প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রায় দুইশ বছর পর জাগলো মরা তিস্তা

নিউজ ডেস্ক: তিস্তা নদীর কিছুদিন আগেও কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কালের বিবর্তনে কোথাও ধানী জমি, কোথাও গো-চারণভূমি, আবার কোথাও পুকুর হিসেবে রূপ ধারণ করেছিল নদীটি। নদীর বুকে খেলার মাঠ বানিয়ে সকাল-সন্ধ্যা খেলা করত পাড়ার শিশু-কিশোররা। নদীর বুকে বাড়িও ছিল কোথাও কোথাও। চলতি বছর উদ্ধার হয়েছে মরা তিস্তা নদী। যুক্ত হয়েছে চিকলী ও যমুনেশ্বরী নদীর মূলধারার সঙ্গে। উদ্ধারের পর চলতি বর্ষা মৌসুমে পানিতে পরিপূর্ণ হয়েছে এ নদী।

এখন নদীর বুকে খেলা করে হাঁস। বেড়েছে বক, পাতি সরালী, মাছরাঙার আনাগোনা। শিকারের প্রতি তীক্ষষ্ট চোখে দেখা এসব পাখির দেখা মেলে মরা তিস্তায়। যমুনেশ্বরী নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে ফসল বোঝাই করে নৌকাও চলতে দেখা গেছে সদ্য উদ্ধার হওয়া এ নদীতে। জলের আধার, আমিষের উৎস, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে এ নদী অবদান রাখবে; বলছেন সচেতনরা। হারিয়ে যাওয়া মরা তিস্তা নদী হিসেবে তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। সমকাল

সরেজমিন পরিদর্শন, এলাকাবাসী ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা যায়, ১৭৭৬ সালের রেনেল মানচিত্রে প্রদর্শিত তিস্তার একটি শাখা পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার দক্ষিণাংশ থেকে প্রবাহিত হয়ে বর্তমান নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীটি নীলফামারী জেলা অতিক্রম করে রংপুর জেলার তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিঠাপুকুর উপজেলার শেষভাগে করতোয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। রেনেল মানচিত্রে এ নদীকে তিস্তা নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৮৭ সালে সংঘটিত ভূমিকম্প ও ভয়াবহ বন্যার ফলে তিস্তা তার গতিপথ পরিবর্তন করে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের নদীগুলো স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে। সমকাল

এ শাখা নদীটিও তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কালের বিবর্তনে শাখা নদীটির তিস্তা নামটি বিলুপ্ত হয়ে এলাকাভিত্তিক দেওনাই, চাড়ালকাটা ও যমুনেশ্বরী নামে পরিচিতি পায়। সময়ের পরিবর্তনে অনেকে নদীর মালিক হয়ে যায়। এ নদীটি এক সময় মানুষের বসতভিটা, পুকুর, ধানী জমি, গো-চারণভূমিতে পরিণত হয়। আগে বন্যার সময় এটি চিকলী ও যমুনেশ্বরী নদীপ্রবাহের সমতা বজায় রাখত। সে প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর উপজেলার প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতা ও বন্যাকবলিত হয়। এ ছাড়াও বন্যার সময় চিকলী নদীর পানি নিস্কাশনের অভাবে উপজেলা সদরসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো প্লাবিত হয়ে মানুষের বাড়ি-ঘরে পানি প্রবেশ করে। নদী না থাকায় অনেক মৎস্যজীবীর পেশা হারিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্পের (ইআইআরপি) মাধ্যমে খাল, ছোট নদী খনন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বদরগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া মরা তিস্তা নদীর প্রবাহ এলাকা শনাক্ত করে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদীটি খনন করা হয়। উৎসমুখ চিকলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করে বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ, সর্দারপাড়া, বানিয়াপাড়া, কুমারপাড়া, শংকরপুর, ঝাড়পাড়া, সরকারপাড়া, কালুপাড়া ও বৈরামপুর অতিক্রম করে কুতুবপুর ইউনিয়নের কাঁচাবাড়ীর পূর্বদিকে কুঠিপাড়া ঘাটের কাছে যমুনেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়। এতেই প্রাণ ফিরে পায় মরা তিস্তা নদী। পাড় সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নে এ নদীতীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ কার্যক্রম চলমান।

কালুপাড়া ইউনিয়নের শংকরপুর ডাংগারপাড়ার গ্রামের কৃষক ইউনুস মণ্ডল বলেন, ‘বাপ-দাদার আমলোত এইটা নদী আছিল। নদীত পদ্ম আছিল, মাছ ধরছিনু। এলাকার মানুষ কোদাল দিয়া মাটি চোটেয়া নদী সামান করছে। ইরি ধান লাগাইছিল। কিছুদিন আগোত নদী খোঁড়ছে। এল্যা নদীত পানি আছে। পদ্ম ফুটবে, নদীর পানি ধানবাড়িত দিমো। ঠান্ডা আবহাওয়া থাকবো। বেশি অক্সিজেন পামো, জ্বর হবার নায়। বড় বড় পাখি আসবো। বড় নদী থ্যাকি মাছ এই নদীত ঢুকবো। পাড় দিয়া গাছ নাগাইলে সোন্দর একনা পরিবেশ হইবো।

কালুপাড়ার কৃষক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আগে নদীটি খালের মতো ছিল। খনন করার পর ভালো হয়েছে। আমরা যারা নদীর পাশে আবাদ করি, তাদের জন্য অনেক সুবিধা। বৃষ্টির দিনে জমিতে পানি বেশি জমে গেলে সেটি দ্রুত নদীতে নামিয়ে ফসল বাঁচানো যাবে। কারও পুকুরে পানি বেশি হলে সেই পানি নদীতে দিয়ে মাছ রক্ষা করা যাবে। নদীর দু’ধারে গাছপালা লাগানো হচ্ছে। মানুষ নদীর পাড় ধরে হাঁটতে পারছে। খুবই ভালো পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, মরা তিস্তা নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। আমরা মানচিত্র ধরে মাঠ পর্যায়ে পরির্দশন করেছি। স্থানীয় অধিবাসীরা নদীর বিভিন্ন অংশ কৌশলে নিজ নামে রেকর্ড করেছিল। তাই এ নদী খনন ও উদ্ধার আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে একাধিক সভা করে তাদের জীবনে নদীর গুরুত্ব বুঝিয়েছি। তারা বুঝে স্বেচ্ছায় নদীর জমি ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে আমরা স্বল্প সময়ে এ নদী খনন করে চিকলী ও যমুনেশ্বরীর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পেরেছি। যুগ যুগ ধরে এর সুবিধা স্থানীয়রা ভোগ করতে পারবেন।

বিএমডিএর ইআইআরপি প্রকল্পের পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, মরা তিস্তা নদী উদ্ধারের ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা নদীর সুফল ভোগ করতে পারছেন। প্রতিদিন গৃহস্থালি কাজে পানি ব্যবহার, হাঁস পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি সেচ মৌসুমে জলাধার, গরিব মানুষের আমিষের উৎস হিসেবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে এটি যুগ যুগ ধরে অনন্য অবদান রাখবে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত