প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: উপমহাদেশের ধর্মবোধ, ঘৃণা, অস্পৃশ্যতা ও সহিংসতা

খান আসাদ: ‘দাওয়াত পেয়ে যখন ওই বাসায় ঢুকলাম, বাতাসে শত্রæতার গন্ধ টের পাচ্ছি। যখন কথা বলছি তখন আমার দিকে না তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। এই ছাত্রদের পারিবারিক অবস্থান বিভিন্ন, কেউ হিন্দু বানিয়া, সিন্ধী থেকে শিখ, ব্রাহ্মণ ও জৈন সম্প্রদায়ের। তারা আমাকে অপমান করার জন্য আম্বেদকারকে গালাগালি শুরু করলো। সিন্ধী যে ছাত্রটিকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাবতাম, সে খুব উত্তেজিতভাবে দিল্লিতে খুন হয়ে যাওয়া দলিত নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলে গালি দিলো। সে ব্রাহ্মণদের সহিংসতা সমর্থন করে যুক্তি দিলো যে ভারতে ‘রিজার্ভেশনের’ কারণে ব্রাহ্মণরা বঞ্চিত হচ্ছে। ব্রাহ্মণ ছেলেটি এবার চিৎকার শুরু করলো, ‘ব্রাহ্মণদের কে রক্ষা করবে’?

আমি বুঝতে পারছি এখন আমি এখান থেকে চলে যেতে চাইলে শারীরিক হেনস্তার শিকার হবো। আমি দলিত প্রশ্নে আমার অবস্থান ব্যাখ্যার চেষ্টা করছি। পরিবেশটি যাতে শান্ত হয় সেই চেষ্টা করছি। এই ঘটনার কারণ পরে বুঝলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পেপার উপস্থাপন করেছিলাম, ‘ভারতীয় সমাজে কাস্ট ও জেন্ডার’। এটি ছিলো আমার ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার’ কোর্সের বিষয়। আমার এক শিখ সহপাঠী, আমার এই লেখা ও উপস্থাপনের ব্যাপারে ভারতীয় ছাত্রদের কাছে নালিশ করে। আমি খুব হতবাক হয়ে যাই। যে শিখ মেয়েটি আমার লেখা আপত্তিকর মনে করেছে, সে তো ব্রাহ্মণ নয়। যে সিন্ধী ছেলেটি ব্রাহ্মণ্যবাদ সমর্থন করছে, সে তো সেই ধর্মের নয়।

আমার তখন আম্বেদকারের আত্মজীবনীমূলক লেখা  Waiting for a Visa কথা মনে পড়ে যায়। আম্বেদকার একসময় বরোদাতে চাকরি পান, কিন্তু কোনো থাকার জায়গা ছিলো না। আম্বেদকার তার একজন খুব উদার হিন্দু ব্রাহ্মণ বন্ধু এবং আরেকজন আগে হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিলো এখন ধর্মান্তরিত হয়ে খৃস্টান হয়েছেন, এদের শরণাপন্ন হন। তারা কেউ তাকে বাসায় রাখেনি। আম্বেদকার একটি পার্শি গেস্টহাউজে থাকা শুরু করেন। পার্শিদের ধর্ম জরাথ্রæস্ট, যারা অস্পৃশ্যতাকে ধর্মের নিয়ম মনে করে না। দিন দশেক পরে, জনা বারো পার্শি গুন্ডা কিসিমের লোক লাঠি হাতে গেস্টহাউজের সামনে আম্বেদকারকে আক্রমণ করে। অদ্ভুত, যাদের হিন্দু বর্ণবাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাও দলিতদের অস্পৃশ্য মনে করে ও তাদের জায়গায় সহ্য করে না।’

Caste Matters by Suraj Yengde. Qvwc‡q‡Q Penguin Random House India, 2019, ২০১৯. লেখক Suraj Yengde হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। (২০২০ সালে বইটি কিনেছিলাম, আবার উল্টে পাল্টে দেখছি।) সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ তথা আত্মপরিচয়ের সহিংস রাজনীতির ইতিহাস এই উপমহাদেশে নানারূপে ও নানা প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা অনেক পুরনো। যা ভারতীয় আদিবাসী সংস্কৃতি থেকে পুরাই আলাদা এবং আর্য আগ্রাসনের সাথে সম্পর্কিত। এখন এই সহিংসতা সমাজ কাঠামোর গভীরে ও সংস্কৃতির শিরা-উপশিরায় বইছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্পৃশ্যতা বা রাজনৈতিক ইসলামের ‘মুরতাদ’ কিংবা বাউলদের প্রতি অসহিষ্ণু ঘৃণার ‘বৈধতা’ দেয়া হয় ধর্মের নামে, কিন্তু এর পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা খুব জরুরি। যেমন ‘অস্পৃশ্যতার’ পেছনে রয়েছে সম্পদ ও ক্ষমতার স্বার্থও। কাস্ট সিস্টেমের আড়াল রয়েছে শ্রেণিশোষণ। একটি সাম্য ও শান্তির সমাজের জন্য, সমাজের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও সহিংসতার দিকেও আমাদের নজর দেয়া দরকার। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত