প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমজাদ আমু: করোনায় সরকারী চাকুরীজীবিরাই সুখী বেসরকারীদের বেহাল দশা

বেসরকারি চাকুরীজীবিদের বেহাল দশায় দিন কাটছে। শহরের অলি-গলিতে চাকুরি হারিয়ে বেকার যুকবদের গুরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই ছিল খুব ব্যাস্থ। কিন্তু এখন খুজে পাচ্ছে না বেঁচে থাকার অর্থটুকু। শতশত যুবক প্রাইভেট কোম্পানির ভালো বেতনের চাকুরী হারিয়ে বেকার বাসায় বসে দিন গুনছে। কবে, কখন আবার চাকুরীতে যোগ দিবে।

কথা হচ্ছিল.ফোনে..রাজধানী বাড্ডার একযুবকের সাথে, তিনি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ৩৫ হাজার টাকা বেতনে চাকুরী করতেন। তিনি মার্চে পুরো বেতন পেলেও তারপর পর থেকে আর পুরো বেতন পান নি। অর্ধেক বেতন পান মাসের দশ তারিখে। এভাবেই চলছে তার গতকয়েক মাস। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে চলছিল সুখের সংসার। কিন্তু মাসের বেতনে আটকে গেছে পুরো জীবন। মাসে বাসা ভাড়া ১০ হাজার ছেলে আর মেয়ের স্কুলের বেতন দিয়ে মোটামুটি সংসার ভালোই চলছিল। গত দু’মাস আগে পরিবারকে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালিতে রেখে এসেছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শহরের আনা আর হবে না। তিনি জানান, পুরো বেতন না পেলে পরিবার এসে কি ভাবে চলবে..! তাই খুবই চিন্তায় পড়ে গেছি। ছেলে, মেয়ের পড়াশুনা পুরোই গেছে। কথাগুলো বলতে বলতে কেদেঁ দেয়…।

আগামী মাস থেকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়ে দিয়েছি।’ শুধু তিনিই নন, রাজধানীর অনেক বেসরকারি চাকরিজীবির একই অবস্থা। চরম সংকটে পড়েছেন তাঁরা। বাড়িভাড়া দিতে না পেরে অনেকেই তাঁদের পরিবার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই কম টাকার বাসায় উঠছেন। আবার কেউ কেউ একেবারেই গ্রামে ফিরে গেছেন। এতক্ষণ রাজাক বিন সাইদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল…।

করোনা পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি বা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরীরত অনেকেই পুরো বেতন পাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ চাকুরী হারিয়ে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। যারা বেশি ভাড়ায় থাকতেন তারা কম ভাড়ায় বাসা নিচ্ছেন। তাই বাসা ভাড়াটিয়ারাও বিপাকে রয়েছেন বাসা নিয়া। তারা ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না।

রাজধানীর কলাবাগানে একটি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি দুটি ভবন ভাড়া নিয়ে কাজ করে আসছিল। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার জাবের ফোনে বলেন, আমার ব্যবসার অবস্থা খারাপ। তাই ছোট ভবনটি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাড়িওয়ালা কোনোভাবেই আমাকে ছাড়বেন না। বাড়িওয়ালা বলেছেন, কয়েক মাস ভাড়া না দিলেও তাঁর সমস্যা হবে না। মে মাস থেকে আমি একটি ভবনের ভাড়া দিচ্ছি না। কর্মীদেরও বেতন কমাতে বাধ্য হয়েছি। এরকম ছোট-খাটো অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ে কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে। যার কারণে শতশত যুবক কর্মহীন হয়ে গেছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে ভিড় করছে।

চাকুরী হারিয়ে অনেক পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে। কোন কোন পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি পর্যন্ত হয়ে গেছে। কেউ কেউ করেছে আত্মহত্যা… এসবের সমাধান কিভাবে হবে…?

নারী হচ্ছে সংসারের অলংকার, অথচ সেই নারী-ই রাতের আধারে রাস্তায় বেশ্যার কাজ করছে। কি করবে সংসার তো চালাতে হবে। অর্থের এমন অবস্থা এখন বেশ্যাতেও অর্থ নেই। পকেটে টাকা থাকলে তো আমোদ-ফুটতি হবে…! টাকাই তো নেই তাহলে এসব কি করে হবে…? পোশাক শ্রমিকের কাজ করতেন, কারখানা বন্ধ, এখন কি করবেন…! তাই রাতের আধারে পতিতাবৃত্তি করছেন। স্বামী, সন্তান নিয়ে বেচেঁ থাকা দায়। স্বামী দিনমজুরের কাজ করতেন, এখন কাজ নেই, কি করবে.. সংসারে অশান্তি..। এমনি কথা হচ্ছিল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারীর সঙ্গে…। করোনার কারণে পতিতাবৃত্তিতেও খদ্দর কম পাচ্ছে। আগে মত কেউ সচারচ কাছে আসতে চায় না। তাই রাতের আধারে রাস্তায় দাড়িঁয়ে থাকতে হয়।

দেশে কয়েক মাস ধরে করোনা সংক্রমণ চলছে। এর মধ্যে দিন দিন বেড়েই চলছে সাধারণ ছুটি। এ সময়ে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের অফিস ও বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্যই বন্ধ ছিল। ফলে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বেসরকারি চাকরিজীবীরা। আর করোনার পুরো বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কষ্টে আছেন বেসরকারি শিক্ষকরা। অনেকাংশেই আয় কমেছে শ্রমজীবীদের। আগের মতো কাজ নেই। এ ছাড়া অনেক দোকান ও মার্কেট বন্ধ থাকায় কর্মচারীরাও বেতন পাচ্ছেন না। তবে ভালো আছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। অফিসে যেতে না হলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তাঁরা। এমনকি তাঁরা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। আর্থিক সংকটের কারণে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হচ্ছে না। মানুষ অর্থ যোগাতে রাস্তায় বের হচ্ছে। কাজের ফাকেঁ সচেনতা রোধেও সচেতন হচ্ছে না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনায় করোনার প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে। গত ৭ জুন সিপিডি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, করো’নার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জ’রিপ ২০১৬ অনুযায়ী তখন দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২৪ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে সাড়ে ২০ শতাংশে। সিপিডি বলছে, করোনার কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের আয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্যের হারও বেড়ে গেছে। করোনার কারণে ভোগের বৈষম্য বেড়ে দশমিক ৩৫ পয়েন্ট হয়েছে। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে ৮২ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় ৭৯ শতাংশ কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা কোনো রকমে তিন বেলা খেতে পারলেও পুষ্টিমান রক্ষা করতে পারছে না। করোনার প্রভাবে ধস নেমেছে দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক খাতে। বিশ্ববাজারে ৩১৮ কোটি ডলারের বেশি ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এবং ৩৫ বিলিয়নের মতো রপ্তানি আয় নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাত তৈরি পোশাক শিল্পে আয় কমেছে ১৯ শতাংশ। ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের হিসাবে এ পর্যন্ত পাঁচ-সাত হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, মা’মলা প্রত্যাহার, চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল, বকেয়া পাওনা পরিশোধসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা এরই মধ্যে কয়েক দফায় সাভা’র ও আশুলিয়ায় মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ৪৬১ কারখানায় এখনো শ্রমিকদের মে মাসের বেতন দেওয়া হয়নি। শুধু পোশাক খাত নয়, বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই চলছে।

প্রবাসী আয়ও কমতে শুরু করেছে, যার উপর নির্ভরশীল নিম্নমধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশ। করোনা সংকটের কারণে চাকরি হারিয়ে প্রবাস থেকে লাখ লাখ কর্মীর ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি চাকরিজীবীরা শঙ্কায় দিন কাটালেও সরকারি চাকুরেদের জন্য গ্রেডভেদে প্রণোদনা আছে ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি চাকুরেদের জন্য সুখবর আছে প্রস্তাবিত বাজেটেও। আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে তাঁদের জন্য বাড়তি বরাদ্দ থাকছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ আছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সেটা দাঁড়াচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। করোনার কারণে ১ম-৯ম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা মারা গেলে পেনশন সুবিধার বাইরেই তাঁর পরিবার অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পাবে। এর মধ্যে করোনার কারণে বিশেষ প্রণোদনা ৫০ লাখ, চাকরি কালীন অবস্থায় মৃত্যুর জন্য আট লাখ, ১৮ মাস পর্যন্ত ল্যাম্প গ্রান্ট, কল্যাণ তহবিল থেকে গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের টাকা, লাশ দাফনের জন্য পৃথক অনুদান, কল্যাণ তহবিল থেকে পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা ইত্যাদি নানা সুবিধা রয়েছে। প্রণোদনার বাইরে বেশির ভাগ সরকারি চাকুরেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে সরকারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।

অন্যদিকে বেসরকারি চাকুরিজীবিরা চাকুরী হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ছেলে-মেয়ে, বউ, মা-বাবা, ভাই-বোনের সুখের সংসার চেড়ে চাইলেও সহজে মরতে পারছে না। সরকার বেসরকারী ও দিনমজুর শ্রমিকদের জন্য কোন ধরনের আর্থিক ব্যবস্থা করতে পারছে না।

করোনার প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলছে.. অন্যদিকে লকডাউনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই রিকসা, অটো, ভ্যানচালক, ড্রাইভার যান নিয়ে বের হতে পারছে না। বের হলেই পুলিশি বাধাঁর সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তার উপর মোটা অংকের আর্থিক জরিমানা গুনতে হয়।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকায় বেতন পাচ্ছে না। তারা এমন পর্যায়ে জীবন যাপন করছে অন্য কাজও করতে পারছে না। তাদের দিকে কারো নজর নেই বললেই চলে। এরমধ্যে নামি-দামী অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এবং শিক্ষকরা বেকার হয়ে গেছে। কিছু স্থানে দেখা মিলছে শিক্ষকরা রাস্তায় সবজি বিক্রয় ও দিনমজুরে কাজ করছে।

দীর্ঘদিন স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকায় প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েরা এনড্রয়েট ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বেশিভাগই ফোনে বিভিন্ন গেমস খেলে দিন পার করছে। গেমস আর ফোনে বিভিন্ন খারাপ দৃশ্য দেখে বাজে ভাবে নষ্ট হচ্ছে এমন অভিযোগ করছে অভিবাবকরা।

সরকারী চাকুরীজীবিদের বেতন ও বোনাস দিন দিন বেড়েই চলছে। করোনা কালীন সময়ে তারাই সুখের জীবন অতিবাহিত করছে। তাদের সাথে দেশের অন্য কোন পেশাজীবিদের তুলনা চলে না। একমাত্র সরকারি চাকুরীজীবিরাই সুখি…।

লেখক- আমজাদ হোসেন আমু, প্রভাষক ও সংবাদ কর্মী

সর্বাধিক পঠিত