প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোরবানির জন্য পশু নির্বাচন এবং ইসলামে কুরবানির ইতিহাস

হাসান তাকী: ‘কোরবানি’ অর্থ উৎসর্গ, উপঢৌকন, সান্নিধ্য লাভের উপায়, ত্যাগ করা, পশুত্বকে বিসর্জন ইত্যাদি। হজরত ইবরাহিম (আ.) তার ছেলে হজরত ইসমাইলকে (আ.) আল্লাহর শানে কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। সেই থেকে ইসলাম ধর্মে কোরবানি প্রচলন শুরু হয়, এমন ধারণাই বহুল প্রচলিত। তবে ওই ঘটনাই ইসলাম ধর্মে প্রথম কোরবানির ঘটনা নয়। কারণ, ইসলাম ধর্মের প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) এর সময়ও কোরবানির প্রথা প্রচলিত ছিল। আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসির দামেস্কির মতে, আদম তাদের দুজনকে (হাবিল এবং কাবিল) কোরবানি করার আদেশ দিয়ে নিজে হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান আদম চলে যাওয়ার পর তারা কোরবানি করেন। হাবিল একটি মোটা তাজা বকরি কোরবানি করেন। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবিল কোরবানি দেন নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয়। আর কাবিলের কোরবানি অগ্রাহ্য করে (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২১৭)।

সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক ওয়াজিব। সাধারণত উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। অন্যান্য পশু দ্বারা কোরবানি নাজায়েজ। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সামর্থ্যবান মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছি। জীবনোপকরণ স্বরূপ তাদের যেসব ‘বাহিমাতুল আনআম’ দিয়েছি সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা হজ, আয়াত ৩৪।)

হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাদ্বিযাল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্যক্তিটি তখন একটি বকরিকে কান ধরে টেনে হিঁচরে নিয়ে যাচ্ছিল। রাসূল বললেন, তুমি তার (বকরির) কান ছেড়ে দাও, ঘাড় ধরো। (ইবনে মাজা শরীফ, ৩১৭১) কারণ, কান ধরে টানা-হেঁচরার ফলে বকরিটির বেশি কষ্ট হচ্ছিল, ঘাড় ধরে টানলে এতোটা কষ্ট হবে না। কোরবানির পশুর সাথে তো কোরবানিদাতার এর চেয়েও ভালো আচরণ করা উচিত, যেহেতু কোরবানির পশু কেবল পশু নয়, আল্লাহর নিদর্শন।

কোরবানির পশু হতে হবে দোষ-ত্রুটিমুক্ত। পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে না সেগুলো হচ্ছে, ১. দৃষ্টিশক্তি না থাকা। ২. শ্রবণশক্তি না থাকা। ৩. অত্যন্ত দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ হওয়া। ৪. এই পরিমাণ লেংড়া যে জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম। ৫. লেজের বেশির ভাগ কাটা। ৬. জন্মগতভাবে কান না থাকা। ৭. কানের বেশির ভাগ কাটা। ৮. গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া। ৯. পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া । ১০. বেশির ভাগ দাঁত না থাকা। ১১. রোগের কারণে ¯তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া। ১২. ছাগলের দুটি দুধের যেকোনো একটি কাটা। ১৩. গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা।
মোটকথা, কোরবানির পশু বড় ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হবে। হাদিসে এসেছে, চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি হবে না। অন্ধ, যার অন্ধত্ব স্পষ্ট; রোগাক্রান্ত, যার রোগ স্পষ্ট; পঙ্গু, যার পঙ্গুত্ব¡ স্পষ্ট ও আহত, যার কোনো অঙ্গ ভেঙ্গে গেছে ( ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৪৪)

কোরবানির পশু কেমন হবে এ সম্পর্কে হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চেষ্টা করবে কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট বয়সের পশু নির্বাচন করতে। যদি না পাও তাহলে ছয় মাসের দুম্বা কোরবানি করতে পার। (মুসলিম।)

কুরবানির পশু পরিপূর্ণ বয়সের হতে হবে। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জররি। আর তাহলো উট পাঁচ বছরের হতে হবে, গর-মহিষ, দুই বছরের হতে হবে, ছাগল-ভেড়া-দুম্বা এক বছর বয়সের হতে হবে।

শরিয়তের বিধান হল, হৃষ্টপুষ্ট, বেশি গোশত, নিখুঁত এবং দেখতে সুন্দর এমন পশু কোরবানি করা। কোরবানির পশু সব ধরনের দোষ-ত্রুটিমুক্ত হওয়া চাই।

ইমাম মালিক (রা.) মতে, কুরবানির জন্য সর্বোত্তম পশু হল শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের দুম্বা কুরবানি করেছেন বলে বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে।

যেসব ত্রুটি থাকলেও কোরবানি দেওয়া যাবে সেগুলো হচ্ছে। ১. পশু পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমতো খায়; ২. লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে বেশির ভাগ অংশ আছে; ৩. জন্মগতভাবে শিং নেই; ৪. শিং আছে, তবে ভাঙা; ৫. কান আছে, তবে ছোট; ৬. পশুর একটি পা ভাঙা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে; ৭. পশুর গায়ে চর্মরোগ, ৮. কিছু দাঁত নেই, তবে বেশির ভাগ আছে, জন্মগতভাবে এক অকোষবিশিষ্ট পশু; ৯. পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম, ১০. পুরষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম। এ সমস্ত পশুর দাঁড়া কোরবানি হয়ে যাবে কিন্তু মাকরুহ্ হবে। তবে উত্তম হচ্ছে ত্রুটিমুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া, ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কোরবানি না দেওয়াই ভালো।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমারা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, আপনাকে অবশ্যই কোরবানির পশু কেনার আগে পশুর কোন সমস্যা আছে কিনা সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সমস্যা থাকলে সে গরু থেকে এড়িয়ে যাওয়া উচিৎ।

 

সর্বাধিক পঠিত