প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাবশালীদের দাপটে আসছে না সম্পদ কর

নিউজ ডেস্ক: ধনীদের কাছ থেকে হিসাব কষে রাজস্ব আদায় করতে প্রতি অর্থবছরই জাতীয় বাজেটে সম্পদ কর আরোপের পরামর্শ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, সম্পদের প্রকৃত হিসাব গোপন রাখতে কিছু অসাধু প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তির চেষ্টা-তদবিরের কারণেই এই কর আরোপ হয় না। বিকল্প হিসেবে সারচার্জ আরোপ করা হলেও এর মাধ্যমে সম্পদশালীদের কাছ থেকে প্রকৃত রাজস্ব পাওয়া যায় না। এনবিআর রাজস্ব আদায় বাড়াতে পরোক্ষ করে নির্ভরতা বাড়িয়ে থাকে। আর এটা সম্পদশালীদের গায়েই লাগে না, ভার পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বাড়ে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের তিন খাত ভ্যাট (পরোক্ষ কর), আয়কর ও শুল্কের মধ্যে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় আয়কর আর সবচেয়ে কম লক্ষ্যমাত্রা শুল্ক আদায়ে। চলতি অর্থবছরেও এই ধারা হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে পরোক্ষ কর ভ্যাট ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। রাজস্ব আদায়ের এই পদ্ধতি বাতিলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলেও তৎকালীন সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে এই পদ্ধতি কঠোরভাবে প্রণয়ন করে। ভ্যাট যোগ করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়। ক্রেতা পণ্য কিনতে গিয়ে নিজের অজান্তে দামের সঙ্গে তা পরিশোধ করে থাকে। একটি চিপস প্যাকেটের প্রকৃত দাম আট টাকা হলে তার সঙ্গে ভ্যাট দুই টাকা যোগ করে মোট ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এই চিপস ধনী-দরিদ্র যেই কিনবে তাকে ১০ টাকা দিতে হবে। দামের সঙ্গে আদায় করা ভ্যাট দোকানের মালিক সরকারি কোষাগারে জমা দিলে সরকার দুই টাকা পেয়ে যাবে। যদি ভ্যাট আরোপ করা না হতো তবে একজন অল্প আয়ের মানুুষ দুই টাকা কম দিয়ে চিপসটি কিনতে পারত।

সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করেও বেশির ভাগ সময় তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের পকেটে ভরে থাকেন। সম্প্রতি ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে সারা বছরই রমরমা বেচাকেনা হয় রাজধানীর এমন দুই হাজারের বেশি দোকানে অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে দেখা যায়, ১২ শতাধিক দোকানে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরই নেই।

ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, দুই হাজারের বেশি দোকানের মধ্যে ১২ শতাধিক দোকানেই ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ না করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেখানে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণই করেনি, সেখানে ভ্যাট পরিশোধ করবে কিভাবে? এই ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। এরা জনগণের কাছ থেকে হিসাব কষে ভ্যাট আদায় করেও সরকারকে ভ্যাট খাতে একটি টাকাও দিচ্ছে না। এদের আটকাতে রাজস্ব আইনে শক্ত ধারা আনতে হবে।

অন্যদিকে বিদ্যমান আয়কর আইন অনুসারে একজন ব্যক্তি যা আয় করবে তার ওপর সরাসরি কর আদায় করার পদ্ধতি হলো প্রত্যক্ষ কর। অনেক দেশেই প্রত্যক্ষ করের আওতায় সম্পদ কর আরোপ করা হলেও বাংলাদেশে রাজস্ব আইনে এ ধরনের বিধান রাখা হয়নি।

সম্পদ কর হলো, এক বছরের তুলনায় পরের বছর কোনো ব্যক্তির যে পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধি পাবে তার ওপর হিসাব কষে কর আদায়। এ ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্য বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী মূল্যায়ন করার নিয়ম।

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমানো সম্ভব না হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। ধনীরা আরো ধনী হবে। গরিব আরো গরিব হবে। এই সমস্যা সমাধানে আইনের বিধিবিধানের মধ্য দিয়ে ধনীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থের কিছুটা হলেও নিয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত, কম আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সম্পদ কর অত্যন্ত কার্যকরী ব্যবস্থা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সম্পদ কর আরোপ আছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুুহিত একাধিকবার সম্পদ কর আরোপের উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমি ২০১০ সালে এনবিআর চেয়ারম্যান থাকাকালে সম্পদ কর আরোপে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কিছু ধনী প্রভাবশালী লোকের বিভিন্ন চেষ্টা-তদবিরে তা সম্ভব হয়নি। মূলত নিজেদের সম্পদের হিসাব গোপন রেখে রাজস্ব ফাঁকি দিতেই তাঁরা এসব করেন। সম্পদ কর একজন ব্যক্তির কী পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে তার ওপর আরোপ করা হয়, যা বর্তমান মূল্য অনুযায়ী আদায় করা হয়।’

উদাহরণ দিয়ে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, ধরেন আবদুর রহিম নামে এক ব্যক্তি ১০ বছর বয়সে তার বাবার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা দামের একটি বাড়ি উপহার পেয়েছে। ৩০ বছর পর রহিমের বয়স ৪০ বছর হলে ওই বাড়ির মূল্য বাজার মূল্য অনুযায়ী বেড়ে ৮০ লাখ টাকা হলো। এ ক্ষেত্রে ৬০ লাখ টাকার ওপর আবদুর রহিমকে সম্পদ কর দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বিদ্যমান আয়কর আইনে সম্পদ কর অন্তর্ভুক্ত না করে ধনীদের কাছ থেকে সারচার্জ আদায় করা হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন সারচার্জের মাধ্যমে সম্পদশালীদের প্রকৃত সম্পদ অনুযায়ী কর আদায় হয় না। সারচার্জ হলো শুভকংরের ফাঁকি।’

২০১৫-১৬ অর্থবছরেও সম্পদ কর চালু করার উদ্যোগ নেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই বাজেট প্রণয়ের আগে তিনি এক সভায় এনবিআর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমার সারচার্জ তো কোনো কাজের না। সম্পদ কর কাজের। এটা চালু করো।’ ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে সারচার্জ আরোপ করা হয়। সারচার্জ হচ্ছে এক ধরনের মাসুল, যা ভিত্তিমূল্যের ওপর দিতে হয়।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজের যে পরিমাণ সম্পদ ঘোষণা করেন তার ওপর সারচার্জ নেওয়া হয়, যা নিয়মিত করের বাইরে। এ ক্ষেত্রে ১০ বছর আগে কেনা দলিলে জমির যে দাম থাকবে ক্রেতা ১০ বছর পরেও ওই একই দাম ধরে সারচার্জ দিতে পারেন। এনবিআর আপত্তি তুলতে পারবে, তবে আয়কর আইন অনুযায়ী তা অপরাধ নয়।’

সারচার্জ খাতে গড়ে এক অর্থবছরে এনবিআর আদায় করেছে ২০০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সারচার্জ বাড়িয়ে ধনীদের কাছ থেকে কর আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সারচার্জের স্ল্যাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বর্তমানে সারচার্জের সাতটি স্তর আছে। নিট সম্পদের মূল্যমান তিন কোটি টাকা পর্যন্ত হলে সারচার্জ দিতে হয় না। মূল্যমান তিন কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা হলে বা একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে বা যেকোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় আট হাজার বর্গফুটের বেশি গৃহসম্পত্তি থাকলে ১০ শতাংশ কর, সম্পদের পরিমাণ পাঁচ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, ১০ কোটি থেকে ১৫ কোটি পর্যন্ত ২০ শতাংশ, ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২৫ শতাংশ, ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়।

আসন্ন বাজেটে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের সারচার্জ দিতে হবে না। তিন কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২০ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি পর্যন্ত ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালীদের আয়করের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে। – কালের কণ্ঠ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত