প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অস্থিতিশীল আটা ময়দার বাজার

নিউজ ডেস্ক: প্রতিকূল আবহাওয়ায় ব্যাহত হয়েছে গমের বৈশ্বিক উৎপাদন। আগামী উৎপাদন মৌসুমেও একই পরিস্থিতি বজায় থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। উপরন্তু পণ্যটির বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনেও আঘাত হেনেছে মহামারীর প্রাদুর্ভাব। সব মিলিয়ে গমের আন্তর্জাতিক বাজার এখন পুরোদমে অস্থিতিশীল। এ অস্থিতিশীলতার প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে দেশের খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারেও। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে গম ও গমজাত পণ্য আটা-ময়দার দাম। বণিক বার্তা

বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ সংকটের কারণে গমের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল কয়েক মাস ধরে। এর মধ্যে মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম বেড়ে দাঁড়ায় রেকর্ড সর্বোচ্চে। সেখান থেকে বর্তমানে কিছুটা কমে এলেও এখনো স্থিতিশীলতা ফেরেনি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারের এ অস্থিরতার কারণেই দেশের বাজারে গম ও গমজাত পণ্যের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানাচ্ছেন, গত অর্থবছরেও দেশে গম আমদানি হয়েছে চাহিদার চেয়ে কম। এতে বাজারে এখন গমের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এরই প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দার উৎপাদন খরচে, যার ধারাবাহিকতায় গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বাজারে আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে মণপ্রতি কয়েকশ টাকা।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক মাস ধরেই এখানে গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ সময়ের মধ্যে পণ্যটির দাম বেড়েছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) গড়ে ২০০ টাকা। সর্বশেষ গতকাল এখানে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) পদ্ধতিতে কানাডা থেকে আমদানীকৃত ভালো মানের গম বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ১ হাজার ২৭০ টাকায়। পাশাপাশি বেড়েছে ভারত থেকে আমদানি করা গমের দামও। বর্তমানে এখানে ভারতীয় গম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১ হাজার ১০০ টাকায়।

ভোগ্যপণ্যের আরেক বড় পাইকারি বাজার নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে গতকাল কানাডীয় গম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে। এছাড়া প্রতি মণ ইউক্রেনীয় গম ১ হাজার ৪০ ও ভারতীয় গম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত এক মাসে এখানে কানাডীয় গমের দাম বেড়েছে মণে ৩০০ টাকা। এছাড়া ইউক্রেনীয় গমের দাম মণপ্রতি ১৪০ ও ভারতীয় গমের দাম বেড়েছে মণে ৫০-১৫০ টাকা।

লকডাউনের কারণে সর্বশেষ অর্থবছরে দেশে গম আমদানি কমে গেছে বলে মনে করছেন বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী। দেশে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গ্রুপটির চেয়ারম্যান বলেন, গমের সবচেয়ে বেশি চাহিদা বেকারি পণ্য উৎপাদন, ফাস্ট ফুড ও হোটেল-রেস্তোরাঁয়। ২০২০ সালের মার্চে লকডাউন শুরুর পর প্রায় দেড় বছর ধরে দেশে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে লকডাউনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এ কারণে ব্যবসায়ীরাও আমদানি কমিয়েছেন। তাছাড়া লকডাউনের কারণে বিশ্বব্যাপী গম উৎপাদন কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে ২০-৩০ শতাংশ। সার্বিকভাবেই দেশে গমের সাময়িক সরবরাহ সংকট রয়েছে। তবে নতুন করে আমদানি শুরু হলে দাম আবারো সহনীয় মাত্রায় চলে আসবে।

একই কথা বলছেন নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি শেখ ওয়াজেদ আলী বাবুলও। তিনি বলেন, বাজারে গমের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বাজারে গমের দাম মণে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। আমাদের মতো ছোট ছোট ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম থেকে গম এনে নিজস্ব মিলে ভেঙে আটা বা ময়দা উৎপাদন করে বাজারে পাইকারি দরে বিক্রি করেন। দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন চলার কারণে বেচাকেনা প্রায় বন্ধ ছিল। এখন লকডাউন উঠে গেলেও বাজারে গম আমদানি কম থাকায় মিলে ভাঙানোর মতো পর্যাপ্ত গম পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম খুবই বেশি।

গমের দাম বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে মণপ্রতি আটা ও ময়দার দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। গত দুই সপ্তাহে খাতুনগঞ্জে আটার দাম মণপ্রতি প্রায় ২০০-২৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪২০ টাকায়। অন্যদিকে ময়দার দাম মণপ্রতি প্রায় ২৫০-৩০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে বর্তমানে ভালো মানের আটা বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে এখানে পণ্যটির দাম বেড়েছে বস্তায় ১৫০ টাকা। কিছুটা নিম্নমানের আটা প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৮০ টাকায়। ভালো মানের ময়দা এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা (৭৪ কেজি) ২ হাজার ৬০০ টাকায়। সমপরিমাণের কিছুটা নিম্নমানের ময়দা বিক্রি হচ্ছে বস্তাপ্রতি আড়াই হাজার টাকায়।

এদিকে খোলা আটা-ময়দার দাম বাড়ায় বাজারে এখন মোড়কজাত আটা-ময়দার দামও ঊর্ধ্বমুখী। গত এক সপ্তাহে খুচরা বাজারে ব্র্যান্ডেড আটা-ময়দার দাম বেড়েছে কেজিতে ৩-৪ টাকা।

গমের সরবরাহ সংকটকেই এখন বাজারে আটা-ময়দার দামে ঊর্ধ্বগতির জন্য দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে নিতাইগঞ্জের আটা, ময়দা ও গম ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন মৃধা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া করোনার সময় বাংলাদেশের আমদানিকারকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গম আমদানির ঝুঁকি নেননি। যেসব দেশে গম উৎপাদন হয়, তারাও গম সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে বাজারে গমের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত এক অর্থবছরের ব্যবধানে দেশে গম আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি। সর্বশেষ অর্থবছরে (২০২০-২১) দেশে গম আমদানি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৩ লাখ টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ কম।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে মূলত কানাডা, ভারত ও রাশিয়ান গমের চাহিদাই বেশি। এর মধ্যে গম থেকে আটা-ময়দা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় কানাডীয় গম। দীর্ঘদিন গমের ডিও লেনদেন কিছুটা স্থবির থাকলেও বর্তমানে হঠাৎ করেই গমের বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে। সারা দেশে বর্ষা মৌসুমের পর আটা ও ময়দার চাহিদা বেড়ে যায়। শীত মৌসুমে পিঠা-পুলি তৈরি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণের কারণে আটা-ময়দার চাহিদা বেশি থাকে। এ কারণে বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে বাড়তি চাহিদা সামনে রেখে মজুদ ও ডিও বেচাকেনা বেড়ে গেলে দামও বেড়ে যায়। সংকটকালে কভিড ঝুঁকিতে বন্ধ থাকা দোকানপাট ও পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেয়ার কারণে হঠাৎ করেই আটা-ময়দার চাহিদা বেড়ে গেছে। ফ্লাওয়ার মিলগুলোতে গমের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে আমদানি কম হওয়া গমের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় গমের বাজার চাইলেই নিয়ন্ত্রণের সুযোগও নেই।

সর্বাধিক পঠিত