প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: ফেরিঘাট আর শপিংমলের ভিড় দেখে মনে হয় না করোনা বলে কিছু আছে, আসলে আমরা কী ‘মৃত্যু’র সঙ্গে মস্করা করছি!

দীপক চৌধুরী: নামকরা শপিংমল বা ফুটপাতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হাজার হাজার মানুষের পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা দেখে কিংবা ফেরিঘাটে মানুষের বাড়ি যাওয়ার ঢল দেখে মনে হয় না আমরা গরিব। আসলেই কী আমাদের অর্থাভাব রয়েছে! উন্নয়নশীল দেশের আমরা ধনী নাগরিক! ঈদ শপিংয়ের নামে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে চলেছে বিভিন্ন মার্কেটে। এটি ঢাকার নামিদামি শপিংমল হোক বা উপজেলার কাপড়-চোপড়ের মার্কেট হোক। শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের কথা বাদ দিলেও এতে এটা অন্তত স্পষ্ট বোঝা যায়, এদেশের কিছু মানুষের হাতে কমবেশি পয়সা আছে, এটাই সত্য। যদি চোখ খুলি তাহলে দেখতে পাই ‘দরিদ্র মানুষ’ আমাদের পাশেও আছে। কিন্তু আমাদের, অর্থাৎ যাদের হাতে অর্থকড়ি আছে তারা কী দেখেন? আর আমরা দেখলেও কতটুকু দেখি? লোকদেখানো দান-খয়রাতের আয়োজনে অমানবিক ঘটনাও আমাদের চোখে পড়ে। মর্মান্তিক মৃত্যুর চিত্রও দেখি দান-খয়রাতের ইস্যুতে। আমাদের পিছনে থাকা গোষ্ঠী বা সমাজের জন্য যারা কিছু করার প্রয়োজনবোধও করেন না তারাও সুযোগ পেলে ‘জ্ঞান’ দেওয়া শুরু করেন। তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই তারা টেলিভিশনের টকশো বা রাজনৈতিক বক্তৃতায় মানবতার জ্ঞানের ঝুড়ি খুলে বসেন। তাতে অনেকেরই পিত্তি জ¦লে গেলেও তারা নির্বকার। কারণ, সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে তো নিষেধ। আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসেবে দেখি এদেশে হাজার হাজার কোটিপতি, মিলিয়নার। এতে মনে হয়ে থাকে, দেশে যে হারে ধনীদের উত্থান ঘটে চলেছে তাতে দরিদ্র মানুষের কষ্ট হওয়ারই কথা না। কিন্তু দরিদ্রদের কষ্ট হচ্ছে। এদেশে দীর্ঘদিন তো আইনের শাসনই ছিলো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না মর্মে আইন জারি করা হয়েছিল যেদেশে- সেইদেশে চুরি-ডাকাতি-লুটপাট-ধর্ষণের বিচার করা কী সম্ভব ছিলো? ইতিহাসে এর অসংখ্য বিবরণ মিলবে। আর এখন? এজন্যেই তো কয়েকজন হেফাজতি নেতা এখন ধর্ষণ মামলায় জেলে। পুলিশ রিমান্ডে।

যাকগে, যে কথা বলতে চাই, করোনা নিয়ে বিশ্ব বিধ্বস্ত। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। তারা আমাদের বাঁচানোর জন্য করোনা ভ্যাকসিন আবিস্কার করেছেন। বিশ^ স্বাস্থ্যসংস্থা প্রতিনিয়ত সতর্ক করছে। অথচ করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতা দেখছি। এই প্রবণতা একশ্রেণির মানুষের, এটি ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ফেরিঘাটে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এক সদ্যবিবাহিত যুবকের জবাব, সরকার তো বউ দেবে না এজন্যেই তিনি বাড়ি যাচ্ছেন।

শপিং করা ও বাড়ি যেতে ফেরিঘাটের যে দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ভাসছে তাতে স্বাস্থ্যবিধির ছিটেফোঁটাও নেই। এটা যেন এক শ্রেণির মানুষের মস্করা। এই মস্করা সরকারের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে নাকি মৃত্যুর সঙ্গে, না নিজের সঙ্গে! বারবার করোনা নিয়ে আশঙ্কাজনক খবর প্রচার হচ্ছে এরপরও সাবধানতা নেই। শপিংমল থেকে পাঁচটা/সাতটা ব্যাগভর্তি নতুন কাপড় নিয়ে যেসব নর-নারী মাস্কবিহীন হাসতে হাসতে যানবাহনে উঠছেন তারা ভিন্নগ্রহের মানুষ নন। এটাই কী শেষ? আর ঈদ আসবে না? আগেতো জীবন। ফেরিঘাট আর শপিংমলের ভিড় দেখে মনে হয় না করোনা বলে কিছু আছে? আসলে আমরা জীবনের সঙ্গে মস্করা করছি!

টিভি দেখছিলাম। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণবঙ্গের ঘরমুখী মানুষের ঢল নেমেছে মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া ফেরিঘাটে। ভোর থেকেই গন্তব্যের উদ্দেশে শিমুলিয়া ঘাট এলাকায় এসে জড়ো হচ্ছেন হাজার হাজার যাত্রী। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভিড় বেড়েই চলেছে। কোনো কোনো সাংবাদিকের মতে, অনেকটাই জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে এই ভিড়। এটাকে কী বলবো আমরা? শুধু কী শিমুলিয়া। শুনেছি, শেষ পর্যন্ত ঘরমুখী যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে ফেরি চলাচলের অনুমতি দিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। আমরা কেমন ‘বেকুব’। টিভিতে ভয়ংকর দৃশ্য দেখলাম, মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিতে হুড়োহুড়িতে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের ধৈর্য কোথায় যেনো নষ্ট হয়ে গেছে। উপেক্ষা আর অবজ্ঞা করছি কেনো নিজের সঙ্গে? মা-বাবা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কারো কথা ভাবতে চাই না। পরিবারকর্তার অনুপস্থিতিতে পরিবারটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? হয়তো কেউই জানিনা শেষ কোথায়। এ জন্যেই সচেতনতা জরুরি।

করোনার বিস্তার রোধে চলমান লকডাউনে (!) ক্ষতিগ্রস্ত, দরিদ্র, অসচ্ছল মানুষের জন্য সাড়ে ১০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত নিম্নআয়ের প্রায় ৩৫ লাখ পরিবার এবং অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১ লাখ কৃষকসহ ৩৬ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন। শুধু কী তাই! সমাজের সকলস্তরের মানুষের জন্য প্রণোদনা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের জন্য ১০ কোটি টাকা দিয়েছেন। দরিদ্র মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, খামারী, কৃষক, দুঃস্থ সাংবাদিক সবাই কিন্তু কমবেশি উপকারভোগী। এমন কোনো সেক্টর নেই যা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নখদর্পনে নেই। এর খোঁজ-খবর বা নজর রাখছেন না তিনি। তবু তাঁর তীব্র সমালোচনা। পত্রিকায় দেখলাম, কেউ কেউ সমালোচনার পাশাপাশি ঘোষণাকৃত অর্থ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা করার দাবি করেছেন। ‘লকডাউনে মানুষের হাহাকার বন্ধে ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছাও’ ব্যানারে আয়োজিত প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচীও পালন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য মানুষকে আহ্বান জানানোর বদলে উস্কে দেওয়ার জন্য ‘তারা’ ওস্তাদ। শুধু ‘নাই নাই’ আর চারদিকে ‘হাহাকার’ তুলে যারা বক্তৃতা দেন– তারা আসলে এদেশের মানুষের মঙ্গল চান কিনা সন্দেহ রয়েছে। সর্বত্র শুধু ‘অভাব অভাব’ জানান দেওয়ার জন্য তারা সমগোত্রীয়দের নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। যেনো কে বেশিবার উচ্চারণ করতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা। ‘তারা’ একবারের জন্যও ভাবতে চান না দেশটি আমাদের। আশ্চর্য করে দিয়ে করোনাকালে আমাদের রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। কিন্তু এ কথাটি তাদের মুখে শোনা যায় না।

বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা কী অস্বীকার করা যায়! একটি দেশ কতটা উন্নত বা অনুন্নত তা বিচার করা হয় কতগুলো সূচক বা মানদণ্ডের সাহায্যে। আমাদের জাতীয় উৎপাদন, জনগণের মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মানসহ বিভিন্ন দিক বিচারে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করেছে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছরই পূর্ববর্তী বছরগুলোকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৪ ডলার। শুধু হা-হুতাশ নয়। মেট্রোরেল হয়েছে, পদ্মাসেতু হয়েছে। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। সুতরাং করোনাকালে প্রতিটি নাগরিকেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। সচেতনতা জরুরি। করোনাকে জয় করতে পারলে উন্নয়ন-অগ্রগতি বাড়বেই আমাদের।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত