প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নদী দখলে অভিযুক্ত থ্রি এঙ্গেল বানাচ্ছে বিআইডব্লিউটিসির ১৮ জলযান

বণিক বার্তা: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩৫টি বাণিজ্যিক জলযান ও আটটি সহায়ক জলযান তৈরি করা হচ্ছে। চলমান এ প্রকল্পের ১৮টি জলযান বানাচ্ছে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ৪০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের টেন্ডার পাওয়া নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি নদী দখলের জন্য পরিচিত। আবার দুর্বল জাহাজ নির্মাণের অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে।

বিআইডব্লিউটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, ১ হাজার ৩১৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫টি জলযান ও আটটি সহায়ক জলযান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। এসব জলযানের মধ্যে ১৮টি নির্মাণ করছে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড। এর মধ্যে ছয়টি ইউটিলিটি ফেরি, দুটি কোস্টাল অয়েল ট্যাংকার, দুটি ফায়ার ফাইটিং টাগ, তিনটি মডার্ন ইনল্যান্ড প্যাসেঞ্জার ভেসেল, চারটি কোস্টার সি ট্রাক ও একটি ইন্সপেকশন বোট। এসবের জন্য মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৮ কোটি ৪৯ লাখ ৬২ হাজার ৮৫০ টাকা। ইউটিলিটি ফেরির কাজ ৩০ শতাংশ এগোলেও বাকিগুলোর অগ্রগতি ১০ শতাংশের কম।

নৌ-চলাচল ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দেশের অন্যতম প্রধান নদী হিসেবে বিবেচিত মেঘনা ও এর শাখা নদী ফুলদীর একাংশ ভরাট করে জাহাজ মেরামত-নির্মাণ কারখানা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে থ্রি এঙ্গেলের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালের ৬ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার নদী দখলদারদের একটি তালিকা জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনে পাঠিয়েছিলেন তত্কালীন জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা। ওই তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে শীর্ষে। যাতে বলা হয়েছে, নয়ানগর মৌজার ১ নং খতিয়ানের ৮৯৯, ৮৯০, ৯০০, ৯০১, ৯০৪, ৯০৮, ৯১০, ৯১১ ও ৮৪৮ নম্বর দাগের জমিসহ মেঘনা ও ফুলদী নদীর অংশবিশেষ দখল করেছে থ্রি এঙ্গেল।

এছাড়া স্থানীয়রা বলছেন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠানটি দুটি খালও পুরোপুরি ভরাট করে বহুতল বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে। দখল ও ভরাটের ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ায় ফুলদী নদী দিয়ে বড় ধরনের নৌযান চলাচল করতে পারছে না। এতে সেখানকার পাঁচটি খাদ্যগুদামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে ব্যবসা করে তারা। এরই মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ তাদের কাছ থেকে একটি টাগবোট, পাঁচটি ক্রেন, একটি ক্রু-হাউজবোট, পাঁচটি বার্জসহ ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনেছে। এছাড়া থ্রি এঙ্গেলের কাছ থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা দামের একটি জরিপ জাহাজও কিনবে বিআইডব্লিউটিএ।

বিআইডব্লিউটিএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি করা জলযানের মান ভালো নয়। নিম্নমানের হওয়ায় বেশকিছু জলযান ও সহায়ক জলযান পানিতেই নামানো যায়নি। এমন অবস্থায় তাদের কাছ থেকে আবারো জলযান কেনার বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

তবে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন থ্রি এঙ্গেল আগেও তাদের জলযান বানিয়ে দিয়েছে। সেসব জাহাজে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল।

বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসিকে সবসময়ই অত্যাধুনিক জলযান সরবরাহ করা হয় বলে দাবি করেন থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের পরিচালক লোকমান হোসেন। তবে নদী দখল করে কারখানা নির্মাণের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুল জানিয়েছেন, থ্রি এঙ্গেলের বিরুদ্ধে নদী ও খাল দখলের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্তও চলছে। প্রতিষ্ঠানটি খাসজমি দখল করেছিল, এটি সত্য। তবে পরে সেসব উদ্ধার করা হয়েছে। আর এখন তাদের বিরুদ্ধে নদী দখলের যে অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে ভূমি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের সমন্বয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সরেজমিনে গজারিয়ার নয়ানগরে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা ও ফুলদী নদীর ঠিক মাঝেই গড়ে উঠেছে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড। যেখানে নদী দখল হয়েছে সেখানে স্বাভাবিকভাবে ফোরশোরগুলোও দখল হয়ে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (লজিস্টিক সাপোর্ট) এমএ রহমান আনসার বলেন, আমরা ৭১ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। নয়ানগর গ্রামের অল্প কিছু অংশ বাকি আছে। পুরো গ্রামটিকেই মেরিন শিল্পের জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা আছে।

তবে নদী ও খাল দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। উল্টো মেঘনা নদীর অংশে তাদের জমি বালি ব্যবসায়ীরা দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তারা যে নদী দখল করেননি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিআইডব্লিউটিএ যখন নদীর জমি দখলমুক্ত করে তখন তাদের সীমানা প্রাচীর ভাঙেনি।

তবে নদীর ফোরশোর ভূমি খালি রাখা আইনের প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, নদীর ভেতরেও আমাদের জমি আছে। আমাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপ ড্রেজিং করে সে জমি থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে।

এসব বিসয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, ২০০৯ সাল থেকে তারা এখানে জমি কিনছেন। যথাযথ আইন মেনেই সব জমি কিনেছেন তারা।

যদি সবকিছু নিয়ম অনুযায়ীই করে থাকেন তাহলে কেন তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ উঠছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আগে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী ছিলাম। পরে নিজের ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু প্রাক্তন সহকর্মীদের কয়েকজন বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেননি। অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করলেও কেউ কেউ জমি দখলের মিথ্যা অভিযোগ রটাচ্ছেন।

এত বড় প্রতিষ্ঠান কেন শুধু সরকারি সংস্থার জন্য জলযান তৈরি করে, এমন প্রশ্নের জবাব দেন বিআইডব্লিউটিএর সাবেক এ প্রকৌশলী। তিনি বলেন, বেসরকারি কাজে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকে না। কিন্তু সরকারি কাজে এ ভয় নেই।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত