প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘কে বলেছে সিনেমা হল কমে গেছে, এখন সিনেমা হল আছে কয়েক কোটি’

জসিম উদ্দিন জাকির (চিত্রপরিচালক): আগে যদি সিনেমা ছিল ১৫০০/১৮০০। আর এখন সিনেমা হল আছে কয়েক কোটি। আগে সিনেমা হল ছিল জেলা- উপজেলায়, এখন সিনেমা হল হয়েছে বিশ্বের ঘরে ঘরে- চায়ের দোকানে – অফিসে – রেস্টুরেন্টে।

একটা সময় গ্রামীণ যাত্রা পালা, পুথি-পত্র, মঞ্চ নাটক, কিচ্ছা, জারি- সারি, পালাগান এসব শুনে/ দেখেই বিনোদিত হতো, বিনোদন প্রিয় মানুষের মন। প্রযুক্তির উন্নয়নে চলে এলো কলেরগান, রেডিও। পুরাতন বিনোদন মাধ্যম গুলো ভুলে কলেরগান ও রেডিওতে ঝুঁকে পড়লো বিনোদন প্রিয় মানুষ। কয়েক বছর ভালোই কাটলো তাদের দিন। আবার প্রযুক্তির উন্নয়নে এলো অডিও ক্যাসেট। কলেরগান এবং রেডিও কে পেছনে ফেলে রমরমা হয়ে উঠলো অডিও ক্যাসেটের ব্যবসা। কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করলো অনুপম, ব্রাইথ ব্রেশন্থ টু, সোনালী প্রোডাক্ট, সংগীতা, সাউন্ডটেক সহ অসংখ্য অডিও কোম্পানি। পাশাপাশি বড় পর্দায় সিনেমা।

বাংলা সিনেমা নির্বাক থেকে সবাক, সাদা- কালো থেকে আংশিক রংঙ্গিন, এর পর সম্পূর্ণ রঙ্গিন। আর এভাবেই পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুন নতুন প্রযুক্তি সবসময়ই মানুষের মন জয় করতে থাকলো, আর এটাই স্বাভাবিক ( বাদ রেখে গেলাম সাদা-কালো টিভি থেকে রঙ্গিন টিভির ইতিহাস )। সুন্দর ও গৌরবোজ্জ্বল ভাবেই চলতে ছিল সিনেমা ও অডিও ক্যাসেটের ব্যবসা। তখন আরেক নয়া প্রযুক্তির আবির্ভাব হলো, আর সেটা হলো ভি.সি.আর। ভি.সি.আর প্রযুক্তি সিনেমা ও অডিও ব্যবসার তেমন একটা ক্ষতি করতে পারেনি, কারণ- এটি ছিলো অনেক ব্যয়বহুল।

চীন খুব স্বল্প বাজেটে যখন সিডি/ভিসিডি প্লেয়ার বাজারে ছাড়লো, তখন বিনোদন প্রিয় মানুষগুলো স্পস্ট সাউন্ড এবং ঝকঝকে ছবি পেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো সিডি/ভিসিডির উপর। ক্রয় ক্ষমতা সামর্থ্যের মধ্যে হওয়ায় প্রায় সকল নি¤œ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ড্রয়িং রুমে শোভা পেতে থাকলো এসব নতুন প্রযুক্তি। সেই সময়টাতেই ম্যাক্সিমাম দর্শকদের ঘরে আটকে ফেললো এই সিডি/ভিসিডি। কয়েকদিনের মধ্যেই ভ্যানিশ হয়ে গেলো অডিও ক্যাসেট, টানাপড়েন শুরু হলো সিনেমা ব্যবসা তথা সিনেমা হল ব্যবসায়।

এখানেই কিন্তু শেষ নয়??? এর পর এলো মেমোরি কার্ড/ পেনড্রাইভের প্রযুক্তি। ধ্বংস করে দিল সিডি/ভিসিডি ব্যবসার। মেমোরিতে হাজার হাজার গান, সিনেমা, নাটক ঢুকিয়ে ঘরে বসে, অফিসে বসে দেখা শুরু করলো দর্শক। রমরমা বাণিজ্য চললো কয়েক বছর। এই মেমোরি কার্ড / পেনড্রাইভের বাজার কেড়ে নিলো এবং আমাদের সিনেমা হলের ব্যবসায় শেষ পেরেক ঠুকে দিলো ইন্টারনেট সম্বলিত এন্ড্রয়েড ফোন। এই এন্ড্রয়েড ফোন সিনেমা সহ আরও কত যে ব্যবসার লাল বাত্তি জ্বালিয়েছে তার হিসেব নেই। তাই বলে কি প্রযুক্তি থেমে থাকবে? কখনোই না। সবাইতো এখন মোবাইলে সিনেমা দেখে। তাই বলে কি আমরা সিনেমা বানানো বন্ধ করে দেবো? কখনোই না। প্রযুক্তি চলবে তার নিজস্ব গতিতে, আর আমাদেরও উচিত এই প্রযুক্তির মুখে লাগাম লাগিয়ে তার সাথেই তাল মিলিয়ে চলা ।

করোনা যেমন একটা সময় সমগ্র পৃথিবীকে স্থবির করে দিয়েছিল, থমকে দিয়েছিল সবকিছু। আমরা যেমন করোনার সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে শিখেছি, আমরা যেমন করোনার নতুন নতুন রুপ পরিবর্তনকে বুঝেশুনে নতুন নতুন ভ্যাকসিন আবিস্কার করতে পারছি, ঠিক তেমনি প্রযুক্তির নতুন নতুন ভার্সনকে কাজে লাগিয়ে, সেই প্রযুক্তির সাথে নিজেদেরও আপডেট করে নিতে হবে। আমি/ আপনারা যারা সিনেমা হল বাঁচাও, সিনেমা হল বাঁচাও বলে মিটিং মিছিল করছি, সিনেমা হলে দর্শক ফিরিয়ে আনার জন্য সভা- সেমিনার করছি। আমরা সবাই বুকে হাত দিয়ে বলি তো, নিজেরা লাস্ট কবে সিনেমা হলে মনের টানে সিনেমা দেখতে গিয়েছি? আমার মনে হয়না আশানুরূপ রেজাল্ট পাবো। যেখানে আপনি/ আমি নিজেই সিনেমা হলে যাইনা, সেখানে যেতে অন্যদের কিভাবে প্রভাবিত করব?

আসলে সিনেমা হলে এখন কেউই যেতে চায় না। একটা সময় মানুষ মাইলের পর মাইল হেটে গিয়ে কাজ কর্ম করেছে। আর এখন? যানবাহনের পর্যাপ্ততার কারণে, সময়ের ব্যবধানে, মানুষ অনেক বেশি আরামপ্রিয় হয়েছে। ৫ মিনিটের পায়ে হাটার রাস্তাও মানুষ এখন ২০ টাকা রিক্সা ভাড়া দিয়ে যায়। তাই আসুন – আমাদের আরামপ্রিয় মানুষদের আর কষ্ট না দিয়ে, আমাদের স্বার্থেই আমাদের প্রোডাক্টগুলোকে তাদের মুখে তুলে দেই, যেন তারা আরাম করে গিলতে পারে। পৃথিবীর ম্যাক্সিমাম দেশের মানুষই তাদের সিনেমাকে অনলাইনে নিয়ে এসেছে, আর আমরা এখনো আছি দর্শকদের ঘাড়ে ধরে, জোর করে সিনেমা হলে ঢুকানোর প্ল্যান নিয়ে। আর এদিকে হইচই, নেটফ্লিক্স এর মত বিদেশি কিছু অ্যাপস কোটি কোটি টাকা এদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে।

আর সময় নেই, এক্ষুনি দরকার সরকারি উদ্যোগে হলেও বিএফডিসি ভিত্তিক একটি অনলাইন অ্যাপস করা। যে অ্যাপসের নাম হতে পারে ‘সিনেমা হল’। আগের মতই এই একমাত্র অ্যাপসের মাধ্যমেই রিলিজ হবে এদেশের নতুন যত সিনেমা। বড় বড় স্টার শিল্পী হতে শুরু করে সবার সিনেমা যখন একটা অ্যাপস থেকে রিলিজ হবে, তখন ঐ অ্যাপসের পাবলিসিটি হবে দ্রুত।

এরপর কোন প্রযোজক যদি চান, দুই সপ্তাহ কিংবা এক মাস পর এই অ্যাপস থেকে তার হিসেব বুঝে নিয়ে সিনেমা নামিয়ে তার পার্সোনাল অ্যাপস- এ আপলোড করবেন কিংবা অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দিবেন সেটাও করতে পারেন। এই সিস্টেম চালু হলে আমি মনে করি প্রতিটি প্রযোজক তার বিনিয়োগ ফিরে পাবেন নিশ্চিত। কারণ – এখানে নেই সিনেমা হলের টিকিট বিক্রির টাকার কমিশন, এখানে নেই বুকিং এজেন্ট, এখানে নেই টিকিট চেকার, এখানেই নেই কোন প্রকার নয়-ছয় হিসাব।

আমাদের সম্মানীত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নেতৃবৃন্দের উচিৎ, নিয়ম করে প্রতিটি রিলিজকৃত নতুন সিনেমা যেন স্পন্সর পেতে পারে সেই বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করা। কারণ- এখন অনেক অনেক কোম্পানি অনলাইনে স্পন্সর করে থাকেন। একজন প্রযোজক যদি তার মূল টাকাটাও ফেরত পাওয়ার গ্যারান্টি পায়, এই ইন্ডাস্ট্রি আবার জেগে উঠবে এবং অনেক প্রযোজক সিনেমা বানাতে আগ্রহী হবে বলে আমার বিশ্বাস।।।।।।
প্রযোজক বাঁচলেই সিনেমা বাঁচবে, আবারও এই শ্লোগান দিয়েই শেষ করছি। (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত