প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: বিএনপি যে কারণে দাঁড়াতে পারছে না

প্রভাষ আমিন: ২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি। রাজনীতি আসলে কৌশলের খেলা। কখনও কখনও অপকৌশলেরও খেলা। রাজপথে আমরা যা দেখি, সেটা সেই কৌশল বা অপকৌশলের শেষ ধাপ। তার আগে পর্দার পেছনে চলে আসল খেলা। সেই খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে বার বার হেরে যাচ্ছে বিএনপি। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। কৌশলের অংশ হিসেবে দুদলই সমমনাদের কাছে টানে, জোট বানায়, জোট ভাঙে। অপকৌশলের অংশ হিসেবে সমমনা নয়, এমন দলের সঙ্গেও জোট হয়। রাজনীতির এই মেরুকরণের কোনো স্থির সমীকরণ নেই। যেমন একসময় আওয়ামী লীগ-বিএনপি যুগপতভাবে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সে আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টি পরে কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। একসময় হেফাজতে ইসলাম সরকার উৎখাতের স্বপ্নে ঢাকা দখল করতে এসেছিলো। সেই হেফাজত এখন চলে সরকারের ইশারায়। আরেকটু পেছনে গেলে দেখা যাবে, জাসদের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে। সেই জাসদের বড় একটি অংশ এখন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী। তাই রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই। প্রয়োজনই বন্ধু ঠিক করে দেয়।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছিলো। ২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি। এরশাদ পতনের পর অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোয় দেখা গেছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোট পাওয়ার হার ৩০-৩৫ শতাংশের মধ্যে। এই ভারসাম্য থেকে ক্ষমতায় যেতে বিএনপি কখনও জামায়াতকে কাছে, আওয়ামী লীগ টানে জাতীয় পার্টিকে। কারণ আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এই দুই দলেরই বলার মতো কিছু ভোট আছে, যা ক্ষমতার পাল্লা হেলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু গত ১৫ বছরে বিশেষ করে গত ১২ বছরে ভোটের এই হিসাব যাচাই করার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বিএনপির ভোটব্যাংক কি অটুট আছে, নাকি কমেছে? সেটা জানার কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের মতো দেশে সাধারণভাবে একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলে, যত ভালো কাজই করুক, মানুষ তাদের বদলাতে চায়। সেখানে আওয়ামী লীগ টানা তিন দফায় ক্ষমতায় আছে। সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর বিরক্ত হলে তার সুবিধা পাবে বিএনপি। কিন্তু সেই সুবিধাটা পাওয়ার রাস্তাটাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি। শুরুতে যেমন বলেছি, রাজনীতি আসলে কৌশল বা অপকৌশলের খেলা। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়- এই কৌশলে অনড় থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। সে নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির ধারণা ছিল, নির্বাচনে না গিয়ে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে বা নির্বাচন ঠেকাতে পারবে কিংবা নির্বাচনের পর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু বিএনপি কোনোটাই পারেনি।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপিও আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে একটি নির্বাচন করেছিলো। কিন্তু টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিকে বাধ্য করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যেটা পেরেছিল, বিএনপি ২০১৪ সালে সেটা পারেনি। তারপর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, এই দাবিতে অনড় থাকলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই তারা অংশ নেয়। কিন্তু ততোদিনে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠটি এমনভাবে দখল করে নেয়, বিএনপির আর তাতে ঢোকারই সুযোগ ছিলো না। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছিলো, আর ড. কামাল, জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের পরামর্শে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভুল করেছে। দুটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালেচনা আছে। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় ছাড়া আওয়ামী লীগের ঘাড়ে বিএনপি আর কিছুই দিতে পারেনি। দুটি নির্বাচন দিয়েই আওয়ামী লীগ টানা দেশশাসন করছে। বিএনপি নির্বাচনের মাঠে তো ঢুকতেই পারেনি, রাজপথেও প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরোনো ও গণতান্ত্রিক দলের জন্য ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দুটি অবশ্যই বড় ধাক্কা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই কৌশল শিখেছে বিএনপির কাছ থেকেই। জিয়াউর রহমান হ্যাঁ-না ভোট, ১৯৭৯ সালের নির্বাচন আর খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও একই দোষে দুষ্ট। এরশাদ আমলে ’৮৬ আর ’৮৮ সালের দুটি নির্বাচনও নির্বাচনি ব্যবস্থার কলঙ্ক হয়ে আছে। আসলে যে যখন সুযোগ পেয়েছে, সে তখন নির্বাচন নিয়ে অপকৌশলের খেলা খেলেছে। নির্বাচন নয়, আসলে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে কৌশল-অপকৌশলের খেলায়।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আড়াই বছর আগেই নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশে অনেকেই আগাম নির্বাচনের গন্ধ পেয়েছেন। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার নির্বাচনি বলের পেছনে এখন ছুটছে রাজনীতি। অনেকদিন পর চাঞ্চল্য বিএনপি শিবিরেও। নিজেদের রাজনীতি ও কৌশল ঠিক করতে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। বৈঠক এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের আলোচনায় উঠে এসেছে, পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়ার দাবি। বেশিরভাগ নেতাই বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে একদফার আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। গত দুটি নির্বাচনে না গিয়ে এবং গিয়ে বিএনপি যা শিখেছে, তাতে এর বাইরে অন্য কোনো কৌশলের কোনো সুযোগই নেই। নির্বাচন আগে হোক আর আড়াই বছর পরে হোক, বর্তমান সরকারের অধীনে তাতে অংশ নেয়া মানেই বিএনপির আরেকটি ভরাডুবি, এটা সবাই বোঝে। কিন্তু বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করল, আর আওয়ামী লীগ সেটা মেনে নিল, ব্যাপারটি অত সরলও নয়। তাছাড়া টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপির হাতে ক্ষমতা দিয়ে প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার মতো বোকাও আওয়ামী লীগ নয়। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। তাই বিএনপির স্ষ্ঠুু নির্বাচনের দাবিটিই যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি তাদের এই যৌক্তিক দাবিটি আদায় করবে কীভাবে? সবাই নিশ্চয়ই বলবেন, আন্দোলন করে। কিন্তু আন্দোলন করে দাবি আদায়ের সক্ষমতা কি আছে বিএনপির? গত একযুগে বিএনপি আন্দোলনের নানা চেষ্টা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কঠোর হাতে সেসব দমন করেছে। একাধিকবার আন্দোলনের চেষ্টায় দলের শক্তিক্ষয় হয়েছে, নেতাকর্মীদের মামলার সংখ্যা বেড়েছে। আর পরিস্থিতি এখন আরও অবনতি হয়েছে।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ড মাথায় নিয়ে সরকারের অনুকম্পায় অন্তরীণ জীবনযাপন করছেন। তার যা বয়স এবং শরীরের যে অবস্থা, তাতে তিনি আর দলের নেতৃত্ব দেবেন বা আন্দোলনে নামবেন; তেমন বাস্তবতা নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দণ্ড মাথায় নিয়ে পালিয়ে আছেন। তাই এ অবস্থায় নেতৃত্ব শূন্যতাই বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকট। তাছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে থাকা দলটি এখন কেন মাঠে নামতে পারছে না, সেটাও বিশ্লেষণ করা দরকার। বৃহত্তর আন্দোলনে নামার আগে বিএনপির নিজেদের সক্ষমতা যাচাই এবং আত্মসমালোচনা জরুরি। এটা ঠিক, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বর্তমান সময়ের ন্যূনতম রাজনৈতিক দাবি। বিএনপির লক্ষ্যটাও পরিষ্কার- সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটা বড়ই বন্ধুর। সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সামর্থ্য বিএনপির আছে কি না, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সূত্র : নিউজবাংলা, লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত