প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: বাংলাদেশের শিক্ষার মান তলানিতে, নতুন কাররিকুলাম হলে তলাও ফুটা হয়ে যাবে!

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: আমার ছোট কন্যা লিলিয়া পড়ে নবম শ্রেণীতে। ইংরেজি মাধ্যমে। ওর পড়ার ঘরে গিয়ে দেখি ওর বোর্ডে একটি ছোট খাটো ইন্টিগ্রেশন করে রেখেছে (ইন্টিগ্রেশন মাত্র শিখছে)। তারপর খোঁজ নিয়ে এবং ওর গণিত বই হাতে নিয়ে দেখলাম মাম্মা মিয়া কি নেই ওতে! ইন্টিগ্রেশন, ডিফারেন্টসিয়েশন, জ্যামিতির, ট্রিগোনোমিতি অর্থাৎ বর্তমান বাংলা মাধ্যমের উচ্চতর গণিতে যা আছে তার চেয়েও বেশি এবং অধিকতর জটিল। নতুন কাররিকুলামে নবম দশম শ্রেণী থেকে সেই উচ্চতর গণিত উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আরো দেখলাম ওদের পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত নামের আরো চারটি সাবজেক্ট আছে। অথচ নতুন প্রস্তাবিত কাররিকুলামে প্রথম ৩টি বিষয় থেকে আগের তিন ভাগের এক ভাগ করে একেকটি থেকে নিয়ে একটি বিষয় বানানো হচ্ছে যার নাম বিজ্ঞান। ওদিকে উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাস আগের মতই আছে। উচ্চ মাধ্যমিকে যারা বিজ্ঞান নিবে তাদের সেই বিষয়গুলো পড়ে বোঝার জন্য কিছু পূর্বশর্ত থাকে। অর্থাৎ ওগুলো পড়ে বুঝতে হলে মাধ্যমিকের ৪টি বিষয় যেমন পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত আলাদা পূর্ণমানের বিষয় পড়া থাকতে হবে। এখন নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রস্তাবিত কাররিকুলাম পড়ে যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে যাবে তাদের অবস্থা কি হবে একটু ভেবে দেখুন। ভয় পাবে। ভয়ে কেউ আর বিজ্ঞান পড়তে চাইবে না। নতুন কাররিকুলাম পড়ে আগে যারা আর্টস কিংবা বাণিজ্যে পড়তো তারা কিন্তু উপকৃত ঠিকই হবে। এমনিতেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বিজ্ঞান পড়ে পৃথিবীর যেকোন বিষয় পড়া যেত এবং যায়।

এমনিতেই আমাদের দেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দিন দিন কমছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে নেমেছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে উচ্চ-মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী ২৮ শতাংশ থেকে কমে ১৭ শতাংশ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশ হয়েছে। আর এইবার প্রস্তাবিত নতুন কাররিকুলাম বাস্তবায়িত হলে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আরো কমে যাবে। অথচ বিজ্ঞানের জোরেই বিশ্বে অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। চারিদিকে বিজ্ঞানেরই জয়জয়কার। আমরা যা দেখি বা হাতে পাই সেটা প্রযুক্তি। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির জ্বালানি হচ্ছে বিজ্ঞান। এর মানে হলো আমরা সোজা উল্টো পথে হাটছি।

এই উল্টো যাত্রাকেই আমাদের দেশের কিছু শিক্ষাবিদ বাহবা দিচ্ছে। তাদের উদ্যেশ্য নিয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। প্রস্তাবিত এই কাররিকুলাম যেভাবেই হউক থামাতে হবে। আমার আশ্চর্য লাগে বুয়েটের কোন শিক্ষককে দেখলাম না নতুন কাররিকুলাম নিয়ে কিছু বলতে। বুয়েটের একজন সাবেক শিক্ষক এবং বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অবশ্য এই কাররিকুলামকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ এই কাররিকুলাম বাস্তবায়িত হলে ইংরেজি মাধ্যম আরো জনপ্রিয় হবে এবং ইংরেজি মাধ্যম যত বেশি জনপ্রিয় হবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ততবেশি উপকৃত হবে। এরা হলো প্রচণ্ড ধান্দাবাজ। কিন্তু বুয়েটের বর্তমান শিক্ষকরা কেন চুপ? তারাইতো সবচেয়ে বড় ভিক্টিম হবে।

প্রস্তাবিত নতুন সিলেবাস পড়ে কীভাবে গণিত অলিম্পিয়াড আর ফিজিক্স অলিম্পিয়াডে ভালো করবে আশা করেন? এই নতুন প্রস্তাবিত সিলেবাস পড়ে কিভাবে বড় বিজ্ঞানী হবে আশা করেন? এই নতুন প্রস্তাবিত সিলেবাস পড়ে কিভাবে বড় বিজ্ঞানী হবে আশা করেন? কিভাবে বড় ডাক্তার হবে? আমরাতো গড় মানুষ তৈরীর টার্গেট নিয়েছি যারা এক চিমটি বিজ্ঞান, এক চিমটি আর্টস আর এক চিমটি প্রযুক্তি শিখে একটি স্যালাইন মার্কা শিক্ষিত হবে। এদের দিয়ে প্রযুক্তিবিদ হওয়া দূরাশা। বড়জোর মিস্ত্রি বা টেকনিশান হবে। এমনিতেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান এশিয়ার তলানিতে। নতুন কাররিকুলাম বাস্তবায়িত হলে সেই তলাও ফুটা হয়ে যাবে। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত