প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: বাঙালির নারীমুক্তির আন্দোলন

খান আসাদ: বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল থেকে জাহানারা ইমাম। মিলটা অনেক ধরনের, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচিতে। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা কেন, সে সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা করেছেন, লিখেছেন। পিতৃতন্ত্রকে সম্পর্কিতভাবে দেখেছেন রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে। ফলে নারীমুক্তি আন্দোলনকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন সামাজিক সংস্কার ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারায়। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা রাখী দাশ পুরকায়স্ত একবার আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মহিলা পরিষদের নেত্রীদের সঙ্গে ‘পরিকল্পনা পদ্ধতি’ নিয়ে আলোচনার জন্য। কেউ কেউ ছিলেন আম্মার বয়সী। আটপৌরে শাড়িতে, খুব মাতৃময়ী, ক্লাসিকাল, রাবীন্দ্রিক। আক্ষরিকভাবেই জাহানারা ইমামকে অনেকই আমরা ‘মা’ বা ‘আম্মা’ ডাকতাম। বাঙালি নারীনেত্রীদের মাতৃময়ী রূপই ছিলো প্রধান্যে।
পিতৃতন্ত্র বিরোধী চিরায়ত নারীমুক্তির সংগ্রাম সামাজিক সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল, ইত্যাদি বদলে গেলো, সম্ভবত শুরুটা আশির দশকেই। বদলে গেলো নারী আন্দোলনের নেত্রীদের চিত্ররূপও। মাতৃময়ী, ক্লাসিক্যাল, রাবীন্দ্রিক ঘরানার বিপরীতে আমরা রাগি, প্রতিবাদী, শরীর নিয়ে অসংকোচে কথা বলা ব্যক্তিগতভাবে ডাক্তার বলেও হয়তো। একজন কবি ও কলাম লেখক তসলিমা নাসরিনকে আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত হতে দেখি। অনেকেই তসলিমা নাসরিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘প্রতিবাদ’ প্রকরণ নিয়ে ভিন্নমত ও সমালোচনা করেন। ক্লাসিক্যাল ধারার একজন নারীনেত্রী একবার বলেছেনও যে তসলিমা না থাকলেও মৌলবাদীরা আরেকজন তসলিমাকে খুঁজে নিতো, নিজেদের প্রয়োজনে। সমালোচনাটি তসলিমা নাসরিনের র‌্যাডিক্যাল এবং সংগঠনবিচ্ছিন্ন অবস্থানেরও। দুটি দিক সামনে আসে। নারীমুক্তির সংস্কারবাদী, ক্লাসিক্যাল রাবীন্দ্রিক ধারা যথেষ্ট নয়। সবাইকে ধারণ করতে পারছে না। নতুন প্রজন্মের নারীরা দ্রোহী, প্রতিবাদী, র‌্যাডিক্যাল। তাই নতুন ঘরানার নারী আন্দোলন অনিবার্য। প্রধাগত ধর্মবোধের প্রতি যে সহনশীলতা ক্লাসিকাল নারী আন্দোলনের ছিলো, সে লিবারেল সহনশীল সমালোচনা বা ধর্মকে ট্যাবু হিসেবে দেখার সে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলো।

অন্য দিকটি, নারীমুক্তির আন্দোলন এখন আর ‘সাংগঠনিক’ পরিকল্পিত কোনো ব্যাপার নয়, স্বতঃস্ফ’র্ত এবং ব্যক্তিগত। তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে অভিনয় শিল্পী পরীমনির কি তুলনা চলে? বাঙালির ঐতিহ্যগত নারীমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে, সে চিরায়ত মাতৃময়ী রাবীন্দ্রিক চরিত্রের সঙ্গে তসলিমা নাসরিনের একক, ধর্মপ্রথাবিরোধী ও দ্রোহী ধারার কোনো মিল নেই। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারবাদী ধারার বিপরীতে একক বিদ্রোহের ধারাটি নতুন বৈকি। ঠিক তেমনি, পরীমনির হাতের তালুতে ইংরেজি ক্ষুদেবার্তা ও ‘মধ্যমা প্রদর্শনের’ একক প্রতিবাদও আলাদা ঘরানা বৈকি। সন্দেহ নেই পরীমনি তসলিমা নাসরিনের মত ‘তাত্ত্বিক’ নারীবাদী নয়, কিন্তু সে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো ও ধর্মসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়ছে, এবং সাহসের সঙ্গেই লড়ছে। প্রশ্নটা লড়াইয়ের। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইটা অব্যাহত রাখার, যতোদিন না মানুষে-মানুষে, নারী-পুরুষে সে স্বপ্নের সামের সমাজ অর্জিত হয়। শুরু করেছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় পূর্বনারীরা, সে ধারায় অনেক কিছুই নতুন নতুন সংগ্রামের ধরণ সংযুক্ত হয়েছে, আরও হবে। বাংলাদেশে অনেক নারী সংগঠন রয়েছে, ক্লাসিকাল ধারার। গ্রামীণ নারীদেরও অনেক সংগঠন রয়েছে। অনেক ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় নারী আবার কোনো সংগঠনেও নেই। নারীদের নিয়ে মৌলবাদী সংগঠনও হচ্ছে, নারীকে হিজাবে আটকানো, বহুবিবাহে পোষ মানানোর জন্য। নারী আন্দোলনের ধারা ও রূপ আর একটিমাত্র নেই।

ঢাকার রাস্তায় বা কোনো মাদ্রাসার সামনে ছেলেশিশু ও কন্যাসন্তানের ধর্ষনের কারণে বিক্ষুদ্ধ মায়েরা ভবিষ্যতে কি রূপে প্রতিবাদ করবে আমরা জানি না।‘পূর্বভারতের মনিপুরে মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদের নজির আছে’। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ না করে, পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতা কাঠামোর বিরোধতা না করে, নারীর প্রতিবাদের ধরন বা রূপ নিয়ে সমালোচকেরা ‘তাত্ত্বিক’ অসম্পুর্নতা, ব্যক্তির পেশা বা অর্থনৈতিক শ্রেণি অবস্থান, কিংবা বার্তার ‘শালীনতা’ নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন, যা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ওই পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর পক্ষেই যায়। প্রতিবাদী নারীর বার্তা কতোটা ‘শালীন’ বা ‘বিপ্লবী’ এসব অর্বাচিন প্রশ্ন বাদ দিয়ে, সাম্প্রতিককালে মাদ্রাসায় যে ছেলে ও কন্যাশিশুদের ভয়াবহ যৌনসন্ত্রাস হচ্ছে, যার শুধু শৈলচুড়া দেখা যায় পত্রিকার পাতায়, সেটা নিয়ে অনুসন্ধানী হোন, সামাজিক মাধ্যমেও লিখুন। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক ধর্মীয়, আইনি ও সামাজিক প্রথা ও প্রতিঠানের বিলোপ ঘটুক। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত