প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান শান্তনু: পরীমনির ক্ষমতাধর ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’রা কোথায়?

হাসান শান্তনু: ঢাকার হাতেগোনা কয়েকটা সিনেমার নায়িকা পরীমনি সম্ভবত পুরো পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একমাত্র ‘বিস্ময়’! কোনো সিনেমায় তার শুটিং শুরুর আগে, এমনকি একটাও সিনেমা মুক্তির আগেই তাকে কথিত ‘জনপ্রিয় অভিনেত্রী’ অ্যাখ্যা দিয়ে দেশিয় পত্রিকা, টিভি চ্যানেল এতো বেশি প্রতিবেদন, তার ‘সুপ্ত অভিনয় প্রতিভার’ কথা প্রকাশ, প্রচার করেছে, যা পৃথিবীর আর কোনো অভিনেত্রীর ভাগ্যে জুটেনি। সংবাদমাধ্যমের এসব প্রচারণায় ‘বিভ্রান্ত’ হয়েছেন জাতীয় ইস্যুতে সংসদে ‘অতি তৎপর’, বিএনপিদলীয় ‘উচ্চশিক্ষিত সাংসদ’ হারুনুর রশীদও। নিজের বুদ্ধিতে যাচাই-বাছাই না করে জাতীয় সংসদে তিনি দাবি করেছেন, ‘পরীমনি দেশের একজন প্রখ্যাত অভিনেত্রী’। দর্শকনন্দিত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উত্তরসূরি অভিনয় জগতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করলেই প্রচারণার যে সুযোগটা পেয়ে থাকেন, তা পরীমনির বেলায় নেই। কারণ তার বাবা-মা নাটক, সিনেমাপাড়ার কেউ নন। পরীমনি সুযোগটা পেয়েছেন বা নিয়েছেন তার ‘ক্ষমতাধর শুভাকাঙ্ক্ষী’ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলাদের মাধ্যমে। নানা স্বার্থে ঘুরেফিরে তারা আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত। তাদের ক্ষমতার দাপটে পরীমনি বেআইনি লাফালাফিও করেছেন যথেষ্ট, এতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তার সঙ্গে চুক্তি করা সিনেমার প্রযোজক, পরিচালকরা। তবুও তিনি ছিলেন ‘দৃশ্যমান-অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে’ জবাবদিহির যথারীতি বাইরে। তার আত্মপ্রকাশ, প্রচারমাধ্যমে ঢাউস আকারের জায়গা দখল, সিনেমাপাড়ায় অতি প্রভাব- সবই আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে।

চার দলের জোট সরকারের আমলে পরীমনির মতো ক্ষমতার ভয়াল দাপুটে আচরণ করেছিলেন নায়িকা অপু বিশ্বাস। হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত এক ব্যবসায়ীর হাত ধরে বগুড়া থেকে ওঠে আসা ‘নও মুসলিম’ অপুর কিছু কর্মকাণ্ডে তখনকার জনপ্রিয় কয়েক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে অভিনয়, এফডিসি ছাড়তে হয়েছিলো। এমনকি জনপ্রিয় অভিনেত্রী পূর্ণিমার অভিনয়, ব্যক্তিগত জীবনকেও বিষিয়ে তুলেছিলো। হাওয়া ভবনের আরেক ব্যবসায়ীর পূর্ণিমাকে জোর করে বিয়ের বিষয়ে প্রভাবশালী অপু তখন প্রতিবাদ করেননি বা পূর্ণিমার পাশে না দাঁড়ানোসহ নানা অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এক এগারো চলাকালে হাওয়া ভবনের আমির, গডফাদাররা দাবড়ানি খেয়ে আত্মগোপনে চলে গেলে পূর্ণিমা কথিত ওই স্বামীকে তালাক দিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। ‘নয়া মুসলমান’ অপুর স্বামী, অভিনেতা শাকিব খানের সঙ্গে যখন তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়, তখন অপুর সেই ক্ষমতা আর ছিলো না। ইতোমধ্যে হাওয়া ভবন হেলে পড়েছিলো, ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। নতুন নায়িকা বুবলির সঙ্গে শাকিবের পরকীয়ার নানা অভিযোগ ছড়ালেও অপুর হয়ে শাকিবকে ‘থ্রেট’ করার কোনো ‘ক্ষমতাধর শুভাকাঙ্ক্ষী’ পাশে ছিলেন না। স্বামী, সংসার ফিরে পেতে ‘অসহায়’ অপুকে এক পর্যায়ে টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে বসে কাঁদতে হয়। এরপর পুরো জাতি টানা কয়েকদিন ধরে ভোগ, উপভোগ করে টানটান উত্তেজনা, রগরগে কাহিনির ‘অপুর সংসার’ সিনেমা।

‘প্রভাবশালী শুভানুধ্যায়ীদের’ সরকারের আমলেও বর্বর, পৈশাচিক কাণ্ডের শিকার হয়ে পরীমনিকে কেন সংবাদ সম্মেলনে এমন অসহায়ের মতো চোখের জল ঝরাতে হলো? সেই দাপটশালীরা এখন কোথায়? তার আলোচিত এক প্রভাবশালী ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ সরকারে ঠাঁই না পেয়ে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ছিটকে পড়ে নিজের ‘রাজনৈতিক অতীত ইতিহাস’ ফেসবুকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ছড়িয়ে তেল ফুরিয়ে আসা হারিকেনের মতো নিভু নিভু জ্বলছেন। বাকিদের প্রভাব আগের মতোই রয়ে গেছে। পরীমনিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ পেয়েও থানায় মামলা না নেওয়ার পর তারা চুপ কেন? অভিযুক্তরা কি তাদের চেয়েও প্রভাবশালী? বিভিন্ন সরকারের আমলে এসব ক্ষমতাশালী, অতি ক্ষমতাশালী চক্রের কাছে ঢাকার অভিনেত্রী, অভিনেত্রীদের জিম্মি অবস্থা; পরিচালক, প্রযোজকদের অসহায়ত্ব; তাদের কবলে পড়ে চলচ্চিত্র অঙ্গন কীভাবে ধ্বংসের প্রায় শেষ সিঁড়িতে এসে পৌঁছেছে, সেসব নিয়েও আলোচনা জরুরি। দেশীয় সিনেমা শিল্পকে বাঁচাতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প কিছু নেই। প্রশাসন, প্রচারমাধ্যম পাশে দাঁড়ালে তাদের মুখোশ খুলে দিতে পরীমনিও ভূমিকা রাখতে পারেন। শত সমালোচনার মধ্যে সত্য হচ্ছে, নিজের কালের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি সাহসী। আক্রান্ত এ নায়িকার বিতর্কিত দিক নিয়ে উপরে আলোচনার কারণ কৌশলে অভিযুক্তদের পক্ষ নেওয়া নয়; চক্রের কাছে ঢালিউডের বন্দিদশা তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য। পরীমনির প্রতিই আমাদের সংহতি।
লেখক : সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত