প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইউটিউব ফেসবুকে লাইক শেয়ারের জমজমাট ব্যবসা, যত মিথ্যা অশ্লীলতা তত ডলার ইনকাম

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ ঘিরে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক শেয়ারের জমজমাট ব্যবসা চলছে। দেশ ও বিদেশ থেকে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ভিডিও-অডিও তৈরি করে ছোট ছোট অনুষ্ঠান বানিয়ে আপলোড করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব কনটেন্টে যত বেশি লাইক, শেয়ার তত বেশি ডলার আয়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী নানা কনটেন্ট আপলোড হচ্ছে ফেসবুক ও ইউটিউবে। বর্তমানে ব্যাপক হারে এ কারবারের বিকাশ ঘটলেও এর নিয়ন্ত্রণ নেই কারও হাতেই। যার যা মনে আসছে তা-ই ভিডিও বা অডিও আকারে তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ন্যাশনাল ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। এভাবে চলতে থাকলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেবে। দুই বছর ধরে ফেসবুক-ইউটিউবার চক্রের কারণে সমাজে নারী ও শিশুরা বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক নারী এসব চক্রের মাধ্যমে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে গেছেন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের নিরীহ মেয়েদের ভিডিও গোপনে ধারণ করে ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অশ্লীল ছবি তুলে ব্ল্যাকমেলও করা হয়েছে বহু নারী ও কিশোরীকে। এমনকি স্কুল-কলেজের ছাত্রীরাও এসব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রতিদিন

ইউটিউব-ফেসবুকের জন্য ভিডিও তৈরি করার চক্রের সদস্যরা একটি ক্যামেরা ও এডিটিং প্যানেল নিয়ে ছোট্ট অফিস খুলছে। দেশ-বিদেশে সিন্ডিকেট গড়ে তারা সরকারবিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত। এতে লাইক শেয়ার ব্যবসার পাশাপাশি সরকারবিরোধী চক্রের কাছ থেকেও নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। এসব বন্ধে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু তারা কেউই এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ মন্ত্রণালয় দোষ চাপাচ্ছে ওই মন্ত্রণালয়ের ওপর। ফলে এসব অবৈধ কার্যক্রমের প্রসার ঘটেই চলেছে। এতে একদিকে দেশ-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে, অন্যদিকে নোংরা অশ্লীল ভিডিওর কারণে অনেক নারী ও কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেও বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন জনকে ট্রল করা, হুমকি দেওয়া, সাইকোলজিক্যাল বুলিংয়ের মতো ফৌজদারি অপরাধেও ব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

অবস্থা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ফেসবুক-ইউটিউবে ভিডিও ছড়িয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবার, সরকার, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও দেশের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কোনো ধরনের জবাবদিহি না থাকায় বেপরোয়াভাবেই চলে আসছে এসব কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিজ্ঞজনদের মতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করলেও এর সুফল নিচ্ছে জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে এখন ভুঁইফোড় বহু পন্ডিতের জন্ম হয়েছে। ফেসবুক-ইউটিউবে সরকারবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি অনেক অ্যাডাল্ট কনটেন্ট আপলোড করা হয়। এসব অডিও শুনে ও ভিডিও দেখে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিভ্রান্তির পাশাপাশি নানা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে উসকানিমূলক ও ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ফেসবুক-ইউটিউবে বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে সমাজে জঙ্গিবাদের মতো ভয়ানক অপরাধেরও বিস্তার ঘটছে।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউব বা ফেসবুক থেকে আয় করা যায় এ কথা শুনেছিলাম। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের কিছু লোক দেশ-বিদেশে বসে শুধু নিজেদের স্বার্থে ইউটিউব-ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার ও গুজব চালিয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যেসব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবকু পেজের ফলোয়ার বেশি কুচক্রী মহল তাদেরই টার্গেট করে।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান ও বংশধর, বরখাস্ত কিছু সেনা কর্মকর্তা, পলাতক বিএনপি নেতা, কিছু পলাতক সাংবাদিক লন্ডন, আমেরিকা, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বসে অশ্লীল ও অপপ্রচারমূলক ভিডিও প্রচার করছে। এ ভিডিওই নাকি তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে আয় করছে অথচ আমরা তাদের কিছুই করতে পারছি না। শুধু তা-ই নয়, অপপ্রচারমূলক কনটেন্টগুলো আমরা সরাতেও পারছি না। আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যেন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। তাদের এ আচরণ নৈরাশ্যজনক।’

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদা বলেন, ‘সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে কিছু লোক ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ খুলে নানা ধরনের ভিডিও প্রচার করছেন। কিছু কিছু ভিডিও মজাদার ও শিক্ষণীয় হলেও অধিকাংশই অশ্লীল ও অপপ্রচারমূলক। সমাজে এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এসব ভিডিও-অডিও প্রচার বন্ধ না করা গেলে সামাজিক অবক্ষয় আগের তুলনায় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ যে কোনো ধরনের সমালোচনা করতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে কেউ যদি সমালোচনার স্থলে মিথ্যাচার করে, গুজব ছড়ায়, অপপ্রচার করে সেখানেই সমস্যা। দেখা যাচ্ছে এসব চ্যানেল ও পেজ থেকে সরকার ও সরকারি দলকে টার্গেট করে নানা ধরনের কুৎসা ও গুজব রটানো হচ্ছে। যারা রটাচ্ছেন তারা সবাই বাংলাদেশি। কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও মিথ্যাচার করা হয়। কিছু ভিডিওতে তো দেখা গেছে একজন নিজেকে রাজাকার বা রাজাকারের সন্তান হিসেবে দাবি করেছেন। এ ধরনের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা আমরা দেখতে পাইনি। ফলে এর মাধ্যমে কিন্তু সমাজে একটা বার্তা যায় যে আপনি যা খুশি তা-ই বলতে পারবেন; যা খুশি তা-ই করতে পারবেন, আপনার কিছুই হবে না! প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ফেসবুক-ইউটিউবে লাইক শেয়ার বাড়াতে দেশবিরোধী চক্রান্ত ও অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ভিডিও ছড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফারজানা রহমান বলেন, ‘ফেসবুক-ইউটিউসবসহ প্রযুক্তির অপব্যবহার একটি ন্যাশনাল ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির নির্ভরতা যত বাড়বে এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকি তত বাড়বে। এর বড় কারণ হচ্ছে কিশোরী বা তরুণীদের এসব মাধ্যম থেকে অর্থ আয়ের স্বপ্ন দেখানো হয়। তারা বিভিন্ন গ্রুপে অ্যাড হয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে বা অন্যদের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে ভিকটিমে পরিণত হয়। এ ধরনের অপরাধ রোধে এ ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, লাইকিসহ অ্যাপসগুলো সুপারভিশন করা জরুরি। তা ছাড়া কারা কী ধরনের কনটেন্ট আপলোড করছে তা-ও দেখা দরকার।’

সর্বাধিক পঠিত