প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শতাব্দী প্রাচীন শ্মশানে বন বিভাগের বাগান: মধুপুরের আদিবাসীরা বিক্ষুব্ধ

নিউজ ডেস্ক: সাংসারেকদের শত বছরের পুরোনো শ্মশানে গড়ে তোলা হচ্ছে বন বিভাগের গাছপালার সংগ্রহশালা, যা আরবোরেটাম নামে পরিচিত। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন পাতাঝরা এই বনে কৃত্রিম বনায়নের নিদর্শন নতুন নয় এবং সেখানকার আদিবাসীরা বনবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে সব সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু এবার শ্মশান ধ্বংসের উদ্যোগ সেই ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দেওয়ার মতো। বন বিভাগ অবশ্য বলছে, এখানে যে শ্মশান সেটা তাদের আগে জানানো হয়নি। এ শ্মশান বহুকাল ধরে পরিত্যক্ত হয়ে আছে।

অনুসারীদের কাছে সাংসারেক ধর্মের খামাল (পুরোহিত) জনিক নকরেক নিজস্ব ধর্মীয় রীতিতেই তার মৃতদেহ সৎকারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামে জন্ম জনিক নকরেকের। সাংসারেক ধর্মের সবচেয়ে প্রবীণ শতবর্ষ পেরোনো এই মানুষটি। গারোদের আদি ধর্মের নাম সাংসারেক। সর্বত্র গারো বলে পরিচিত হলেও তারা নিজেদের মান্দি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে; কথা বলে আচিক ভাষায়। সাংসারেকদের সংখ্যাও এখন হাতেগোনা। তবে সাংসারেক ধর্মাবলম্বী জনিক নকরেক একা নন, বর্তমানে জন্মগতভাবে সাংসারেক নয়, এমন গারোরাও চায় পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হোক। অথচ এখানে বাদ সেধে বসেছে বন বিভাগ। তাদের প্রকল্পে থাকা আরবোরেটাম (গাছপালার সংগ্রহশালা) বাগানের জায়গার মধ্যে পড়েছে মধুপুরের অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী গ্রামে মান্দিদের দেড়শ বছরের পুরোনো শ্মশান। মান্দিরা এই শ্মশানকে বলে ‘মাংরুদাম’। তাদের কাছে এটি খুবই পবিত্র স্থান। অথচ কয়েকজন মান্দি নেতার যোগসাজশে বাগানের সীমানাপ্রাচীর দ্রুত নির্মাণ করতে তৎপর বন বিভাগ। এই যখন পরিস্থিতি, তখন মাংরুদামকে ঘিরে বন বিভাগের কর্মকাণ্ডে মধুপুর অঞ্চলের মান্দিদের ১৩টি গ্রামের মানুষের মধ্যে তুমুল অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ন মেশা এই মাটির একটি কণাও ছাড়তে নারাজ।

বর্তমানে গারোদের লক্ষাধিক জনসংখ্যার বেশিরভাগ খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। তবে জনিক নকরেকের মতো শখানেক মান্দি এখনও টিকিয়ে রেখেছেন ‘সাংসারেক’ ধর্মকে। ২০০৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় সারাদেশে দেড়শর মতো এই ধর্মানুসারী আছেন বলে উল্লেখ করা হয়। অবশ্য ধর্মান্তরিত হলেও মান্দিদের বেশিরভাগই ভেতরে লালন করে পুরোনো ধর্মের বিভিন্ন আচার। সাংসারেক ধর্ম অনুযায়ী মৃতদেহকে মাংরুদামে দাহ করা হতো। মধুপুরের চুনিয়াসহ আশপাশের ১৩টি গ্রামের টেলকীতেই রয়েছে একমাত্র মাংরুদাম। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেল, সেখানে আরও রয়েছে মৃত মান্দিদের স্মরণে বানানো স্মৃতিস্তম্ভ, যা ‘খিম্মা’ বলে পরিচিত। এসব খিম্মায় পূর্বসূরিদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আদিবাসী মান্দিরা।

জনিক নকরেকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল চুনিয়ায় তার বাড়ির আঙিনায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটির স্মৃতি এখনও টনটনে। তিনি বলেন, আমার অনেক আত্মীয়স্বজনকে এই মাংরুদামেই পোড়ানো হয়েছিল। বন বিভাগ বনের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন এই শ্মশানটি ধ্বংস করতে চাচ্ছে। টেলকীতে মাংরুদামটি নষ্ট করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বন বিভাগের এমন কাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বর্তমান প্রজন্মকে এটা প্রতিরোধ করতে আহ্বান জানান।

মান্দিদের ঐতিহ্যবাহী এই স্থান সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব উল্লেখ করে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংসদ (বাগাছাস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জন জেত্রা বলেন, ‘পর্যটন আর উন্নয়নের নামে মান্দিদের প্রাচীন মাংরুদাম দখল করে স্থাপনা নির্মাণ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। আমি খ্রিষ্টান হলেও নিজের ভেতরে সাংসারেক ধর্মটি লালন করি।’

বন বিভাগের মধুপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. হাবিব উল্লাহ জানান, আরেবোরেটাম বাগানের সীমানা প্রাচীর ও নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য একটি ভবন করা হবে সেখানে। তার দাবি, ‘এর ভেতরে কোনো শ্মশান নেই।’ সীমানাপ্রাচীর হলে গারোরা ওই জমি দখল করে খেতে পারবে না, এই ভেবে প্রতিবাদ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে আরবোরেটামের ভেতরে শ্মশান আছে- বিষয়টি তখন কেউ জানায়নি উল্লেখ করে টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘গারো নেতারা অনাপত্তি জানানোর পর আমরা কাজ শুরু করেছি। এখন সীমানাপ্রাচীর করতে যাওয়ায় আপত্তি উঠেছে।’

প্রাকৃতিক বনের কোথায় কী রয়েছে তা আদিবাসীরা যেমনটা জানে; বন বিভাগের তেমনটা জানার কথা নয় বলে প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি পূজারি আদিবাসীরা গভীর জঙ্গলের ভেতর পূজা করত। সে স্থানগুলোকে বলা হতো পবিত্র অঞ্চল (মিদ্দি আসং)। বনের মানুষ জানে সেগুলো কীভাবে রক্ষা করতে হয়। প্রাকৃতিক বনের বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখতে হবে। বন বিভাগের এ ধরনের প্রকল্প আদিবাসীদের সঙ্গে বন বিভাগের দূরত্বই শুধু বাড়াবে।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ফারহা তানজীম তিতিল বলেন, ‘বনের একাংশে সরকারের বন বিভাগ নামক বিভাগটির জন্মের বহু আগে সাংসারেকদের যে মাংরুদামটি গড়ে উঠেছিল, সেটি রক্ষায় সবাইকে জোর গলায় প্রতিবাদ করতে হবে। এটি শুধু সাংসারেকদের নয়, শুধু মান্দিদের নয়; আমাদের সবার দায়। ধরে নিলাম, বাংলাদেশে বসবাসকারী সাংসারেক ধর্মের মান্দিরা নেই হয়ে গেল। তাই বলে তাদের শ্মশানটিও ধ্বংস করে ফেলতে হবে! এই শ্মশান তো স্মৃতিচিহ্ন হয়ে সাক্ষী দেবে- একদা বাংলাদেশে সাংসারেক নামে একটি ধর্ম ছিল।’

পাকিস্তান সরকার ১৯৬২ সালে মধুপুরের শালবনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। তখনই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বসবাসরত আদিবাসীরা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়তে জন্ম হয় জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের। ২০০০ সালে বন বিভাগ মধুপুরে ইকোপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিলে আন্দোলনে নামে আদিবাসীরা। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি আন্দোলন চলাকালে বনরক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে পীরেন স্নালের মৃত্যু হয়। আহত হয় অর্ধশত আদিবাসী। এ বছরের মার্চে বন বিভাগ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করতে গেলে ফের প্রতিবাদে নামে আদিবাসীরা। বন্ধ করে দেয় নির্মাণকাজ।

বন বিভাগ জানায়, ২০১৮ সালে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ‘স্থানীয় নৃগোষ্ঠী জনগণের সহায়তায় ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প শুরু হয়। এ বছরের জুনে শেষ হবে প্রকল্পের মেয়াদ। প্রকল্পের আওতায় ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ওয়ার্কার’ হিসেবে ৭০০ জন গারোকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কিছু স্থাপনা ও আরবোরেটাম বাগানও রয়েছে প্রকল্পের আওতায়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ বলেন, ‘আদিবাসীরা প্রকৃতি পূজারি বলে বন ও প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমরা আপত্তি জানানোর পরও আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রাচীন মাংরুদামের ওপর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে। অবিলম্বে এই নির্মাণ কাজ বন্ধ না হলে আমরা আমাদের আন্দোলন জোরদার করব।’

মধুপুরে বসবাসকারী মান্দিরা জানায়, ১৮টি আদিবাসী সংগঠন সভা করে প্রকল্পের নামে মাংরুদাম ধ্বংসের চরম বিরোধিতা করে। প্রকল্পে স্থানীয় নৃগোষ্ঠী জনগণের সহায়তার কথা উল্লেখ থাকলেও আদিবাসীদের সঙ্গে সে বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ২৯ এপ্রিল মাংরুদাম বিষয়ে নিজেদের দাবিগুলো জানাতে বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিতে যান জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের নেতারা। কর্মকর্তাদের মৌখিক আশ্বাসে সংগঠনের সভাপতি ইউজিন নকরেক ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রবীণ চিসিমসহ বেশ কয়েকজন নেতা ফেরার পথে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্বোধন করে ফেরেন। তবে সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাকর্মীসহ বসবাসকারী মান্দিরা বিষয়টির প্রতিবাদ জানান।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রবীণ চিসিম বলেন, ‘প্রকল্পের নামটি নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিল। যেহেতু জমি বন বিভাগের এবং আদিবাসী অধ্যুষিত বলে একটি রাস্তা ও অন্যদের দাবি অনুযায়ী মাংরুদামটি আলাদা করে প্রাচীর করে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল আমাদের।’ স্মারকলিপি দিতে গিয়ে বন বিভাগ তা মেনে নেওয়ায় উদ্বোধনে তারা অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

মধুপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান যষ্টিনা নকরেক বলেন, ‘সংগঠনের নেতারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমাকে রেঞ্জ অফিসে ডাকা হয়। বৃহত্তর স্বার্থে নেতারা সিদ্ধান্ত দিলে আমিও উপস্থিত ছিলাম প্রাচীর উদ্বোধনে।’ তবে আগেই কাজের অনুমোদন না দিয়ে সবার শ্মশানটি রক্ষায় অটল থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জয়েনশাহীর সিনিয়র সহসভাপতি রিচার্ড বিপ্লব সিমসাং বলেন, ‘বাপ-দাদাদের লাশগুলোকে যেখানে পোড়ানো হতো সেটিই দখল করে ফেলছে বন বিভাগ। বন বিভাগের সঙ্গে আমাদের কিছু দালাল মিলে এমনটি করছে। আমাদের অন্ধকারে রেখে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজটি করে ফেলতে চাইছে তারা। আমরা এটি কোনোভাবেই করতে দেব না।’ – সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত