প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ: ঋণের উচ্চঝুঁকিতে পড়বে না বাংলাদেশ

বণিক বার্তা: মহামারীতে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রয়াস চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতির প্রতিটি খাতে করোনার অভিঘাত নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব ও আগামী কয়েক বছরে সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি নিয়ে করেছে তাদের প্রক্ষেপণ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের তৃতীয় পর্ব আজ।

রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও বাড়ে। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে উদীয়মান অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে এসব উৎস থেকে নেয়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও অতিরিক্ত বিদেশী ঋণনির্ভরতা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। চলমান করোনা মহামারীতে বাংলাদেশেরও বিদেশী ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্ষেপণ বলছে, এর ফলে বাংলাদেশের ঋণের উচ্চঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা কম।

আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতায় করোনা কতটুকু ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিরূপণের জন্য বাইনারি রিকারসিভ ট্রি (বিআরটি) মডেল ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতির চারটি বিষয়কে মানদণ্ড ধরে এ ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৯ সালকে ভিত্তি ধরে।

প্রথম ধাপে জিডিপি অনুপাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণকে বিবেচনায় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ধরা হয়েছে ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। আর ওই বছর জিডিপির আকার দাঁড়ায় ২০৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বিআরটি মডেলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি ও বিদেশী ঋণের অনুপাত ২৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ সর্বোচ্চ সীমার বেশ নিচে ছিল এ অনুপাত।

বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারে। এ সময় দেশের স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ অনুপাতের সর্বোচ্চ সীমা ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ ধরে বিআরটি মডেলের দ্বিতীয় ধাপটি নির্ধারণ করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুপাত দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে এটির অবস্থানও নির্ধারিত সীমার মধ্যেই। ২০২৩ সাল নাগাদ এ অনুপাত আরো কমে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশে দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

তৃতীয় মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয় রাজস্বের বিপরীতে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণকে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশে সরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার। রাজস্ব ও সরকারি খাতের ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ১৫৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা এ মানদণ্ডের সর্বোচ্চ সীমা ২১৫ শতাংশের চেয়ে কম।

চতুর্থ ও সর্বশেষ ধাপে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার -৫ দশমিক ৪৫ শতাংশের চেয়ে বেশি কিনা তা দেখা হয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।

বিআরটি মডেল অনুযায়ী, চারটি মানদণ্ডের সার্বিক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অবস্থান নোড-৩-তে। এটিকে নিরাপদ বলে ধরা হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত অর্থনীতিতে এ ধারা চলমান থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিদেশী ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। একই বছরের জুন নাগাদ বিদেশী ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৬৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

যদিও জিডিপির বিচারে এ সময়ে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ গ্রহণের প্রবণতা নিম্নমুখীই দেখা গেছে। উল্লিখিত সময়ে বিদেশী ঋণ গ্রহণ কমেছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিডিপির বিচারে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের ঋণ গ্রহণের প্রবণতাই কমেছে। ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ হ্রাসের হার ছিল ৩ শতাংশ। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রথম প্রান্তিকে ছিল ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে নেমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি ঋণ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ অর্থনীতিতে উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ কম থাকা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বড় কারণ। ২০২০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪১ বিলিয়ন ডলার। এরপর রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমাগতই বাড়ছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জিডিপির তুলনায় আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ তেমন বেশি নয়। এছাড়া এখন পর্যন্ত আমাদের যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে তার অধিকাংশই নমনীয় বা সহজ শর্তের ঋণ। তাই এর জন্য সুদ পরিশোধের পরিমাণটা খুব বেশি নয়। অর্থাৎ মোট বৈদেশিক ঋণের তুলনায় মোট সুদ ১ শতাংশেরও কম। এছাড়া কভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি থেকে যে অতিরিক্ত অর্থায়ন পাওয়া গেছে সেগুলোও অধিকাংশ নমনীয় ঋণ। বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ বার্ষিক যে সমীক্ষা প্রকাশ করে সেখানে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির হার খুব কম। তাই ঋণের ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যেটা বলছে সেখানে দ্বিমতের কিছু দেখছি না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঋণের উচ্চঝুঁকিতে আমাদের পৌঁছার সম্ভাবনা নেই। কারণ বর্তমানে ঋণের জন্য আমাদের যে পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে হয় সেটা খুব কম। এছাড়া ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাও খুব ভালো। করোনার কারণে রেমিট্যান্স কমে যাবে, এ ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু উল্টো রেমিট্যান্স বেড়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ভালো। সার্বিক বিবেচনায় উচ্চঝুঁকির প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি মধ্যম ঝুঁকির সম্ভাবনাও কম। তবে আত্মতুষ্টিতে যেখান-সেখান থেকে সরকার ঋণ নেবে, এমনটিও ঠিক হবে না। কারণ ঋণ নিয়ে অপচয় করলে সেটা তো ভবিষ্যতে দেশকে ভোগাবে।

যদিও বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এখন না থাকলেও বাংলাদেশ সামনের দিনগুলোতে ঋণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ঋণের উচ্চঝুঁকিতে নেই এটা যেমন সত্য, তেমনি ২০২৩ সালের পর এ ঝুঁকি যে বাড়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে তাও কিন্তু সত্য। কেননা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছি। এখন কিন্তু আমাদের সার্বিক খরচগুলো বেড়ে যাবে। এ খরচ মেটানোর জন্য প্রয়োজন হবে বিদেশী ঋণ। এখন হয়তো আমাদের ঋণ নেয়ার হার বাড়ছে না, কিন্তু ঋণের অংকটি বড় হচ্ছে। তাই সঠিকভাবে এ ঋণের ব্যবহারের বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। রফতানি, রেমিট্যান্সের মতো খাতগুলো থেকেও ঘাটতি মোকাবেলার দিকে মনোযোগী হতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত