প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শামীম আহমেদ: রাতজাগা জরুরি সেবাদানকারী পেশার মানুষদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা

শামীম আহমেদ: স্কুলে থাকতে সারাজীবন মাগরিবের আজান শুনলে বাসায় ঢুকতে হবে, এটা জানতাম- এই নিয়মের কোনো হেরফের হয়নি। নটর ডেম কলেজে যখন পড়ি বন্ধুরা গাড়িতে করে মদের বোতল নিয়ে ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াইছে নববর্ষের মধ্যরাতে। আমি বিছানার মধ্যে মশারির নিচে শুয়ে শুয়ে আতশবাজির শব্দ শুনছি। আমার অনুমতি ছিলো না মাগরিবের পরে বাইরে ঘোরার বা মধ্যরাতের পর মদ খাইতে খাইতে ঢাকা শহরে ঘোরার। জীবনে তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। শাহবাগ আন্দোলনের সময় বহু রাত বাইরে ছিলাম। রাজাকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। তখন পরিণত হইছি, বিশ্ববিদ্যালয় পাস দিছি, রাতে মশাল জ্বেলে দেশের পক্ষে আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বাইরে রাত কাটানোর মর্মার্থ বুঝছি। এর বাইরে দুয়েক রাত বন্ধুদের সঙ্গে রাতে বাইরে কাটাইছি। এমন আহামরি কিছু পাইনি।

রাত বাইরে কাটাইলে নিজেকে আলগা কোনো স্বাধীন মনে হয়নি। রাত ২টার দিকে হাই তুলতে তুলতে বাসায় ফিরে আসছি। এখন যখন বিদেশে আসছি, বাসার পাশের বিল্ডিংয়ে মদের দোকান। আড়াই ডলারে বিয়ারের বোতল, দেড় ডলারে পানির বোতল পাওয়া যায়। ওই পরিমাণ টাকা পকেটেও থাকে। কিন্তু ছোটকালে যে ধর্মীয় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, বাপ-মায়ের শিক্ষা – সেগুলা কাজে আসছে। পরিমিতিবোধ আসছে। মদ খাবো না পানি খাবো বা খাইলে কেন খাবো কী পরিমাণে খাবো – সেটা নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থা আছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই পরিমিতিবোধ থাকে না। তখন সামাজিক বার্তাগুলো মাথায় গেঁথে দেয়াটা কাজে আসে। তারপর পরিণত হলে যে যার মতো সেটার কর্তন বা পরিবর্ধন করে নিতে পারেন। কিন্তু সামাজিকভাবে এই বার্তাগুলো না দিলে পরবর্তীতে আর পরিমিতিবোধটা গড়ে উঠে না। তাই অল্প বয়সে ওই নিয়ন্ত্রণ দরকার ছিলো। এখানে যখন ইচ্ছা বাসার বাইরে যাইতে পারি, সারারাত বাইরে কাটাইতে পারি। কিন্তু তেমন ইচ্ছা করে না। মাঝে মাঝে ভ্যাকেশনে ঘুরতে গেলে রাত ২-৩টা পর্যন্ত বউ বাচ্চা নিয়ে বাইরে ঘুরছি, কিন্তু সারারাত বাইরে ঘুরতে হবে এমন মনে হয়নি। আর বার-পাব-স্ট্রিপ ক্লাব, ব্রোথেল সারারাত খোলা থাকে। আপনি তো প্রতি রাতে সেখানে যাবেন না!

লন্ডনে যখন প্রথম গেছিলাম ২০০৪ সালে, দেখি সন্ধ্যা ৬টায় দোকান পাট সব বন্ধ। আমি অবাক। মিটিং ৫টায় শেষ করে ৬টায় মার্কেট বন্ধ হইলে কেমনে কী? আস্তে আস্তে বুঝলাম দোকানদারদেরও পরিবার আছে, বন্ধু আছে, তাদেরও সেখানে সময় দিতে হয়। তারা দেয়। তবে ভ্যাকেশনের সময় রাত ১২টা পর্যন্ত স্ট্রিট শপ, নৌকায় ঘোরাঘুরি আর বার-ক্লাব-স্ট্রিপ ক্লাব, ব্রোথেল সারারাত খোলা থাকে। এছাড়া তেমন কিছু রাতে খোলা থাকে না। দু’একটা খাবার দোকান ছাড়া টরোন্টো শহরও ১০টার পর সুনসান হয়ে যায়। মাঝে মাঝে হাঁটতে বের হলে মধ্যরাতে দেখি পার মাতালরা ড্রাগ নিয়ে শুয়ে শুয়ে চিৎকার করছে, মদের বোতল ছুঁড়ে মারছে, এর বেশী কিছু না। তবে বছরে দু-একদিন সারারাত আর্ট এক্সিবিসন হয়, খুবই রেয়ার সেসব ঘটনা, ৩৬৫ দিনে হয়ত ৩-৪ দিন। সেসব রাতে বউ-বাচ্চা-জামাইরা হাত ধরা ধরি করে, ব্যাচেলর-বন্ধুরা গল্প করতে করতে ঘোরে, শিল্প-সাহিত্য দেখে, আইসক্রিম-হট ডগ খায়, ভালো লাগে দেখতে। উইকেন্ডে রাত ২-৩টা পর্যন্ত অবশ্য রাস্তাঘাটে কিছু মানুষকে মাতলামি করতে দেখা যায়। সেই সময় কোনো কারণে রাস্তায় বের হইলে একটু সাবধানে হাঁটতে হয়, নাহলে ভাঙা মদের বোতলে পা কাটতে পারে। এছাড়া সারারাত কাজ করে জলিল ভাই, রহমান ভাই, জয় ভাই। এরা আমার বিল্ডিং এর সিকিউরিটি।

বাংলাদেশ থেকে আসছেন ইমিগ্রেশনে। এখন এখানে কাজ করেন। ভালো মানুষ। সংসারের প্রয়োজনে সারারাত জেগে থাকেন। এছাড়া জেগে থাকেন উবার ড্রাইভাররা, ডাক্তার বন্ধুরা, নার্সরা, পুলিশরা। কেন জেগে থাকেন? যদি কেউ অসুস্থ হন তার চিকিৎসা দেবার জন্য ডাক্তাররা জেগে থাকেন, রাতে জেগে থাকা সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার যাতে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষরা না হয়, তাই জেগে থাকেন পুলিশরা। আর জেগে থাকে অল্পবয়স্ক কবিরা। তারা কবিতা লেখেন। রাতের বেলা জেগে থাকা কবি-সাহিত্যিক-পুলিশ-ডাক্তার-নার্স-সিকিউরিটি গার্ডসহ জরুরি সেবা দানকারী নানা পেশার মানুষদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত