প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] আমের রাজধানী নওগাঁয় চলতি বছরে দেড় হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা

নওগাঁ প্রতিনিধি: [২] খাদ্য শষ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত উত্তরের জেলা নওগাঁ। ধান উৎপাদনে এ জেলাকে যেমন বৃহৎ জেলা হিসেবে গন্য করা হয়; তেমনি সবজির জন্যও বিখ্যাত। এসবের পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য হিসেবে আরেকটি নাম যোগ হয়েছে আম। বাংলাদেশের মধ্যে নওগাঁ জেলা আমের জন্য বিখ্যাত হিসেবে শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে।

[৩] এখানকার আম সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। মানুষ এখনো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে আমের রাজধানী হিসেবে মনে করেন। তবে সেই ধারনাকে পাল্টে দিয়ে নওগাঁ এখন প্রথম স্থানে রয়েছে। তবে ব্র্যান্ডিংয়ে পিছিয়ে থাকায় এই অঞ্চলের আম দেশের বিভিন্ন বাাজারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আম বলে বিক্রি হচ্ছে। এই অঞ্চলটিতে যে পরিমাণে আমের চাষাবাদ হচ্ছে তা দেশবাসীর নিকট এখনো অজানা।

[৪] জানা গেছে, জেলার ঠা-ঠা বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। পানি স্বল্পতার কারণে বছরের একটি মাত্র ফসল আমনের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে ধানের আবাদ ছেড়ে আম চাষে ঝুঁকেছেন চাষীরা। দেশে যত ধরনের আম উৎপাদিত হয় এ অঞ্চলটিতে তার প্রায় সব ধরণ ও আকৃতি-প্রকৃতির আম উৎপাদিত হয়। গত এক যুগ আগে যে জমিতে ধান চাষ হতো। সেখানে এখন আম চাষ করা হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলের চাষীরা আমচাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যেখানে আম্রপালি, গোপালভোগ, ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা, ঝিনুক, বারী-৪ ও গুটি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে।

[৫] বরেন্দ্রভূমি এ অঞ্চলের মাটি আম চাষের জন্য উপযোগী। এখানকার আমের আকৃতি ও গঠনগত অবয়ব কেবল দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় নয়; বরং খেতেও সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। আম চাষ খুব লাভজনক একটি ফসল হওয়ায় ধানের চাষাবাদ ছেড়ে আমচাষের দিকে অধিক হারে ঝুঁকে পড়েছে। এ জেলাটি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকেও ছাড়িয়ে গেছে। পোরশা ও সাপাহারে উপজেলায় প্রায় তিনশতাধিক মৌসুমি আমের আড়ৎ গড়ে ওঠে। যেখানে থেকে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে।

[৬] জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে জেলায় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। গত বছর ছিল ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে। গত বছরের থেকে ১ হাজার ৭৫ হেক্টর বেশী জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। উপজেলা ভিত্তিক আম বাগানের পরিমাণ হচ্ছে- সদর উপজেলায় ৪৪০ হেক্টর, রানীনগরে ৩৫ হেক্টর, আত্রাইয়ে ১২০ হেক্টর, বদলগাছীতে ৩৩৫ হেক্টর, মহাদেবপুরে ৬২৫ হেক্টর, পত্নীতলায় ৩ হাজার ১৫ হেক্টর, ধামইরহাটে ৬৭৫ হেক্টর, সাপাহারে ৮ হাজার ৫২৫ হেক্টর, পোরশায় ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর, মান্দায় ৪০০ হেক্টর এবং নিয়ামতপুরে ১ হাজার ১৩০ হেক্টর।

[৭] জেলা প্রশাসনের বেধে দেওয়া সময় অনুযায়ী গত ২০ মে থেকে গুটি জাতের আম পাড়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। ঘোষিত সময় অনুযায়ী আম না পাকায় সময় পিছিয়ে ২৫ মে আনুষ্ঠানিক ভাবে পাড়া শুরু হয়। এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জেলায় চলছে প্রশাসনের বিশেষ লকডাউন। আগামী ৯জুন পর্যন্ত লকডাউন শেষে ১৬ জুন চলছে ১৫ দফা বিধিনিষেদ। এ কারণে বাহিরের জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা তেমন আসতে পারতে পারছে না। এতে দাম তুলনামুলক কম যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা।

[৮] সাপাহারের বাজারে গুটি, গোপালভোগ ও খিরসাপাতা(হিমসাগর) পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে গুণগত মানভেদে গোপালভোগ ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খিরসাপাতা প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ১৯০০ টাকায়। এছাড়া গুটি আম বিক্রি হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকা দরে। নাংড়া ১৩০০-১৪০০ টাকা দরে।

[৯] পোরশা উপজেলার আমচাষী আবু সাঈদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষে একটি বেসরকারী কম্পানিতে ভাল বেতনে চাকরী করতাম। সেখান হতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে (৭০) সত্তর বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ করেছি। কিছুদিন থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। আমি নিজে বারীন্দ্রর নামে একটি অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়া সার্ভিসের মাধ্যমে কিছুটা বিক্রি করে থাকি। প্রাথমিক ভাবে দাম মোটামুটি ভাল ছিল। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে আমচাষীদের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। লকডাউনের কারণে দুরদুরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেনা।

[১০] সাপাহার উপজেলা মৌসুমি আম ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড়শ টি দোকান গড়ে ওঠেছে। করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যবসায়ীরা আসতে পারছে না। এ কারণে ৫০-৬০ টি দোকান চালু আছে। বিগত বছরে আম মৌসুমে সাপাহার থেকে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ৩০০-৩৫০ টি ট্রাকে করে আম যেত। সেখানে এখন ৫০টির মতো ট্রাকে আম যাচ্ছে। আর প্রতি ট্রাকের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০০ ক্যারেট। প্রতি ক্যারেটে আম থাকে ২২-২৫ কেজি।

[১১] সাপাহারের আম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, লক ডাউনের কারণে বাহিরের ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেন না। এ কারণে আমের দাম তুলনামুলক কম। তবে লকডাউন শেষ হলেই দাম বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

[১২] নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সামশুল ওয়াদুদ বলেন, চলতি মৌসুমে হেক্টর প্রতি গড়ে ১২ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। সেই হিসেবে আম উৎপাদনের পরিমাণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে ৩ লক্ষ ১০ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। গড়ে প্রতি কেজি আম ৫০ টাকা হিসেবে উৎপাদিত আমের মোট বিক্রিত অর্থের পরিমান হচ্ছে ১ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। এ বছরে বাস্তবতায় এর চেয়ে অধিক পরিমাণ আম উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে। কারণ হিসেবে এ বছর তেমন ঝড় হয়নি। এর ফলে আমের তেমন ক্ষতি সাধিত হয়নি। কাজেই ধার্যকৃত লক্ষমাত্রার থেকে বেশী আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত