প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুমি খান: সত্যেন বসু: এক মহান বিজ্ঞানীর কীর্তিগাঁথা

সুমি খান: বাংলা ভাষার মাধ্যমে বাঙালি ছাত্রদের জন্য বিজ্ঞানকে সহজ এবং জনপ্রিয় করতে এবং সমাজে বিজ্ঞান কে প্রতিষ্ঠিত করতে ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সমাজের উন্নতিতে ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নিজের কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় দিক। সবসময় বলতেন ‘স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে,এই স্বাধীনতার যা কিছু সুফল তা যেন শুধু অল্পসংখ্যক শিক্ষিত লোকের আয়ত্তের মধ্যে না থাকে, সেগুলো যেন দেশের লোকের সকলের কাছে পৌঁছে যায়’। তিনি ছিলেন বিশ্বমানব। কেউ তার কাছে ব্রাত্য ছিলেন না। গণিতে তার ব্যুৎপত্তির খ্যাতি সব মহলে ছড়িয়েছে সে সময়েই,এনট্রান্স পরীক্ষার জন্য ‘টেস্টে’ অঙ্কে তিনি ১০০নম্বরের মধ্যে পেয়ে গেলেন ১১০, এই নম্বর কীভাবে পেলেন, তার কারণ হিসেবে শিক্ষক মহাশয় বলেছিলেন প্রশ্নপত্রের ১১টি অঙ্কের মধ্যে ১০টি কষতে বলা হলেও তিনি ১১টি সঠিকভাবে কষেছিলেন, জ্যামিতির যেসব এক্সট্রা দেওয়া হয়েছিলো সেগুলো তিনি সমাধান করেছিলেন দুই-তিন রকম বিকল্প পদ্ধতিতে। ছোট সত্যেন্দ্রনাথ ছোটবেলায় যা পড়তেন অসম্ভব তন্ময় হয়ে পড়তেন, মজার বিষয় হলো বেশ ছোটবেলায় তিনি পড়া হয়ে গেলে বইয়ের সেসব পাতা ছিঁড়ে ফেলতেন, তার মা বকাবকি করলে বলতেন ওসব তো তার জানা হয়ে গিয়েছে। এন্ট্রান্সে পঞ্চম স্থান অর্জন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষাতে তার স্থান ছিলো প্রথম,এম এসসি পরীক্ষায় শতকরা ৯২শতাংশ পেয়ে যে ছাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন তিনি বিশ্ব বন্দিত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

গণিতের প্রখ্যাত অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক সত্যেন্দ্রনাথকে দেওয়া সার্টিফিকেটে লিখেছিলেন এরকম ছাত্রের শিক্ষকতার সুযোগ পেয়ে তিনি ধন্য। হয়তো জীবনের সবক্ষেত্রেই সত্যি, প্রতিভা যে ধরনের হোক সেটার স্ফুরণ হয় সাধনায়, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাধনার সহায় ছিলো তার প্রখর স্মৃতিশক্তি, একপ্রকার কিংবদন্তির পর্যায় বললে ভুল হয় না,নিজে কেবলমাত্র বিজ্ঞানের সাধক ছিলেন না বরং সবাইকে বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করায় ও বিজ্ঞান সাধনার অগ্রগতিতে ছিলো তার আন্তরিক আনন্দ। সত্যেন্দ্রনাথ বসুসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বিজ্ঞান কলেজে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর স্তরে পঠন-পাঠন শুরু হলো, তিনি জানতেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন ধ্যান-ধারনার আর্বিভাব হচ্ছে,অথচ কলকতায় সেসব জানার মতো বই নেই,অথবা সে বই বা পত্র-পত্রিকা সংগ্রহ করা সহজসাধ্য নয়,তিনি ও তার সহকর্মীরা সেসব সংগ্রহ করতেন,জার্মান ভাষায় বই-পত্রিকা পড়ার জন্য শিখলেন জার্মান,এর আগে শিখে নিয়েছিলেন ফরাসি ভাষা। বিজ্ঞান কলেজে তিনি গণিত,পদার্থ বিদ্যা দুই বিভাগে ক্লাস নিতেন,অঙ্কের বইয়ের আর সদ্য প্রকাশিত গবেষণা পত্রের সারমর্ম পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে ব্যাখ্যা করে ব্ল্যাকবোর্ড ভরিয়ে দিতেন,হাতে থাকত না কোনো নোট, স্রেফ স্মৃতিশক্তির উপর ভর করে এসব তিনি লিখে যেতেন বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পাওয়া পড়ুয়ারা। আর এক প্রথিতযশা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সহযোগিতায় রচিত সত্যেন্দ্রনাথের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিলো ফিলজফিক্যাল ম্যাগাজিন নামের বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকায়,পরবর্তী কালে সাহা- বোস সমীকরণ নামে সুপরিচিত হয়।

আরও একটি বড় কাজ দুই বিজ্ঞানী করেছিলেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিজ্ঞানে যুগান্তর এনেছিলো সে বিষয় আইনস্টাইন ও হার্মান মিনকায়োস্কি রচিত কয়েকটি বিখ্যাত প্রবন্ধ মূল জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন,ইংরেজিতে ওইসব প্রবন্ধের প্রথম অনুবাদ, প্রবন্ধগুলো গন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছিলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে,বিজ্ঞানের পড়ুয়ারা খুব উপকৃত হয়েছিলেন। পরে সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নানা কীর্তির কথা আলোচনা করে নতুন প্রজন্মকে তার বিশ্বজয়ের ইতিহাস বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। তবে এটুকু নিশ্চয়ই বলা যায় তার অক্ষয় কীর্তি অবশ্যই বোস সংখ্যায়ন।

১৯২৪সালে মার্চে বন্ধুবর অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা ঢাকায় পরীক্ষা নিতে গিয়ে সত্যেন বসুর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন,তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার, ছাত্রদের ‘প্লাঙ্কের কোয়েন্টাম তত্ত্ব পড়াতে গিয়ে কিছু যুক্তির অভাব দেখছিলেন, মেঘনাদ সাহা নিজেও প্রবন্ধের শর্তের বিস্ময়কর দিকের কথা বললেন,দুই বন্ধু আলোচনায় বসলেন। মেঘনাদ সাহা এই বিষয়টি নিয়ে বন্ধুকে ভালো করে অনুসন্ধান করতে বললেন। শুরু হলো সত্যেন বসুর অনুসন্ধান,সমস্যার সমাধান করে ফেললেন, সেই গবেষণা পত্র পাঠালেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ফিলজফিক্যাল ম্যাগাজিনে’,তবে উত্তর আসতে দেরি হলো,পত্রিকায় অপ্রকাশিত প্রবন্ধটি আইনস্টাইনের কাছে পাঠালেন সত্যেন বসু,আইনস্টাইন নিজে চমৎকৃত হলেন সেই প্রবন্ধ দেখে। রাতারাতি প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে বিখ্যাত জার্মান পত্রিকা ‘তবরঃংপৎরভঃ ঋঁৎ ঢ়যুংরশ’-এ ছাপার ব্যবস্থা করে আইনস্টাইন স্বীকার করলেন সত্যেন বসুর গণনা পদ্ধতিতে তাঁর আলোক-কনিকাবাদ অনেকটা এগিয়ে গেল,জুড়ে দিলেন পাদটীকা। তাতে লিখলেন ‘আমার মতে বসুর নির্ধারণ পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ,আমি অন্যত্র দেখাব যে এখানে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তার থেকে আদর্শ গ্যাসের কোয়েন্টাম তত্ত্ব পাওয়া যায়। সাত মাসের মধ্যে আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গণনা পদ্ধতি শুধু আলোক-কণিকাদের ক্ষেত্রে নয় বস্তু কণিকাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেজন্য প্রথম দিকে এই পদ্ধতিকে ‘বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন’ বলা হলেও পরে শুধু বোস সংখ্যায়ন বলা হয়।

শৈশবেই সত্যেন বসুর মধ্যে দেশপ্রেম সঞ্চারিত,অনুশীলন সমিতি যে ব্যায়ামাগার পরিচালনা করতো সেটি ছিলা বিপ্লবীদের গোপন কর্মকেন্দ্র,তারাই ১৯০৯সালে কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে বয়েজ ইন লাইব্রেরি স্থাপন করে গোড়া থেকে তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সত্যেন বসু। রবীন্দ্রনাথ ছক-বাঁধা শিক্ষাপদ্ধতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না,সত্যেন্দ্রনাথ বসু উপেক্ষা করেছিলেন ডক্টরেট ডিগ্রি। তার বাড়িকে প্রশান্ত মহালানবিশের স্ত্রী বর্ণনা করেছেন শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় বলে সবার জন্য অবারিত দ্বার,সব মানুষ সেখানে যেতে পারতেন,যারা নিয়মিত যেতেন তারা সাক্ষী তার বেড়াল বেষ্টিত হয়ে আহার। পাতে যতোটা মাছ থাকুক পাঁচ ভাগের চার ভাগ ওই বেড়ালদের জন্য বরাদ্দ থাকত। খেয়ে-দেয়ে একটি পান খেয়ে বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু বিশ্রাম কীভাবে নেবেন, লোকের আনাগোনা যে তখনও লেগেই আছে। কেউ না কেউ উপস্থিত হতেন,তাদের কথা শুনতেন,নিজের মতামত দিতেন আর বড় মেয়ে নীলিমা দেবীকে হেঁকে বলতেন,‘নিলু -মা বা কে আছিস এখানে জল মিষ্টি দিয়ে যা। অনেকের মতে তার নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত ছিলো,হতে পারতেন আরও অনেক আবিস্কারের স্রষ্টা। সেই মানুষ পদার্থবিজ্ঞানে তার বিশ্বখ্যাত অবদান বোস সংখ্যায়নের পঞ্চাশতম পূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সন্মেলনে এসে কি অবলীলায় বলে দিয়েছিলেন বিশ্ববিজ্ঞানীদের কাছ থেকে আমি আজ এতো সমাদর পেলাম,মনে হয় আমার বাঁচবার আর প্রয়োজন নেই,কিন্তু তিনি অমর হয়ে আছেন বোসন কণার মাধ্যমে। গ্রন্থঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার- নানা চোখে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু,সংকলন ও সম্পাদনা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত