প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুব্রত বিশ্বাস: জলবায়ু পরিবর্তন কূটনীতি

সুব্রত বিশ্বাস: মূলত বিশ্ব নেতাদের ঐক্যমতের অভাবেই জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে শক্ত নিয়মনীতি নির্দিষ্টকরণের পরও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে উঠছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের পক্ষে-বিপক্ষে মিত্র ও অক্ষ রাষ্ট্রসমূহ ঐতিহাসিক কাল থেকেই দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এমন ঘাতপ্রতিঘাতের মাধ্যমেই নির্ধারণ হয়ে আসছে রাষ্ট্রগুলোর মাঝে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্বে দেশগুলোর মাঝে স্বার্থ বা সম্পর্কের পরিবর্তন হয়নি বরং সময়ের আবর্তে স্বার্থ ও সম্পর্কের উপাদানগুলোয় এসেছে পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনেরই এক বিরাট অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তন কূটনীতি’, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পেয়েছে এক নতুন মাত্রা।

সমাজ ও মানব জীবনের অন্যান্য নিয়ামকের মতো রাষ্ট্রব্যাবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ঠিক এমন পরিবর্তনশীলতা সদা লক্ষণীয়। গত শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে পৃথিবীর জীবাশ্ম বা অনবায়নযোগ্য সম্পদ। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বর্তমান উন্নত রাষ্ট্রসমূহে শিল্প উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে তেল, গ্যাস ও কয়লা। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক উন্নয়নের প্রায় দুইশত বছরের এই ধারা বিশ্বের শিল্পন্নোত দেশগুলোকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সারা পৃথিবীতে, যা বর্তমানে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ফেলেছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি ও ক্ষতির মুখে। কয়লাভিত্তিক উৎপাদন কারখানা থেকে নির্গত কার্বন পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলাফল আর্কটিকের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি।

পৃথিবী সুরক্ষাকারী ওজনস্তরেও ধরেছে ফাঁটল। ফলে সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে এসে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টির পাশাপাশি উষ্ণতাও বৃদ্ধি করছে। এ সবকিছুর ফলাফল হিসেবে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলো পড়েছে ব্যাপক ঝুঁকির মুখে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ফলে ইতোমধ্যে অনেক দেশের জমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং বর্তমান উচ্চতা আরো বৃদ্ধি পেলে মালদ্বীপ-সহ আরও কিছু দ্বীপরাষ্ট্রের অধিকাংশ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ অঞ্চল সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। বিগত শতাব্দীতে তেল, গ্যাস অবরোধ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিলো। কোনো দেশের তেল সম্পদ থাকা মানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার মর্যাদা হবে ওপরে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্তভাবে এসব জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিক এখন বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট। উন্নয়নমূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির বিষয়বস্তুতে পরিবেশগত দিকের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সবোর্চ্চ সংস্থা ইন্টার গভার্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ (আইপিসিসি)। উদাহরণ হিসেবে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কথা বলা যেতে পারে।

প্রায় সকল রাষ্ট্র এই চুক্তিতে সম্মতি দিলেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন  যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো। সম্প্রতি কাডানা সরকার ৩.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কিন্ডার মরগ্যান কর্পোরেশনের ট্রান্স মাউন্টেইন পাইপলাইন ক্রয় করেছে, যার মাধ্যমে আলবার্টা থেকে প্যাসিফিক পোর্ট দিয়ে তেলবালি রপ্তানি করা হবে। অথচ অন্য যেকোনো প্রকার তেলের তুলনায় তেলবালি যে অনেক বেশি পরমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে এটা অজানা কোনো বিজ্ঞান নয়। চীন, ভারত ও আরো কিছু উন্নয়নশীল দেশ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সব ধরণের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিবে পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদেরকে কার্বন নিঃসরণও কমাতে হবে। কেনোনা বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির প্রায় সম্পূর্ণ দায়ভার পশ্চিমা বিশ্বের ওপরেই বর্তায়।

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই রেষারেষির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৮ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে কমপক্ষে ১৪৩ মিলিয়নে। রাষ্ট্রগুলো কি ভবিষ্যতে এতো সংখ্যক জলবায়ু অভিবাসীর চাপ নিতে প্রস্তুত? অধিকাংশ জলবায়ু অভিবাসীদের আশ্রয় মিলছে উন্নত দেশে নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশে (৮৫ শতাংশের অধিক)। উন্নত দেশগুলোর অভিবাসী বা উদ্বাস্তুদের প্রতি এমন বিরূপ মনোভাব অদূর ভবিষ্যতে খুব ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

ক্রয়ক্ষমতায় বিশ্বের এক নম্বর অবস্থানে থাকা চীন পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে আছে। বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি সোলার ফটোভোল্টাইক প্যানেল, অর্ধেকের বেশি ইলেক্ট্রিক যানবাহন এবং এক তৃতীয়াংশ বায়ু শক্তি উৎপাদন করে চীন। এ বিষয়গুলো বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র-সহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যান্য ধনী দেশগুলোর নজরে এসেছে অনেক আগেই। তাই চলমান রাজনৈতিক বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজনের পাশাপাশি সক্ষমতা তৈরিতে রাষ্ট্রগুলো নবায়নযোগ্য শক্তি ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। অর্থ্যাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। লেখক : ব্যবসায়ী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত