাম যে আমাদের অনেক শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে। মানে শিক্ষকতা করে। তাদের সময়টা আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যেয়ে সেখানে আবার আরেকটা চাকুরী করে। কিন্তু ওই সময়টা কিন্তু গবেষণায় কাজে লাগায় না। আবার যারা পার্ট টাইম চাকরি করে না তারাও কিন্তু আবার গবেষণায় মনোযোগ দেননা। এমনকি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যখন করা হলো সেখানে শুধু পোস্ট গ্রাজুয়েট রাখবে। এইটা আমি রাখলাম। প্রত্যেকটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ই তাই। আমার উদ্যেশ্য এই মেডিকেল সাইন্সের উপর গবেষণা করা। এই ক্ষেত্রে আমাদের কোন গবেষণাই হয় না বলতে গেলে। খুব কম। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া গবেষক নেই। যারা গবেষণা করে দুই চারজনকে আমি চিনি। মাঝে মাঝে দেখা হয়। দেখা হলে ধন্যবাদ দেই। কিন্তু এই জায়গাটা, মানে আমি ঠিক বুঝি না এইখানে এই অনীহাটা কেন। আমি সত্যি কথা বলছি। যে এইটাই হলো বাস্তবতা।

আর যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরকমভাবে গবেষণা হতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট পাবলিকেশন থাকতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসাবে পরিচিত ছিল কারণ তখন যেমন পাবলিকেশন বেশি হতো তেমনি গবেষণাও হতো। সেটি কেন যেন ধীরে ধীরে অন্যভাবে চলে গেছে। তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তরতো আমি দিতে পারবো না। আমি কিন্তু ৯৬ সাল থেকে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গবেষণায় টাকা দিয়ে যাচ্ছি, টাকার ব্যবস্থা করেছি। বঙ্গবন্ধু চেয়ার করেছিলাম। খালেদা জিয়া এসে বন্ধ করে দিল। যদিও আবার করা হয়েছে।

সেই সাথে সাথে অন্য যেকয়টা ইনস্টিটিউট সবগুলো কিন্তু জাতির পিতারই করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই করে দিয়ে গেছেন। সব জায়গায় কিন্তু আলাদা স্পেশাল ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি গবেষণা করার। প্রত্যেকটা যেমন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব জায়গায় গবেষণা যেন তার উপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি এবং গবেষণা হচ্ছে। বিজ্ঞানের উপর আমাদের গবেষণা একেবারে বন্ধই ছিল। এইবার আলাদা ভাবে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আলাদা বাজেটও দিয়ে দিয়েছি। যে বিজ্ঞান গবেষণা আমাদের একান্ত দরকার। আর মেগা প্রজেক্ট বা স্যাটেলাইট এইগুলো করার ফলে সেখানেতো অনেকের অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে কাজ করার। সেই অভিজ্ঞতা দেশে বিদেশে কাজে লাগাতে পারে। সেটাতো আপনার উপর আমার উপর নির্ভর করে না। যারা করতে পারেন গবেষণা তাদের উপর নির্ভর করে। তো তারা কেন করে না। এই জবাবতো আমি দিতে পারব না। যা যা সুবিধা দেওয়ার আমার সব দেওয়া আছে। আলাদা ফান্ডও করে দিয়েছি। সবই করা আছে। এখন যদি সেখানে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে তাহলে গবেষনা সম্ভব। হাতেগুনা কয়েকজন মেডিকেল বিষয়ে গবেষণা করে, হাতেগুনা কয়েকজন বিভিন্ন গবেষণা করে। কিন্তু কেন যেন একটা অনীহা।

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছে। সেখানে দিয়েছি গবেষণা করতে তারা সেখানে চিকিৎসা করে আবার প্রাইভেটে যায় অপারেশন করতে অথবা চিকিৎসা করে টাকা কামাই করতে। এখন যদি টাকা কামাইটাই চিন্তা হয় তাহলে আর গবেষণা করবে কি করে? এর জবাবতো আমি কিভাবে দিব? আপনারা একটু সোচ্চার হন তখন যদি কেউ মনোযোগ দেয়। টাকার অভাব হবে নাতো। আমিতো ফান্ড করে দিছি।”

আমার আলোকপাত: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি গবেষণা ফান্ড করে দিয়েছেন, ফেলোশিপ দিচ্ছেন, বেতন বাড়িয়েছেন তারপররেও শিক্ষকরা কেন গবেষণা করে না? এই প্রশ্নের উত্তর যদি আপনি আপনার চারপাশের মানুষদের কাছে শুনেন তাহলে আসল উত্তর কখনো পাবেন না। আপনার চারপাশ কেবল স্বার্থপর দ্বারা ভরে থাকে। আপনাকে নিজে হোম ওয়ার্ক করে বোঝার চেষ্টা করতে হবে কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। কেন একজন শিক্ষকের বেতন ১২ হাজার টাকা অথচ বাসার ড্রাইভারের বেতন ২০ হাজার টাকা। কেন পিএইচডি পোস্ট-ডক করা, গবেষণা করা অধ্যাপকরা ৯০ থেকে ১ লক্ষ টাকা পাবে যা ভারতের অর্ধেকের কম আর পাকিস্তনের চেয়ে আরো কম। আপনাকে বুঝতে হবে শিক্ষকরা কি খুশিতে আনন্দে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যায়? অন্যদিকে সম পর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা কেবল গাড়ির খরচ বাবদই পায় ৩০ হাজার টাকা। অন্যান্য অনেক বৈধ অবৈধ উপরি সুবিধার কথা বাদই দিলাম।

যেই দেশে গবেষণা না করে রাজনীতি করলে লাভ বেশি সেই দেশে শিক্ষকরা কেন গবেষণা করবে? গবেষণার জন্য শুধু ফান্ডই যথেষ্ট না। একটা অর্থনৈতিক শান্তির পরিবেশ দরকার। গাছ গাছালিতে ভরা একটি মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ দরকার। ঝুট ঝামেলা মুক্ত পরিবেশ দরকার। আমাকে যদি ১.৫ ঘন্টা জ্যাম পার হয়ে, মাইক্রোবাসে করে প্রতিদিন অফিসে যেতে হয় তাহলে by the time আমি ডিপার্টমেন্টে আমিতো tired! এরপর একটা ক্লাস নিলে আমি exhausted! এরপর কি আর গবেষণা করার মত মাইন্ড সেট থাকে? দেশের বাহিরে যারা গবেষণা করে তাদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন। জামাল নজরুল ইসলাম কিংবা আমার জানা মতে অনেক প্রতিভাবান স্কলার বিদেশ থেকে দেশে এসে আর ভালো গবেষণা জারি রাখতে পারেনি। মানুষটাতো একই আছে। কিন্তু মানুষটার খোলস ছাড়া বাকি কোন কিছুই এই দেশে গবেষণা বান্ধব না।

যেই দেশে নেচার কিংবা সাইন্সের মত বিশ্বখ্যাত জার্নালে পাবলিকেশন আর দেশের গার্বেজ জার্নালে পাবলিকেশনকে এক কাতারে মাপা হয় সেই দেশে গবেষকরা কোন দুঃখে ভালো মানের গবেষণা করে দেশের উন্নতি করতে চাইবে?

সত্যিকারের গবেষণা চাইলে নাইমুল ইসলাম খানের প্রশ্নটার গ্র্যাভিটি অনুধাবন করতে হবে। প্রশ্ন ছিল একটি মেগা প্রজেক্ট নিয়ে বিশ্বমানের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরী করছি না কেন? কেন সেখানে বিদেশী শিক্ষক গবেষক নিয়োগ দিয়ে একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান করে দেশেই শক্তিশালী পিএইচডি ডিগ্রী দেওয়ার প্রতিষ্ঠান তৈরী করছি না? কেন দেশের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বিদেশে গবেষণা করতে পাঠাব? আর কতদিন?

যতদিন না শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন না দিবেন ততদিন শিক্ষকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেই। না পারলে সেই সময়টা রাজনীতি করে কাটিয়ে তার চেয়ে বেশি লাভবান হবে। গবেষণা করে এই দেশেতো কোন লাভ নেই। আপনি যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেন তখন কি কে ভালো গবেষক সেটা বিবেচনা করে দেন?

নাইমুল ইসলাম খানকে অনেক ধন্যবাদ। তিনি দেশের গবেষণা নিয়ে ভেবেছেন। এমন করে অন্যরাও যদি ভাবতেন তাহলে দেশের একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতো।

সর্বাধিক পঠিত