প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাশেদা রওনক খান: প্রবাস জীবন আর কষ্টের রেমিটেন্স!

রাশেদা রওনক খান: জেদ্দার বাংলাদেশ হাউজ। সবেমাত্র এলাম, একমাস প্রায় হয়ে গেলো। এখনো গুছিয়ে ওঠা হয়নি সব। নিজ সংসারের শিপমেন্ট এখনো এসে পৌঁছায়নি। সকালের নাস্তা সেরে পড়ার টেবিলে বসলাম কেবল। হঠাৎ আমার জানালা দিয়ে দেখি একজন বাংলায় কথা বলছেন, সিলেটি ভাষায়। ভাবলাম আমাদের বাসার স্টাফ। কিন্তু কথাগুলো একটু ভিন্নরকমের ঠেকছে দেখে ল্যাপটপ হতে মুখ তুলে জানালার পর্দা সরিয়ে তাকালাম, দেখি পাশের বিশাল অট্টালিকার গায়ে রং লাগাচ্ছেন একজন শ্রমিক, যিনি কথা বলছিলেন বাংলায়। মুহূর্তেই তাকে কাজ করতে দেখে যে প্রশ্নটি মাথায় এলো, এই মুহূর্তে জেদ্দার গরম কী রকম, কী কঠিন রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে এই মানুষটি কাজ করে চলছেন তার পরিবারের মানুষ কি জানেন? জানেন কি তার মতো কতো লাখ মানুষ সৌদিতে এভাবে কঠোর কঠিন পরিশ্রম করে পরিবারের মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য দেশে টাকা পাঠান?

দামি দামি পারফিউম, ফোনসেট, লোশন, ক্রিম কিনে নিয়ে যান কেবলমাত্র পরিবারের সকলের মুখের হাসিটুকু দেখার জন্য? আমি ধীর পায়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাসা হতে বের হয়ে এক মিনিটের জন্য বাসার সামনে উঁকি দিলাম রোদ্রের প্রখরতা বোঝার জন্য, মনে হলো, ওই এক মিনিটেরও কম সময়ে আমার গায়ের চামড়া যেন পুড়েই গেলো! এই রোদ্রে এভাবে রাস্তা ঘাটে আমাদের শ্রমিক ভাইরা কাজ করছেন, মাঝে মাঝে মনে হয় তাদের পাশে গিয়ে বসি, গল্প শুনি তাদের জীবনের, প্রবাসের কঠিনতম জীবন সংগ্রামের, কষ্টের, দুঃখের, কিন্তু বাস্তবতা আমাকে হয়তো থামিয়ে দেয়, কিন্তু একসময় শুনবো, আরেকটু গুছিয়ে নিতে পারলে সময়কে, হয়তো আপনাদেরও শুনাবো। প্রবাসী বোনদের গল্পগুলো হয়তো আপনাদের কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেবে। কেবল বলি, তাদের পাঠানো টাকাগুলো দিয়ে পরিবারের ভাই-বোন-মা-বাবা-স্ত্রী-স্বামী- সন্তানেরা আইফোন, পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান ড্রেস, ত্বক ফর্সা হবার ক্রিম কিনে অপচয় করছেন কিনা ভেবে দেখি, আমাদের জানা দরকার, তারা প্রায় গায়ের রক্ত বিক্রি করে দেশে টাকা পাঠায়! তাদের এই কষ্টের টাকা উড়িয়ে পাশের বাড়ির মানুষকে বুঝানোর কিছু নেই যে এই বাড়িতে প্রবাসী থাকেন। অন্যকে দেখানোর জন্য আমাদের যে প্রতিযোগী মন, সেই কেবল আমাদের মাঝেই আছে! তাদের কষ্টের টাকার নির্মম খরচ করা কতোটা অমানবিক হবে, তা কেবল স্বচক্ষে তাদের কষ্ট দেখতে পারলে বা  নিজ মনে অন্যের কষ্ট ফিল করার মতো মানবিক মন থাকলে সম্ভব।

তাদের কষ্টের মূল্য দেওয়া সম্ভব তখনই যখন তাদের পাঠানো টাকার সদ্ব্যবহার করবে পরিবার ও রাষ্ট্র। এই চামড়া পুড়ে যাওয়ার মতো রোদ্দুরে লাখো শ্রমিক ভাইয়েরা এই দেশে ঠিক এমন বা আরও কঠিন কাজ করছে, বিশ্বাস করুন। অনেক দেশেই তো থেকেছি, আমার নৃবৈজ্ঞানিক পাঠ-পঠন ও নিজস্ব চিন্তা-চেতনা দিয়ে প্রবাসীদের জীবন পাঠের চেষ্টা করেছি যখন যে দেশে গেছি সেই দেশের, কিন্তু সৌদি প্রবাসীদের জীবন-সংগ্রাম, কষ্ট, পরিশ্রম, এ যেন দুঃস্বপ্নের মতো, ভিন্ন রকম। এই প্রবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে আর্থিক সংকটে না খেয়ে থাকে, তবুও তারা পরিবারের হাসির জন্য টাকা পাঠায় যেভাবেই হোক! কতোজন জেলে আটকে আছেন নানা কারণে, কিন্তু পরিবারকে হয়তো জানাচ্ছেন না। কী যে কষ্ট, আর দুর্বিষহ এই প্রবাস জীবন কারও কারও জন্য, সেই খবর আমরা কতোজন রাখি! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মাঝে কেবল সৌদি আরবেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি, তাদের সংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়নেরও বেশি। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স দিয়ে কেবল তাদের পরিবার নয়, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রও চলে। চলতি বছর দেশের মোট জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকাকে চাঙা রাখছে এই করোনা মহামারির চলমান সংকটের মধ্যেও। বিনিময়ে তাদের আমরা আসলে তী দেই, কী পরিবার কী রাষ্ট্র! ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত