প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় আয় কমেছে সাধারণ মানুষের

নিউজ ডেস্ক: মহামারী করোনার দীর্ঘায়িত প্রভাবে আয়-উপার্জন কমে ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। জীবনের পাশাপাশি ঝুঁকিতে আছে দেশের সাধারণ মানুষের জীবিকা। জীবন রক্ষার তাগিদে জীবিকা হারাচ্ছেন তারা। করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। একদিকে মানুষ জীবন নিয়ে শঙ্কায় কে, কখন আক্রান্ত হবেন, কিংবা আক্রান্ত হলে সুচিকিৎসা পাবেন কি না- এসব বিষয় নিয়ে। অন্যদিকে এ সময়টায় তেমন কোন কাজকর্ম না থাকায় রোজগার অনেক কমে গেছে। জীবন বাঁচাতে গেলে মানুষ জীবিকা সঙ্কটে ভুগছে। জনকণ্ঠ

আবার জীবিকার প্রতি নজর দিলে মানুষের জীবন হুমকির মুখে চলে যাচ্ছে। করোনার কারণে বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে গেছে সাড়ে ৩ হাজার শিশু। গত দেড় বছরে ২০ ধরনের নিত্যপণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৯৬ শতাংশ দাম বেড়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পথহারা হয়ে গেছে দেশের পরিবহন খাত। ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ জিডিপি করোনার পেটে চলে গেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সেশনজটে পড়ে যাচ্ছে। স্থবির হয়ে পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের (এসএমই) ব্যবসা-বাণিজ্যের খাত। এসএমই খাতের ৮০ লাখ প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে আসতে পারছে না। এতে করে অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে- এসএমই খাতের ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ হয়ে গেছে।

নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে ৮০ শতাংশ। এর এ কারণে শুধু এখাতে ৩৭ শতাংশ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে মন্দাভাব বিরাজ করছে। অবস্থায় জীবন বাঁচানো এবং জীবিকা বাঁচানো এ দুইয়ের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ সবার সামনে। করোনা থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সঙ্কট এখন দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে। টিকা আমদানি, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কিনতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে করে পিছিয়ে পড়ছে অবকাঠামো উন্নয়ন খাত।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। করোনা মোকাবেলায় কঠোর বিধিনিষেধের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে আর হয়তো কখনও কঠোর বিধিনিষেধের মতো কর্মসূচী দেয়া হবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে জীবন ও জীবিকায় যে সঙ্কট তৈরি হয়ে গেছে তা দ্রুত দূর করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা সংক্রমণের মুখে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে আছেন ছিন্নমূল খেটে খাওয়া মানুষ ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী। এ পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ভেঙ্গে খাওয়া মানুষদেরও এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা। একটু কম দামে পেতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ কিনতে টিসিবি এবং ওএমসের ট্রাকের সামনে ভিড় করছেন স্বল্প ও মধ্যবিত্তের মানুষ। গরিব মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার মতো কর্মসূচী থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য কোন প্রণোদনা প্যাকেজ রাখা হয়নি। এ কারণে চরম আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবন বনাম জীবিকার কঠিন বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দ্রুত দেশের সবাইকে করোনার টিকা দিতে হবে। জীবন এবং জীবিকা দুটিই এ মুহূর্তে সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ দুটোই মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সবচেয়ে বড় বিষয়, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এখন সাধারণ মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দিতে হবে। চলতি বাজেটে করোনা মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার শতভাগ বাস্তবায়ন দরকার। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নেরও তাগিদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বিধিনিষেধের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। খুলে দেয়া হয়েছে রফতানিমুখী শিল্পখাতসহ সব ধরনের উৎপাদনমুখী কারখানা। মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের মুখে গত দেড় বছরের বিভিন্ন সময়ে লকডাউন, কঠোর লকডাউন এবং কঠোর বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে। এতে করে ছোট ছোট উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিক্সাচালক, ভ্যানচালক, সিএনজিচালক ও পরিবহন শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অর্থকষ্টে পড়েছেন। বেসরকারী খাতের অনেক কোম্পানি বেতন কমিয়ে দিয়েছে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেয়া হচ্ছে না এমনকি উৎসব বোনাসও নেই অনেক প্রতিষ্ঠানের। যারা কোম্পানির পণ্য বিক্রির ওপর কমিশন নিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন তাদের অবস্থা আরও খারাপ। করোনার কারণে জরুরী ও নিত্যপণ্য ছাড়া সব ধরনের বিলাসী পণ্যের চাহিদা কমে গেছে।

করোনার কারণে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু শহর নয়, গ্রামীণ এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারী করোনা দেশে বহুমাত্রিক সঙ্কট তৈরি করছে। এ সঙ্কট উত্তরণে জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ বিনির্মাণেই করোনার এই সময়ে সবচেয়ে বড় বাজেট দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ। আর এ কারণেই কোভিড-১৯ এর প্রভাব বিবেচনায় চলতি বাজেটে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। তিনি আরও বলেন, দেশের সকল মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের মাধ্যমেই মূলত অর্জিত হবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যসমূহ।

ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বেশি জরুরী ॥ করোনা সংক্রমণরোধে দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদান এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সবচেয়ে বেশি জরুরী বলে মনে করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার ৯০ ভাগ মানুষ করোনার টিকা নিয়ে ইতোমধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে স্বাভাবিক কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে। একই অবস্থা ইউরোপের দেশগুলোতে। যুক্তরাজ্যে অফিস-আদালতসহ সবকিছু খুলে দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ আবার স্বাভাবিক কর্মকান্ডে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশও দ্রুত দেশের সবাইকে করোনার ভ্যাকসিন দিয়ে স্বাভাবিক কর্মকা- শুরু করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, লকডাউনের চেয়ে বেশি জরুরী, যত দ্রুত সম্ভব দেশের মানুষদের করোনার টিকার আওতায় আনা। এ ধরনের লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আগে মানুষের জীবিকা নিয়ে যে উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল সেটি করা হয়নি। যতদিন করোনা থাকবে ততদিন দেশে বিনিয়োগ হবে না এটা ধরে নেয়া যায়। তাই এই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করাও কঠিন। এজন্য আমরা বলেছিলাম, দরিদ্রদের সরাসরি সহায়তা দিতে। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে অন্তত ১ কোটি পরিবারকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল, সেটি করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, করোনার প্রভাবে যারা নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে তাদের সহায়তা করা না হলে এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়বে। গত বছর করোনার প্রকোপ শুরুর পর দেশে বেসরকারী উদ্যোগে দরিদ্রদের সহায়তা করতে দেখা গেছে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব দরিদ্রদের বাঁচিয়ে রাখার কৌশল গ্রহণ করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

জীবন-জীবিকার সঙ্কটে সাধারণ মানুষ ॥ করোনায় জীবন-জীবিকার সঙ্কটে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এদেশে প্রায় আড়াই কোটি লোক মজুরি বা বেতনের ভিত্তিতে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োজিতদের সংখ্যা ১ কোটির বেশি। আরও আছেন পোশাকশিল্পের ৪০ লাখের মতো শ্রমিক, যাঁরা দৈনিক ভিত্তিতে না হলেও প্রায় সে রকম ব্যবস্থাতেই নিয়োজিত। এছাড়া আরও ৫০ লাখ শিল্পশ্রমিক, যাঁদের বিরাট অংশের অবস্থা দিনমজুরদের চেয়ে ভাল নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বনিয়োজিত হিসেবে চিহ্নিত মানুষ, কিন্তু যাঁরা ব্যবসা বা কাজের মাধ্যমে দিন এনে দিন খাওয়ার পর্যায়ে আছেন। এসব সংখ্যা থেকে কৃষি শ্রমিকদের বাদ দিলেও প্রায় ২ কোটির বেশি মানুষের জীবিকা করোনার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভার্নেন্স ডেভেলপমেন্ট-পাওয়ার পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (বিআইজিডি-পিপিআরসি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে ‘সাধারণ ছুটি’ চলাকালীন শহরের ৭২ শতাংশ দরিদ্র মানুষের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে, যা গ্রামের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, কাজ হারিয়ে যখন সাধারণ মানুষের দুর্বিষহ অবস্থা, তার ওপর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু শহর নয়, গ্রামীণ এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে।

বিবিএসের আরেক হিসাবে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৬ শতাংশের উপরে। সব মিলিয়ে গত আট মাসের মধ্যে জুনে দেশে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য করা গেছে। সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, গত বছর একই সময়ের তুলনায় রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রায় ২০ ধরনের নিত্যপণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৯৬ শতাংশ দাম বেড়েছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে সরু চালে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, মাঝারি আকারের চালে ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মোটা চালে প্রায় ১৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। বছরের ব্যবধানে খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন লিটারে ৪৫ থেকে বেড়ে ১৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এতে দাম বেড়েছে ৪১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। পাঁচ লিটারের সয়াবিনের বোতলে ২০০ থেকে বেড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বছরের ব্যবধানে ৪৩ দশমিক ১৬ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পাম তেল (লুজ) প্রতি লিটারে ৫০ থেকে বেড়ে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এতে বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৬২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এছাড়া করোনা শুরুর আগে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় ৭৪ শতাংশ অর্থ নিজ পকেট থেকে ব্যয় করতেন। সরকারীভাবে হাসপাতালগুলোতে যে খরচ করা হয় সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সেটি স্পষ্ট। করোনার এই সময়ে বাড়তি ব্যয় যোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ এর মতে, ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে মহামারী করোনাভাইরাস। বাংলাদেশেও এর প্রভাব তীব্রভাবে পড়েছে।

বেসরকারী আরও কয়েকটি গবেষণা সংস্থার মতে, বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে প্রায় ৪ কোটি পরিবার। এর মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ। মাঝের যে ৬০ ভাগ, এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এ সংখ্যা হবে আড়াই কোটি পরিবার। এর মধ্যে সরকারী চাকরিজীবী, মাল্টিন্যাশনাল ও বড় কোম্পানিতে কাজ করা কিছু মানুষ বাদে অন্যরা সবাই এখন চরম সঙ্কটে আছেন। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ আছেন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে। অনেকেরই নিয়মিত বেতন হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আবার যারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন তাদের বেশির ভাগই এখন কর্মহীন। সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস বলছে, করোনা মহামারীর আঘাতে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। আর বেসরকারী গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক ও পিপিআরসি বলছে, আগে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। এখন সেটা আরও ৫ শতাংশ বেড়ে ২৫ শতাংশে উঠেছে। সামনের দিনে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করে সংস্থা দুুটি।

করোনায় তৃতীয় ধাক্কার চ্যালেঞ্জ সামনে ॥ মহামারী করোনার প্রথম ধাক্কার পর দ্বিতীয় ঢেউ সামলানোর আগে পুরো বিশ্ব এখন ভাইরাসের তৃতীয় ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশও এ সঙ্কট থেকে মুক্ত নয়। জীবন-জীবিকার সঙ্কট সামনে রেখে তৃতীয় ধাক্কা সামলানোর জোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। দেশের সব মানুষকে করোনার টিকা দিতে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ থেকে টিকা আমদানি করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি টিকা উৎপাদনে যেতে উন্নত বিশ্বের কাছে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কাঁচামাল চায় বাংলাদেশ। আগামী দিনগুলোতে করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করোনার তৃতীয় আঘাত আসন্ন বলে সতর্ক করেছে সদস্যদেশগুলোকে। সেই মোতাবেক বাংলাদেশ সরকার করোনার তৃতীয় ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরেশোরে শুরু করে দিয়েছে। তবে জীবন বাঁচাতে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের কাজকর্ম। আয় কমেছে বেশির ভাগ মানুষের। জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে শ্রমজীবীদের। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন নগর-দরিদ্ররা। টিকতে না পেরে এখনও ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। বেড়েছে যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হতবিহ্বল সাধারণ মানুষ। এমনকি সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে গেছে। শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় কর্মসংস্থানের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। কমে গেছে সব ধরনের দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ।

এমনকি সরকারের অবকাঠামো উন্নয়নও অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, করোনার এই সঙ্কট থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে হলে ভ্যাকসিনেশনের কোন বিকল্প নেই। দেশের সবাইকে টিকা দিয়ে দেশকে করোনামুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় প্রণোদনা প্যাকেজের দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রণোদনার অর্থ বড় উদ্যোক্তারা পেলেও এখনও ছোট ও মাঝারি খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এই সুবিধার বাইরে রয়েছেন। এ কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আগে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আশার কথা, গণটিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বিদেশী উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও পোশাক খাতের ক্রেতারা বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। করোনা মোকাবেলায় সরকারের নীতিগত সহায়তাও আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এদিকে একদিকে করোনার আতঙ্ক, অন্যদিকে জীবিকার সঙ্কটে পড়েছেন ঘরবন্দী মানুষ। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজের খোঁজে ছুটছেন শ্রমজীবীরা। সরকারের পক্ষ থেকে কম মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হলেও তা অপ্রতুল। ফলে নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবন রক্ষার্থে নগদ সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত