প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন : দেশের অনেক মেধাবী কেবল সুযোগের অভাবে, কেবল একটু পরিচর্যার অভাবে ঝরে যায়

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন : আজ থেকে প্রায় ৭ বছর আগের কথা। একটি অচেনা ছেলেকে কয়েকদিন ধরে আমার রুমের সামনে ঘুর ঘুর করতে দেখি। মনে হচ্ছিলো কথা বলতে চায় কিন্তু রুমে ঢুকে না আর কথাও বলে না। আমি সাধারণত রুমে থাকলে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিই যেন অযথা কেউ ডিস্টার্ব না করে। তারপর দেখি একদিন কেউ একজন দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আসতে পারি স্যার?’ আমি শব্দ করে বললাম অবশ্যই। ভেতরে ঢুকতেই দেখি ওতো সেই ছেলেটা। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে এবং আমার কাছে কী জন্য? তারপর সে অনর্গল তার পরিচয় দিয়ে গেলো। জানালো সে IBA থেকে BBA করেছে তারপর মাস্টার্স করেছে কম্পিউটার সায়েন্সে টওট থেকে। এরপর বললো আমার খুবই প্রিয় ছাত্র নাফিস ইশতিয়াক ও কাজী আশরাফুল আলমের বন্ধু। ও বলে চললো তার graph তত্তে¡র ওপর খুবই ভালো লাগে। যা হোক আমি যেই যেই বিষয়ের ওপর কাজ করি সেগুলোর অনেকগুলোই interdisciplinary! আমার সঙ্গে থাকা দরকার ছিলো দুয়েকজন পোস্ট-ডক এবং কয়েকজন পিএইচডি ছাত্র।

পোস্ট-ডকগুলো হতে পারতো বিভিন্ন discipline-এর যেমন কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা ফলিত গণিতের। সে বললো আমার কাছে আসার আগে সে আমার কাজ পড়েছে। তার কথায় আমি মোটামুটি convinced! মনে হচ্ছিলো যে সুযোগ দিলে সে হয়তো কিছু করতে পারবে। বিশেষ করে উৎসাহের মাত্রা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তবে বলে রাখি এরকম উৎসাহ নিয়ে মাঝে মাঝেই আমার কাছে নানা কিছিমের ছাত্র আসে কিন্তু তাদের উৎসাহকে exponentially মরে যেতেও দেখেছি বহুবার। যা হোক বাজিয়ে দেখার জন্য আমি তাকে কিছু প্রবেøম দিই এবং বলি যদি পারো তাহলে কাজ করতে আমার গ্রপে নিতে আপত্তি নেই। সম্ভবত এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিলাম এবং ঠিকই যতোটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশিই পেরেছিলো। কিছুদিনের মধ্যে সে এবং আমার আরেক ছাত্রী লিয়ানার সঙ্গে একটি আর্টিকেলও প্রকাশ করি। ইতিমধ্যে সে TOEFL এবং GRE দিয়ে ফেলেছিলো এবং ভালো করেছিলো।

একদিন এসে বললো যে সে বাইরে apply করতে চায়। তারপর ছোট করে বলতে গেলে বলা যায় সে বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত করেছে আর আমি recommendation letter submit করছি। এরপর আবার আমরা কাজে মনোনিবেশ করেছি। এরপর সে জানালো, তার বেশ ভালো কয়েকটি offer এসেছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সে Northeastern বিশ্ববিদ্যালয়ের Barabasi-র ল্যাব থেকে offer পেয়েছে। বলে রাখা ভালো যে Barabasi হলো বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে পরঃবফ cited scientist মধ্যে অন্যতম। গণিতবিদরা দীর্ঘ ২০০ বছর কাজ করেও গ্রাফ তত্ত¡কে তাদের ক্ষুদ্র গর বাইরে নিতে পারেনি। তারা গ্রাফ তত্তে¡র কোনো এপ্লিকেশন তেমন দেখাতে পারেনি। ১৯৯৯ সালে বাড়াবাসী বিখ্যাত ‘Science’ জার্নালে গ্রাফ তত্তে¡র নতুন এক ভ্যারিয়েন্ট এবং গ্রাফের পরিবর্তে নেটওয়ার্ক নাম দিয়ে স্কেল-ফ্রি নেটওয়ার্কের ওপর একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন। এই আর্টিকেলের মাধ্যমে গ্রাফ তত্তে¡র নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এর ফলে পদার্থবিদ, গণিতবিদ, কম্পিউটার বিজ্ঞানী এমনকি অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষকরাও এই তত্তে¡র প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ফলে এটি হয়ে উঠে সবচেয়ে vibrant রিসার্চ এরিয়া। Barabasi নিজে অসংখ্য রিসার্চ আর্টিকেল ও বই লিখে এটাকে জনপ্রিয় করে তুলেন। এখন এই তত্তে¡র ওপর অনেকগুলো স্বাধীন জার্নাল এবং অনেক জার্নালের একটি সেকশন এর জন্য বরাদ্দ রাখে। বাড়াবাসীকে কোনো কনফারেন্সে স্পিকার হিসেবে দাওয়াত দিতে হলে হাতে এক থেকে দুই বছর রেখে যোগাযোগ করতে হয়। আরো সুখের ব্যাপার হলো ওই ল্যাব থেকে আমার ছাত্রকে ফোনে এবং skype-এ যোগাযোগ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে যে Barabasi নিজে তার সিলেকশন করেছে।

এরকম একজন ছাত্রের এরকম একটা dream-place-এ হয়েছে এটা ভেবেই আমি অনেক খুশি। সেই নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে এখন পিএইচডি শেষ করেছে এবং গতকাল দেখলাম সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সাফল্য প্রমাণ করে মানুষের সম্ভাবনার কোনো মৃত্যু নেই। কোনো একটার পেছনে সঠিকভাবে কষ্ট করে লেগে থাকলে অবশ্যই সফল হবে। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে BBA ব্যাকগ্রাউন্ড কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পদার্থ বিজ্ঞানের মাস্টার্স কোর্সকে আমরা অনেক vibrant করতে পারতাম আমরা যদি  lateral displacement-এর সুযোগ রাখতাম। অর্থাৎ মাস্টার্সে যদি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু ছাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে নিতে পারতাম তো ক্লাসে পড়িয়ে কী যে মজা পেতাম! এর মাধ্যমে অনেক ছাত্র তাদের ভুল শুধরানোর সুযোগ পেতো। মাঝে মাঝে কিছু ছাত্র আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চায় তারা কি physics-এ MS করতে পারবে কিনা। তারা বলে ভুল করে বাবা-মায়ের পিড়াপিড়িতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছে কিন্তু তার নিজের ইচ্ছে ছিলো physics পড়বে।

আমাদের বাংলাদেশের সিস্টেম এরকম যে এখানে মানুষগুলোর স্বপ্নকে মেরে ফেলে। এখানে ভুল শুধরানোর কোনো সুযোগ রাখা হয় না। এরকম সিস্টেম অনেক সম্ভাবনাকে মেরে ফেলে। একটা রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান কখনো এরকম হওয়া উচিত নয়। কেবল আরেফিনুল নয়। আমার সঙ্গে সিজিপিএ অনেক কম এমনকি থিসিস করার যোগ্যতা না থাকারাও কাজ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাইনুল সাব্বির, দেবাশীষ সরকার, নাগিব জামান। তারা সেখানে গিয়েও আমার মূল্যায়নের যথার্থতা পূর্ণভাবে প্রমাণ করছে। আমার বিশ্বাসকে তারা ভেঙে না দিয়ে বরং অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেটি হলো Syed Arefinul Haque গতকাল দেখলাম নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল accomplishment দের ইনক্রেডিবল গবেষকদের লিস্টে আমার ছাত্র সৈয়দ আরেফিনুল হকের নামও।I wish him all the best. I am happy that I am part of his success however small the size of that part is!

এখনো আমার সঙ্গে ৫ জন শিক্ষার্থী কাজ করছে। তাদেরও সবার সিজিপিএ সেরকম আহামরি কিছু নয়। কিন্তু আমার সঙ্গে এই কয়দিন কাজ করার ফলে বুঝতে পেরেছি তারা প্রত্যেকেই খুবই মেধাবী। প্রথম থেকে শিক্ষকদের একটু আদর ভালোবাসা পেলে তারা আরো ভালো করতো। তারপরেও আমি জানি যে তারাও পিএইচডি করতে যাবে এবং খুব ভালো করবে। আমরা যদি একটা ইনস্টিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ নামে একটা প্রতিষ্ঠান করতে পারতাম এইরকম আরো অজস্র সাফল্য পেতে পারতাম। এই দেশের অনেক মেধাবী কেবল সুযোগের অভাবে, কেবল একটু পরিচর্যার অভাবে ঝরে যায়। আমাকে একটি ইনস্টিটিউট করতে সাহায্য করুন প্লিজ। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বাধিক পঠিত