প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যার চেয়ে লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুন

বণিক বার্তা: কেনাকাটায় মানুষের পছন্দের তালিকায় দ্রুতই জায়গা করে নিয়েছে ই-কমার্স। অনলাইনভিত্তিক এ প্লাটফর্মের ওপর ভর করে গতির সঞ্চার হয়েছে ক্রেডিট কার্ডে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বেশি লেনদেন করছেন। গত এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। যদিও এ সময়ে খুব বেশি বাড়েনি ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা। দেশে ক্রেডিট কার্ড বাজারের বড় অংশই চারটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মোট ক্রেডিট কার্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকের। কার্ড সংখ্যা বিবেচনায় শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও বিদেশী স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) মধ্যে ক্রেডিট কার্ড রয়েছে কেবল লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের। ক্রেডিট কার্ডের বাজারে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান পঞ্চম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯৭। চলতি বছরের জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৬। এ হিসাবে করোনাকালের এক বছরে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৯৯টি। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২০ সালের জুনে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৮৯৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে রেকর্ড ১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১৫ শতাংশ। অথচ ২০১৯ সালের জুনেও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। উচ্চসুদের এ ঋণের সাড়ে ৫ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের শুরুতে করোনাসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগের বড় ধাক্কা ক্রেডিট কার্ডের বাজারে লেগেছিল। মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বাজার সম্প্রসারণ ও গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারের ওপর। কিন্তু গত বছরের জুনের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে। করোনায় গৃহবন্দি মানুষ আগের তুলনায় ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে বেশি কেনাকাটা করেছে। পাশাপাশি কার্ড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের প্রবণতাও বেড়েছে।

দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী খাতের প্রায় অর্ধশত ব্যাংকের বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড সেবা রয়েছে। তবে এর মধ্যে বেসরকারি দ্য সিটি ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ৮৮৯। ক্রেডিট কার্ড বাজারের ২৯ দশমিক ২৯ শতাংশই ব্যাংকটির দখলে। জুন শেষে ক্রেডিট কার্ডে সিটি ব্যাংকের ঋণ স্থিতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গ্রাহক আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) কার্ডধারী।

এ প্রসঙ্গে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে সিটি ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। তবে এ শীর্ষস্থান নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো তৃপ্তি নেই। বরং আমরা সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৫০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের গ্রামগঞ্জে সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। এজন্য আমরা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পের সঙ্গে চুক্তি করেছি। সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড হবে কিউআর কোডভিত্তিক। গ্রামের বাজারে থাকা সিটি ব্যাংকের এজেন্টদের কাছেও আমাদের ক্রেডিট কার্ড পাওয়া যাবে।

 

ক্রেডিট কার্ড বিপণনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার। ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড ঋণের স্থিতি ৭৯০ কোটি টাকা। কার্ড সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। বাজারে এ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি। কার্ডধারীদের মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৫৮৯ কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে চতুর্থ স্থানে থাকা ব্যাংক হলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। বহুজাতিক এ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের ঋণের স্থিতি ৭৫০ কোটি টাকা।

দেশের ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড রয়েছে শুধু লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের। বাজারে এ প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের রয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। দেশের বড় বড় ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ক্রেডিট কার্ড বিপণন করা লংকাবাংলার অবস্থান পঞ্চম। জুন শেষে লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১০। এ গ্রাহকদের কাছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ৪০৭ কোটি টাকা ঋণ স্থিতি রয়েছে।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, মহামারীর কারণে অন্যান্য খাতের মতোই ক্রেডিট কার্ড সেবা ধাক্কা খেয়েছিল। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ড বাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বরং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেশি হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বাড়ার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগামীতে দেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজারে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি আসবে। সর্বোত্কৃষ্ট সেবা দেয়ার মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডের বাজার সম্প্রসারণ করতে লংকাবাংলা প্রস্তুত।

জনপ্রিয়তা বাড়লেও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার নিয়ে নৈরাজ্য ছিল বাজারে। কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশেরও বেশি সুদ আদায় করত। এ অবস্থায় ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদ ও সার্ভিস ফি নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদ ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের পর দেশের সব ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার কমিয়ে এনেছে। এতে গ্রাহকের মধ্যে কার্ডভিত্তিক ঋণ সেবাটির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত