প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: সময়-অসময়: এই বাংলাদেশ কি চেয়েছিলাম?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: এখন থেকে সৌদি আরবের নারীরা কোনও পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই দেশের বাইরে ভ্রমণ করতে পারবেন। নারীদের অধিকতর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সৌদি রাজকীয় ফরমানের খবরটি পড়তে না পড়তেই আরও একটি খবরে চোখ পড়লো, প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

বাংলাদেশের খবর- বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তা না রাখার সুপারিশ। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হেফাজতে ইসলাম জাতীয় কোনও সংগঠনের দাবি। পড়তে গিয়ে দেখি এটি সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এবং খোদ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সুপারিশ। এবং প্রস্তাবটি করেছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই। রাতে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কমিটির সভাপতি পরিবহন শ্রমিক নেতা শাজাহান খান এমপি এর পক্ষে আবারও শক্ত অবস্থান প্রকাশ করেছেন।

আমরা বিস্মিত হতে পারি, ব্যথিত হতে পারি, ক্ষুব্ধ হতে পারি। কিন্তু স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধ করা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের নেতারা এসব শুরু করলে বুঝতে বাকি থাকে না রাজনীতির মনোজগতের পচন কত ভয়ংকর হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিষয়টি সংসদে তুলেছেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এবং তিনি সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশ যাতে বাস্তবায়ন না হয় সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। শাজাহান খান নিজেও একসময় জাসদ করতেন। শিরিন বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, নারী-পুরুষে কোনও বৈষম্য করা যাবে না। সেই দেশে যখন এ ঘটনা ঘটে তখন আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই।’

আমরাও স্তব্ধ হয়ে যাই। কিন্তু প্রতিকার যাদের হাতে তারা বিচলিত হন কি? সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে যারা জানাজার সম্পর্ক খুঁজে পায় তারা একদিন আরও অনেক সুপারিশ করবে। বলবে ‘হিন্দু বা অন্য ধর্মের কেউ গার্ড অব অনার দিতে পারবেন না’, একদিন হয়তো তারা বলবে, ‘নারীরা কোনও সরকারি বড় পদে যেতে পারবেন না’, কিংবা এমন ভাবনাও হয়তো তাদের মাথায় আছে যে, ‘নারীরা কেন রাজনীতি করবে, তারা কেন দেশ চালাবে?’

নিঃসন্দেহে এ সুপারিশ সংবিধানবিরোধী, চরম নারীবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক। কিন্তু নারীর প্রতি কেন এমন দৃষ্টিভঙ্গি? আমরা কার কাছে যাবো যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতি করা রাজনীতিকদের কাছে থেকে এমন সুপারিশ আসে? বাংলাদেশ একাত্তরের মূল চেতনার উল্টো দিকে কত দ্রুতলয়ে, কতটা সংগঠিতভাবে চলছে তার প্রমাণ এই সুপারিশ। লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির এসব সমর্থক শুধু নারীর মর্যাদা ও অধিকার বোধকেই খর্ব করে না, একটা বিচ্ছিন্নকামী দেয়াল তুলে রাখছে সমাজে।

সমাজ যতই আধুনিক-মনস্ক হোক না কেন, যতই ইট-পাথরের উন্নয়ন হোক না কেন, আজও রাজনীতিক ও নীতি নির্ধারকদের মনোজগতে বাস করে ভয়ংকর পুরুষতন্ত্র। নানান উছিলায় সমাজে, পরিবারে নারীদের নানা রকম নীতিবাগীশ নিয়ম-শৃঙ্খলা ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়। নারীকে আটকে রাখা, তাকে অপমান করার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র ধর্ম কার্ড ব্যবহার করা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী, স্পিকার নারী এবং আরও নানা জায়গায় নারী তার সাফল্যের জয়গান গাইছে। কিন্তু সংসদের মতো জায়গায় বসে, যেখানে খোদ সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকার নারী, সেখান থেকে এরকম প্রস্তাব এলে রাজনীতির পশ্চাৎপদতা নিয়ে কথা বলতে হবেই। নারী নেতৃত্ব দেশ চালাচ্ছে। কিন্তু নারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এখনও অনেক সীমিত। আমরা সামগ্রিকভাবে হয়তো বুঝতে পারি না যে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বারবার আমরা শুধু এটুকু বুঝতে পারি, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা রাজনৈতিক পদের শীর্ষে নারীদের অধিষ্ঠানই সে দেশের লিঙ্গসমতা নির্ধারণের প্রতিফলন নয়।

লিঙ্গবৈষম্যের সঙ্গে নারীদের রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্কটি নিবিড়। নারীরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক, কারিগরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা বড় পদে বসছেন ঠিকই, কিন্তু আমরা কোনও স্তরেই নারীদের জন্য একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারিনি।

অনেক পথ পেরিয়ে, অনেক বাগবিতণ্ডা, কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক অনেক সংগ্রাম করে সমাজকে যখন মৌলবাদী শক্তির হাত থেকে মুক্ত করার দৃঢ়তা জাতি অর্জন করতে প্রস্তুত, তখন সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশ সংবেদনশীল মানুষকে আহত করে। মেয়েদের সেই মেয়েবেলা থেকেই শেখানো হয় তাদের ভূমিকা হবে মেয়ের মতো। কিন্তু যে মেয়ে সেই বাধা পেরিয়ে, নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে প্রশাসনিক জায়গায় নিজের স্থান করে নিচ্ছে, তখন তাকে মেধায়, মননে না পেরে ধর্ম দিয়ে এই আটকানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে সবাইকে। এ লড়াই নারীর একার নয়।

রাজনীতি হলো ক্ষমতার চূড়ান্ত পরিসর। আর সেই ক্ষমতার জোর যেখানে বেশি সেখান থেকেই যদি লিঙ্গবৈষম্য, জাতি বা বর্ণবৈষম্যের মতো মানবাধিকার পরিপন্থী বিষয়গুলোকে সামনে টেনে আনা হয়, যখন অন্তর্নিহিত কুসংস্কারমূলক, আজন্ম লালিত নারী ও মানুষবিরোধী বিশ্বাসগুলোর নগ্নরূপ প্রকাশিত হয়, তখন সংবেদনশীল মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে – আমরা তাহলে এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? বাংলাট্রিবিউন।

লেখক: সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত