প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি বৃদ্ধি, মধ্য জুলাইয়ে সৃষ্টি হতে পারে আকস্মিক বন্যা

নিউজ ডেস্ক: গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। কোনো কোনো নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। তবে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমায় শনিবার স্থিতিশীল থাকার পর ফের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করেছে। আগামী তিন দিন এই পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল রবিবার বলেছে, এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে দেশের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে মধ্য জুলাইয়ে বন্যার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকালের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট ও খুলনা বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে ফরিদপুরে ৮৯ মিলিমিটার।

কুড়িগ্রামের তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের নুনখাওয়া ও চিলমারী দুটি পয়েন্টে পানি বাড়ছে দ্রুত। এতে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বেশ কয়েকটি চরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাট, বীজতলাসহ ফসলের ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে। তিস্তার পানি বিপত্সীমার ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নদীসংলগ্ন ৩০টি চরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নিমজ্জিত হয়েছে ফসলের ক্ষেত। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। গত তিন দিনে এসব এলাকায় তিন শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

উলিপুর উপজেলার চরগোড়াই পিয়ার গ্রামের শহিদুল ইসলাম জানান, গত এক সপ্তাহে তাঁর পরিবারসহ ৮০টি পরিবার তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়েছে। পূর্ব জোয়ন সাতরা, চরজোয়ান সাতরা, চরগোড়াই পিয়ারসহ আশপাশের সব চরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, এ সপ্তাহের শেষের দিকে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দুধকুমারসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার পাইকেরছড়া, চরভূরুঙ্গামারী, তিলাই, বঙ্গ সোনাহাট, বলদিয়া, ভূরুঙ্গামারী সদর ও আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের চরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ভারি বর্ষণসহ উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরসহ নিম্নাঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা চরে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি বিলীন হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে ছয় পরিবারের ঘরবাড়ি। তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে গতকাল সকালে বিপত্সীমার আট সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে তিস্তা নদীপারে গিয়ে দেখা যায়, করোনাকালে কঠোর লকডাউনে এমনিতে অভাবী পরিবারে ভাতের টান পড়েছে, তার ওপর তিস্তাপারে সৃষ্ট বন্যায় পানিবন্দি পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। জরিনা বেগম, হালিমা বেগম ও রুজিনাসহ অনেকেই জানান, পানিবন্দি হয়ে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছেন তাঁরা। কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি।

কেল্লারপার এলাকার মহির উদ্দিন বলেন, ‘কষ্ট হইলেও পানিবন্দি হয়ে কোনো রকমে থাকা যায়, কিন্তু বাড়ি ভাঙি গেইলে ওই পরিবারের আর কিছু থাকে না।’ পশ্চিম ইচলী এলাকার মতিবার রহমান, আব্দুল মালেক ও বাবলু মিয়া বলেন, ‘পানিবন্দি অবস্থায় খুব কষ্টে আছি।’

কোলকোন্দ ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব আলী রাজু জানান, তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে ভাঙন দেখা দেওয়ায় বিনবিনা চরে গতকাল ছয় পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। তিনি ভাঙন রোধসহ পানিবন্দি পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তার দাবি জানান। গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলীমা বেগম জানান, পানিবন্দি পরিবারের জন্য এরই মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানের অনুকূলে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে গাইবান্ধার সুুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ি, পাঁচপীর খেয়াঘাট, তারাপুর ইউনিয়নের খোর্দ্দা, লাঠশালা ও হরিপুর ইউনিয়নের কাশিম বাজার খেয়াঘাটসহ কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চরাঞ্চলের পার ভেঙে ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে।

হরিপুরের কৃষক আনোয়ার মিয়া (৪৩) বলেন, এর আগে তাঁদের কয়েক দফা বাড়ি সরাতে হয়েছে। নিঃস্ব হয়ে অনেকে এলাকা ছেড়েছে। একই এলাকার বৃদ্ধ আবদুল করিম (৬৬) বলেন, চরে গবাদি পশু পালন, ফসল চাষ করে তাঁরা টিকে আছেন। মূল ভূখণ্ডে জায়গা কেনার মতো টাকা তাঁদের হাতে নেই। এখন সরকার ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে তাঁদের পথে নামতে হবে। হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি জানান, নদী খনন করা ছাড়া নদীভাঙন রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী জানান, ভাঙন রোধে জিও টিউব ফেলা হচ্ছে। বিশেষ বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় ছোট যমুনা নদীর বাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে এ এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রশাসনের গাফিলতিতে তিন বছর ধরে বাঁধটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মেরামত করতে ভাঙা অংশের ৫০ গজ দূর থেকে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলপনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা যাবে না। আমি বিষয়টি দেখছি।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত