প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রিস্টিয়ান কোনিগজেগ: জেদ থেকেই যখন এলো বিশ্বের দ্রুততম গাড়ি

রোর বাংলা : আমাদের মাঝে কতজনই নিজেদের স্বপ্নকে ছুঁতে বা ধরে রাখতে পারি? যে ছেলেটা একসময় বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিল, সে পরবর্তীতে হয়ে ওঠে অন্যকিছু, জীবনের যাঁতাকলে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায় অনেকের। তবে আজ বলা হবে এমন একজনের গল্প যে শুধু তার স্বপ্ন পূরণই করেনি, কঠিন সব বাধা-বিপত্তি আসার পরেও ছিল লক্ষ্যে অবিচল। পাঁচ বছর বয়স থেকে দেখা স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন বাইশ বছর বয়সে এসে। তৈরি করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম গাড়ি। আজ আপনাদের শোনানো হবে ক্রিস্টিয়ান কোনিগজেগের গল্প।

কোনিগজেগের পুরো নাম ক্রিস্টিয়ান এরল্যান্ড ভন কোনিগজেগ, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোম শহরে। রাজপরিবারের সাথে কোনিগজেগের যোগসূত্র রয়েছে।

কনিগজেগ নামটির উৎপত্তি একাদশ শতাব্দীতে, যখন কোনিগজেগের পূর্বপুরুষেরা জার্মান আর্মির জন্য লড়াই করেছিল। এরপর পঞ্চদশ শতাব্দীতে লুটোল্ড ভন কোনিগজেগকে ‘কোট অভ আর্মস’ পদকে ভূষিত করা হয়। এই পদকটি পরবর্তীতে তাদের পরিবারে থেকে যায় এবং পরিণত হয় কোনিগজেগ কার কোম্পানির লোগোতে।

পাঁচ বছর বয়সে ফ্লাক্লিপা গ্রান্ড প্রিক্স দেখে গতির প্রতি ভালবাসা জন্মে কোনিগজেগের। এটি ছিল একটি অ্যানিমেটেড সিনেমা যেখানে একজন সাইকেল মেরামতকারী একটি গাড়ি তৈরি করে ফর্মুলা ওয়ান ড্রাইভারকে হারিয়ে দেয়। কৌতূহলী এই ছেলেটি যেকোনো ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র পেলেই সেটি খুলে ফেলত এবং সেটিকে আরও উন্নত কীভাবে করা যায় সেই চিন্তাই করত।

সাত বছর বয়সে তিনি তৈরি করেন তার প্রথম রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি। এরপর আট বছর বয়সে একটি নষ্ট মোটরসাইকেল কিনে সেটিকে পুনর্নির্মাণ করেন এবং মাত্র পনের বছর বয়সে হয়ে ওঠেন ব্যবহৃত ও পুরনো মোটরসাইকেল বিক্রেতা। স্কুল-কলেজে কোনিগজেগের পরিবারের তেমন আগ্রহ ছিল না, তারা সবাই ব্যবসায়িক মানসিকতার ছিলেন। তাই কোনিগজেগের পথে পরিবার থেকে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি, বরং সহযোগিতাই পেয়েছিলেন।

১৮ বছর বয়সে কনিগজেগ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিকে বেশ মনোযোগ দেন। তিনি ভেবেছিলেন- একসময় কম্পিউটার চিপে হাজারো সিডির সমপরিমাণ গান রাখা যাবে, তাই Chip Player নামে একটি যন্ত্রের চিন্তা করেন এবং প্যাটেন্টেরও খোঁজ করেন। কিন্তু সেসময় কেউ তেমন আগ্রহ দেখায়নি বলে তিনি এটি ছেড়ে দেন। অথচ পরবর্তীতে এটিই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৯১ সালে তিনি যান বেলজিয়ামে, তার শ্বশুরবাড়িতে। তার শ্বশুর একটি ফ্লোরিং কারখানা চালাতেন। কোনিগজেগ তাকে জিজ্ঞাসা করেন- ফ্লোর বোর্ড কীভাবে তৈরি করা হয়। শ্বশুর তাকে পদ্ধতিটি দেখালে তিনি একে ‘পুরাতন’ বলে অভিহিত করেন এবং একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করে দেখান যার নাম দেন ‘ক্লিক’। তার এই পদ্ধতিতে ফ্লোর বোর্ড তৈরি ও খুলতে অনেক সুবিধা ও কম সময় লাগতো। ক্লিক নামকরণের কারণ হচ্ছে এগুলোতে পা রাখলে ক্লিক করার মতো শব্দ হতো। কিন্তু এবার তার শ্বশুরও তেমন আগ্রহ দেখালেন না।

কোনিগজেগ ঘেঁটে দেখলেন পূর্বে কেউ এমন আইডিয়া নিয়ে আসেনি। তিনি আরও কয়েকটি কোম্পানির কাছে গেলে তারাও তাকে ফিরিয়ে দেন। ১৯৯৩ সালে স্টকহোমের এক দোকানে গিয়ে তার এই ক্লিক ফ্লোর দেখতে পান। বাসায় এসে নেট ঘেঁটে দেখেন, একটি বেলজিয়ান ও সুইডিশ কোম্পানি নতুন এই প্যাটেন্টটি করে রেখেছে। এই প্যাটেন্ট করা হয়েছে তার আইডিয়ার ৩ মাস পরে। প্যাটেন্টটি এরপর ২ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়ে যায় এবং বর্তমানে একটি বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

কোনিগজেগ খুবই হতাশ হয়েছিলেন, তবে তিনি তার স্বপ্ন এগিয়ে নেয়ার চিন্তা করতে থাকেন। তিনি জানতেন যে নিজের কিছু করতে গেলে অনেক অর্থের প্রয়োজন, তাই ১৯ বছর বয়সে তিনি খুলে বসেন এক ট্রেডিং কোম্পানি। এই কোম্পানির কাজ ছিল হিমায়িত মুরগি ও প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বিক্রয় করা। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কোনিগজেগ কার কোম্পানি।

তিনি যখন কোনিগজেগ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার বয়স মাত্র বাইশ বছর। তিনি জানতেন যে একটি গাড়ি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং চালানো কতটা কঠিন কাজ হতে পারে। যুবক বয়সে এমন কিছু করা অসম্ভবই বলা যায়। এছাড়া ফেরারি, বুগাটির মতো কোম্পানি থাকতে একটা নতুন গাড়ি কোম্পানির উঠে দাঁড়ানোর মতো চিন্তা সেসময় কেন, এখনও যুবক বয়সে কেউ ভাবতেই পারবে না। কিন্তু কনিগজেগের সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও জেদই তাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

প্রথম গাড়িটি তৈরির জন্য কোনিগজেগ নিয়ে বসলেন পুরনো সব কার ম্যাগাজিনের পাতা। একটি গাড়ির সকল যান্ত্রিক বিষয় জেনে স্বল্প খরচে স্বপ্নের গাড়ি তৈরি করাই ছিল তার চিন্তা। সব প্রচেষ্টা সম্পন্ন করে ১৯৯৬ সালে তিনি নিয়ে আসেন কোম্পানির প্রথম গাড়ির প্রটোটাইপ- The Koenigsegg CC।

কিন্তু গাড়ি বিক্রি করতে সময় লেগেছে আরও দীর্ঘ ৬ বছর। কয়েকটি প্রটোটাইপের পর Koenigsegg CC8S গাড়িটি তার প্রথম ক্রেতার মুখ দেখে এবং এক বছর পরেই গিনেজ বুকে বিশ্বের দ্রুততম গাড়ির ইঞ্জিন (৬৫৫ হর্সপাওয়ার) হিসেবে নাম লিখিয়ে নেয়। একই বছরে পুলিশের খাতায়ও নাম লেখায় গাড়িটি, টেক্সাসে ২৪২ মাইল/ঘন্টা গতিতে যাওয়ার জন্য টিকেট দেয়া হয় গাড়ির ড্রাইভারকে।

তবে ১৯৯৪ থেকে ২০০২ এই আটটি বছর কোনিগজেগের জন্য মোটেও সুখকর কিছু ছিলো না। অন্য কেউ হলে হয়তো মনোবল হারিয়ে ফেলতো, কিন্তু এ সময়টিকে কোনিগজেগ গ্রহণ করেছেন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হিসেবে। ২০০৩ সালে আরেকটি ধাক্কার সম্মুখীন হতে হয় কোনিগজেগকে। মারগ্রেটেটরপে অবস্থিত কোনিগজেগের কারখানায় আগুন লেগে যায়। দুর্ঘটনাটি ঘটে জেনেভা মোটর শো-র দু’সপ্তাহ আগে। ভাগ্যক্রমে কর্মীরা সব গাড়ি রক্ষা করতে সক্ষম হন।

২০০৪ সালে কোনিগজেগ নিয়ে আসে Koenigsegg CCR, পূর্বের মডেলের উন্নত সংস্করণ বলা যায় একে। মোট ৮০৬ হর্সপাওয়ারের গাড়িটি তখন নতুন এক রেকর্ড গড়ার অপেক্ষায়। ২০০৫ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুততম গাড়ির রেকর্ডটি ছিলো McLaren F1-এর, ১৯৯৮ সালে ৩৮৬.৪ কিমি/ঘন্টা গতি তুলে রেকর্ডটি দখলে নেয় ম্যাকলারেন।

নতুন এক রেকর্ড তৈরির জন্য ইতালির নারডো শহরে নিয়ে যাওয়া হয় নতুন Koenigsegg CCR-কে, প্রায় সপ্তাহখানেকের চেষ্টাতেও সফল হতে পারেনি CCR। অবশেষে শেষ দিনে এসে ৩৮৭.৮৬ কিমি/ঘন্টা গতি তুলে McLaren F1-এর রেকর্ডকে নিজেদের করে নেয় CCR। এরপরেই একে জেনেভা মোটর শো-তে পাঠানো হয়।

২০০৬ সালে অনেকটা CCR-এর মতো দেখতেই কোনিগজেগ তাদের পরবর্তী মডেল CCX নিয়ে আসে। তবে এটি পূর্বের মডেলগুলোর থেকে খানিকটা বড় ছিল। বিশ্বের সকল সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের কথা বিবেচনা করেই এটি তৈরি করা হয়। এই মডেলটিই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়। ২০০৭ এ CCXR নামে আরেকটি মডেল নিয়ে আসে কোনিগজেগ। এটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে চলতে পারতো। পরবর্তী সব মডেলেই কোনিগজেগ বায়োফুয়েল সমর্থিত একটি আলাদা লাইন আপ চালু করে, যেসব মডেলের শেষে R রয়েছে সেগুলো বায়োফুয়েল সমর্থিত। শুধুমাত্র চারটি CCXR ও দুটি CCX মডেল তৈরি করা হয়। এরপর আরও কয়েকটি লিমিটেড এডিশনের মডেল তারা নিয়ে এসেছিল।

২০১০ ছিল কোনিগজেগের জন্য একটি অবিস্মরণীয় সময়। সেই বছর তারা বাজারে ছাড়ে Koenigsegg Agera, যা তাদের ভাবমূর্তিই পাল্টে দেয়। নতুন ডিজাইন, স্টাইল, অ্যারোডাইনামিক্স এবং ইন্টেরিয়র মিলিয়ে এটি ছিল তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর গাড়ি। এছাড়া ৫ লিটারের টুইন টার্বো V8 ইঞ্জিন, ৭টি গতির ডুয়াল ক্লাচ ট্রান্সমিশন সমৃদ্ধ গাড়িটি ছিল কোনিগজেগের স্বপ্নের সেই গাড়ি। অ্যাগেরার সর্বমোট হর্সপাওয়ার ছিলো ৯৬০ এবং এটি জিতে নেয় ২০১০ এর টপ গিয়ার হাইপারকার অ্যাওয়ার্ড। অ্যাগেরার মাধ্যমে কোনিগজেগ এক নতুন জগতে প্রবেশ করে। এরপর তাদের আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

ক্রিস্টিয়ান কোনিগজেগ সবসময়ই পরিবেশের কথা মাথায় রাখতেন। এজন্য ২০১১ সালে আনা হয় Agera R, যা E-100 বায়োফুয়েলে চলতে পারতো এবং ১১৪০ হর্সপাওয়ার সম্পন্ন। এছাড়া এটি ত্বরণের (Acceleration) হিসেবেও কোনিগজেগের বাকি গাড়িগুলোকে হারিয়ে দেয়, ০-৩০০ কি.মি-তে যেতে এর সময় লাগতো মাত্র ২১.১ সেকেন্ড। তবে এ তো কেবল শুরু, ২০১৪ সালে কোনিগজেগ উন্মোচন করে Koenigsegg One:1। ওয়ান টু ওয়ান নামকরণের কারণ হচ্ছে এর ক্ষমতা এবং ভর ছিল সমান। ১৩৬০ কেজির এই গাড়িটি ছিলো ১৩৬০ হর্সপাওয়ার সম্পন্ন। ০-৩০০ কি.মি-তে পৌঁছাতে এর লেগেছিল মাত্র ১৭.৯ সেকেন্ড।

২০১০-১৭ পর্যন্ত কোনিগজেগ অ্যাগেরা মডেলগুলো বিক্রি করে, যা কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বিক্রির রেকর্ড। ২০১৭ ছিল কোনিগজেগের জন্য এক রেকর্ডময় বছর, নতুন ৫টি বিশ্ব রেকর্ড তৈরি করে তারা। সর্বোচ্চ ৪৫৭.৯৪কিমি/ঘন্টা গতি তোলে Koenigsegg Agera RS, যা বুগাটির রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দেয়। ০-৪০০ কি.মি-তে উঠতে সময় লাগে ৩৩.২৯ সেকেন্ড, যা পূর্বের রেকর্ডের থেকে ৩ সেকেন্ড এগিয়ে!

এর মাঝে ২০১৫ সালে Koenigsegg Regera উন্মোচন করা হয়। তিনটি ইলেক্ট্রিক মোটর, ভি-এইট ইঞ্জিন, এবং অত্যন্ত হালকা ব্যাটারি নিয়ে এর ক্ষমতা ছিল ১৫০০ হর্সপাওয়ারেরও বেশি। ৫ বছরে ৮০টি রিগেরা তৈরি করেছে কোনিগজেগ।

Koenigsegg Jesko Absolut তাদের সবচেয়ে দ্রুতগতির মডেল, যা উন্মোচন করা হয় ২০২০ সালের প্রথমদিকে। কোনিগজেগ দাবি করেছে- এর সর্বোচ্চ গতি হবে ৪৮৩ কি.মি/ঘন্টা। এটি সত্যি হলে আরেকটি বিশ্ব রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে কোনিগজেগ। এছাড়া Koenigsegg Gemera নামে এই প্রথম চার আসনের একটি সুপারকার উন্মোচন করেছে তারা, যেটিও ৪০০ কি.মি গতি তুলতে সক্ষম।

সুপারকার জগতে কোনিগজেগের প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাব নেই। বুগাটি, পোরশে, ল্যাম্বরগিনির মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো প্রতিবছরই নতুন গাড়ি নিয়ে আসছে। তার সাথে রয়েছে ইংল্যান্ডের ম্যাকলারেন, ইতালির পাগানি ও লেবাননের ডব্লিউ মোটরসের মতো কোম্পানিগুলোও। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নিয়ে কনিগজেগ বলেন,

আমরা আমদের গাড়িগুলোকে শুধু সবচেয়ে দ্রুতগতিরই নয়, সবদিক দিয়েই সেরা বানাতে চাই। আমরা প্রতিনিয়ত সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের চেষ্টা করি। এছাড়া প্রতিটি কোনিগজেগেরই স্বল্প সংখ্যক গাড়ি তৈরি করা হয় যা আমাদের প্রয়োজনীয় লভ্যাংশ এনে দেয়।

কোনিগজেগ যা করে দেখিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। গাড়িপ্রেমী ছাড়াও বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তিনি দেখিয়েছেন- কোনো কিছু মন থেকে চাইলে শত বাধা সত্ত্বেও সফল হওয়া সম্ভব।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত