প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চুক্তি করেও পরিশোধ করেনি সার্ভার বিল, হুমকির মুখে বিমানের অনলাইন মার্কেটিং

যুগান্তর: পর্দার আড়ালে সক্রিয় দুর্নীতিবাজ চক্র, বিল না দিলে আজই বন্ধ হচ্ছে বিমানের ওয়েব সার্ভার, ঝুঁকিতে পড়বে আয়ের ১২৫ কোটি টাকা।

রহস্যজনক কারণে দুই বছর ধরে অনলাইন ওয়েব সার্ভারের বিল পরিশোধ করছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিল পরিশোধ করতে মার্কেটিং বিভাগকে বারবার চিঠি দিয়েও সাড়া পাচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় আজ ১০ আগস্টের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে সার্ভার বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অ্যামাজন ওয়েব কর্তৃপক্ষ।

বিমানের আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্ভার বন্ধ থাকলে একযোগে অচল হয়ে পড়বে বিমানের সব ধরনের অনলাইন টিকিট বিক্রির কার্যক্রম। এতে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের বিপাকে পড়বে বিমান। হুমকির মুখে পড়বে বছরে কমপক্ষে ১২৫ কোটি টাকার অনলাইন টিকিট বিক্রির কার্যক্রম।

এ প্রসঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও অতিরিক্ত সচিব ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল সোমবার বলেন, ‘বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ নিয়ে বিমানের আইন বিভাগ কাজ করছে। লিগ্যাল ওপেনিয়ন পেলে ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’ সার্ভার বন্ধ হয়ে গেলে বিমানের ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিক কোনো কারণে যদি সাময়িক কিছু ক্ষতি হয় সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সুদূরপ্রসারী ফল আলাদা ক্যালকুলেশন বয়ে আনবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিমানের মার্কেটিং বিভাগের একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট অনলাইন মার্কেটিংয়ের বিরোধিতা করে আসছিল। তারা কোনোভাবেই চাচ্ছিল না অনলাইন মার্কেটিং থাকুক। এ কারণে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জ্যাপওয়েজ নামের একটি বিদেশি কোম্পানিকে বছরে ৪ কোটি টাকার বেশি বিল দিয়েও কার্যকর অনলাইন টিকিট মার্কেটিং করেনি বিমান। বর্তমানে বিমানের টিকিট বিক্রির মাত্র ৫ শতাংশ হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। অবশিষ্ট ৯৫ শতাংশ হচ্ছে গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন (জিডিএস) ও ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে।’

দেখা গেছে, অনলাইনে টিকিট বিক্রিতে বিমানকে কোনো ধরনের কমিশন দিতে হয় না। কিন্তু জিডিএস ও ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি হলেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে কমিশন ও চার্জ দিতে হয় সংশ্লিষ্টদের। যার একটি অংশ যাচ্ছে বিমানের মার্কেটিং বিভাগের অসাধু সিন্ডিকেটের পকেটে। বিষয়টি টের পেয়ে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে বাধ্য হয়ে অনলাইন মার্কেটিং শুরু করে বিমান। জ্যাপওয়েজকে বাদ দিয়ে নতুন করে অত্যাধুনিক সাইট তৈরি করা হয়। কারণ জ্যাপওয়েজের সফটওয়্যারটি ছিল ভুলে ভরা। সাইটটি থেকে রিফান্ড করা যেত না, টিকিট ইস্যু-রিস্যু করা যেত না, চালানো যেত না মোবাইল অ্যাপস। সেই সঙ্গে ভুলের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, এই খাতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতো বিমানের।

২০১৯ সালের মে মাসে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জ্যাপওয়েজের সঙ্গে করা চুক্তিটি বাতিল করে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ট্রাভেল শপ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বিমান। চুক্তি অনুযায়ী ট্রাভেল শপ ২০১৯ সালে আক্টোবর মাসে বিমানের মোবাইল অ্যাপস বাজারজাত করে ও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জ্যাপওয়েজকে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করে। এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত অনলাইন বিক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৫ কোটি টাকা। আর বিক্রীত টিকিটের সংখ্যা হয় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৭টি। আগামী এক বছরের মধ্যে এই বিক্রির পরিমাণ ৫শ কোটি টাকা ছাড়ানোর টার্গেটও দেয় তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে চালু করার প্রথমদিকে এবং ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জ্যাপওয়েজকে প্রতিস্থাপন করার পর কিছু ত্রুটি ধরা পড়লেও ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রায় নির্ভুলভাবে বিমানের সব ধরনের অনলাইন পরিসেবা চালু হয়। টিকিট বিক্রি ছাড়াও এই অনলাইনের মাধ্যমে যাত্রীরা ঘরে বসে অনলাইনের রিফান্ড, রি-ইস্যু, সিট সিলেকশন, বুক নাও পে-লেটার ছাড়াও নানাবিধ সুবিধা পাচ্ছিলেন। এতে দিন দিন বাড়ছিল অনলাইনের কদর।

কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, বিমানের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই অ্যাগ্রেসিভ অনলাইন মার্কেটিংয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এই খাতে থেকে তাদের কোনো ধরনের উপরি আয় হচ্ছিল না। একই সঙ্গে ওই সফটওয়্যার তৈরিতে বিমানের কোনো অর্থ খরচ হয়নি। এতে উপরি আয়েরও সুযোগ পায়নি কেউ। এ কারণে ঘুষ কমিশনভোগী শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি সচল ও সফলভাবে বাস্তবায়িত সফটওয়্যারটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র করে আসছিল। এর অংশ হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে ওয়েবসার্ভার, গুগুল প্লে-স্টোর, অ্যাপল অ্যাপস্টোরের কোনো বকেয়া বিল পরিশোধ করেনি। উলটো সিন্ডিকেট অন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় আরেকটি ই-কমার্স সফটওয়্যার কেনার পাঁয়তারা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিগগির এজন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। এমন প্রস্তুতি জোরেশোরে চলছে।

বিমানের ফাইন্যান্স বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১ বছর ৫ মাসে জ্যাপওয়েজ কোম্পানির সাইট থেকে কোনো আয় না হলেও বিমান চুক্তি অনুযায়ী তাদের ৪ কোটি টাকা বিল দেয়। অপরদিকে দেশীয় কোম্পানির সফটওয়্যার ব্যবহার করে এক বছরে ১২৫ কোটি টাকা আয় করলেও তাদের প্রাপ্য ৯০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করেনি। যদিও জ্যাপওয়েজ কোম্পানির সাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমানের এক বছরে সাশ্রয় হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাভেল শপের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিমানের মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন আহম্মেদকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তিনি তাদের বিল পরিশোধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বাধ্য হয়ে তারা নিজ খরচে এই টাকা পরিশোধ করে সাইটটি সচল রেখেছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান করোনাকালীন মন্দা পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে আর ক্লাউড সার্ভারের বিল প্রদান করা সম্ভব নয় বলে বিমানকে অবহিত করেন। তারপরও মহাব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন কোনো ব্যবস্থা নেননি। তিনি বলেন, মঙ্গলবারের মধ্যে যদি বিল পরিশোধ করা না হয় তাহলে তাদের পক্ষে বিমানের অনলাইন মার্কেটিং সচল রাখা সম্ভব হবে না।

বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক বোর্ড মেম্বার ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বিশ্বের অধিকাংশ এয়ারলাইন্স ব্যয় কমাতে জিডিএস নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে। বেশি জোর দিচ্ছে অনলাইন মার্কেটিংয়ের ওপর। অথচ বিমান তাদের প্রতিষ্ঠিত ও সফল ই-কমার্সকে কৌশলে বাদ দেওয়ায় পাঁয়তারা করছে। পাশাপাশি কমিশন ভাগাভাগি করতে নতুন ই-কমার্স সাইট কেনার চিন্তাভাবনা করছে। এটি রহস্যজনক এবং এর পেছনে অন্য কোনো ধান্ধা থাকতে পারে।’

দেখা গেছে, বিমানের নিজস্ব অনলাইন প্ল্যাটফরম থাকার পরও সিন্ডিকেট জিডিএসকে প্রতি সেগমেন্টে ৭ থেকে ১৪ ডলার গুনতে হয়। এর নেপথ্যেও মার্কেটিং বিভাগের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি জড়িত। এতে বিমানকে প্রতি মাসে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৬ থেকে ৮ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ কোটি টাকা। কিন্তু অনলাইনে বিক্রয় বাড়ালে এই খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। শুধু তাই নয়, ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে অনলাইনে টিকিট করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) সেবা পর্যন্ত চালু করার কোনো সুযোগ দেয়নি। যে কারণে গত দুই বছরে বিমান কমপক্ষে এক কোটি ডলার বা ৮৫ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এছাড়া সিন্ডিকেট বিমানের অনলাইন ই-কমার্স, লয়েলটি প্রোগ্রাম, ট্যাপ, অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি, করপোরেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের মাধ্যমে টিকিট ও অন্যান্য পরিসেবার কোনো প্রচার বা ডিজিটাল প্রমোশন করছে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে ট্রাভেল এজেন্সিকে সরাসরি অনলাইনে আকৃষ্ট করার জন্য বিদেশি এয়ারলাইনসসহ দেশি দুটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স এপিআই, হোয়াইট লেভেল এবং হলিডের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির প্রচারণা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জিডিএসকে নিরুৎসাহিত করতে বাজারে ওটিএ (অনলাইন ট্রাভেল এজেন্ট)-কে সরাসরি ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম ঘোষণা করছে। অথচ বিমানের এই অসাধু সিন্ডিকেট অনলাইনকে উৎসাহিত না করে উলটো ম্যানুয়াল টিকিট ইস্যু রি-ইস্যু এবং রি-ফান্ডের ব্যবস্থা বহাল রেখে চলছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত