প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফ যাবতিক: বালামুরি টু চঞ্চল চৌধুরী

আরিফ যাবতিক: ১. বিবিসিতে ‘বালামুরি’ বলে একটা একদম ন্যাদা বাচ্চাদের উপযোগী সিরিজ আছে, বাচ্চাদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই সিরিজ ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাদেরকে বুঁদ করে রাখা যায় কয়েক ঘন্টা। একবার লন্ডনে অর্নার একটা দীর্ঘ প্রফেশনাল কোর্সের সময় আমি বাচ্চাদের একক প্যারেন্ট হিসেবে সারাদিন বাসায় থাকতাম। তখন বড় বাচ্চাটা একেবারেই ছোট, তাঁকে এন্টারটেইন করার জন্য বিবিসি তো ছেড়ে রাখতামই, অন্যসময়ও বালামুরির সিডি ছেড়ে দিতাম।

তো একদিন অর্না ডিনারে বসে আমাকে বলল, ‘এই যে বালামুরি সিরিজটার কাস্টিংটা খেয়াল করেছ?’ আমি বললাম, ‘না, এখানে খেয়াল করার কী আছে?’ সে বলল, ‘খেয়াল করলে দেখবা এই সিরিজের কাস্টিং খুব ব্যালেন্স করে করা হয়েছে। সাদা মানুষ, কালো মানুষ, বাদামি মানুষ। বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এর মাঝে একজন হুইল চেয়ারে বসা মানুষ। ইংল্যান্ড একটা সমন্বিত এপ্রোচ নিয়েছে মানুষের মাঝের বিভেদ রেখাকে মিনিমাইজ করতে। এমনিতে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু এটা সতর্কভাবে করা হয়। এই যেমন বালামুরি সিরিজটা বাচ্চারা একেবারে ছোটবেলা থেকে দেখছে, তাঁরা দেখছে সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ থাকা, কারো চামড়ার রঙ ভিন্ন হওয়া কিংবা শারিরীক ভাবে চ্যালেঞ্জড হওয়া, এগুলো খুব স্বাভাবিক বিষয়। স্কুলে বা অন্যান্য জায়গাতেও এই স্বাভাবিকতাকে প্রমোট করা হয়, যাতে বাচ্চারা বড় হয়ে এসব নিয়ে আলাদা কোনো বিকারে না ভুগে!

২. আমি নিজেকে যে হালকা অসাম্প্রয়ায়িক মানুষ মনে করি এর কারন সম্ভবত আমি সিলেট শহরের যে এলাকায় বড় হয়েছি ( মাছুদীঘি, রামের দীঘি, দাড়িয়াপাড়া, মির্জাজাঙ্গাল) এই এলাকায় প্রচুর নন মুসলিমদের বাস। সুতরাং ছোটবেলা থেকেই কেউ হিন্দু বা মুসলমান হওয়া না হওয়া নিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব করতে, খেলতে, গল্প করতে কোনো অসুবিধা হয় নি এবং বড় হয়েও এটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

৩. সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ কিংবা মানুষে মানুষে জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বিভেদ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি এপ্রোচ নিয়ে সভ্য সমাজ এসবকে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে। নির্মূল করা যায় না বটে, কিন্তু নূন্যতম নিয়ন্ত্রন করার একটা চেষ্টা সবসময় জারি রাখা প্রয়োজন।

৪. চঞ্চল চৌধুরীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ফেসবুকে উষ্মা প্রকাশ করেই তাঁর সহশিল্পীরা যদি দায়মুক্ত মনে করেন, তাহলে সেটা ভুল ভাবছেন।
আপনি যদি মনে করেন যে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা, বিভেদ বিদ্বেষ দূর হওয়া দরকার, তাহলে সেটি আপনাদের শিল্পীসত্ত্বা দিয়েই করতে হবে।

এই যে প্রতিমাসে শত শত টিভি নাটক হয়, কই কোথাও তো একটা হিন্দু পরিবারকে দেখানো হয় না? দূর্গাপুজা কিংবা রবিবাবুর গল্পের নাট্যরূপ দেয়ার সময় হিন্দু চরিত্রের দেখা পাই বটে, বাকি সারাবছর হাজার হাজার নাটকে খালি মুসলিম পরিবার, মুসলিম বস, মুসলিম প্রেমিকা, মুসলিম চোর। এখানে পাশের বাসায় একজন হিন্দু বা খ্রিস্টান কি থাকতে পারে না?

অথবা এই যে ঢাকা শহরে হিন্দুদের বাসাভাড়া পেতে সমস্যা হয়, এটা নিয়ে একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট কি আমাদের কোনো নাট্যকার কখনো লিখেছেন?

এই যে ‘পায়ূসেনা’ বলে আমরা মাদ্রাসা ছাত্রদের উপহাস করি, সেই মাদ্রাসাছাত্রদের সংকট কি আমাদের কোনো টিভি নাটকে এসেছে, গল্পে এসেছে? শতশত কোটি টাকার ফেয়ার এন্ড লাভলি বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু শরীরের রঙ কালো হোক নাকি ফরসা হোক-এতে কিছুই যায় আসে না-এই মেসেজটা আমরা কি আমাদের শিল্পকলায় কখনো শক্তভাবে দিতে চেষ্টা করেছি ?

যদি আমাদের শিল্পে, আমাদের গল্পে এই সবগুলো ছবি আসত তাহলে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ একে অপরকে বুঝতে পারত, জানতে পারত, সহাবস্থান আর একে অন্যকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারত। এভাবেই তখন সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, লিঙ্গবাদের বিরুদ্ধে জনমানুষের মানসিকতায় একটা ছাপ থাকত। এসব মুছে ফেলা যাবে না, কিন্তু নিয়ন্ত্রন সম্ভব হবে জনমানুষের অংশগ্রহনেই।

৫. চঞ্চল চৌধুরীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় যারা নিন্দে জানাচ্ছেন, আমি তাঁদের পাশে আছি। কিন্তু তাঁরা যদি তাঁদের শিল্পীসত্ত্বা দিয়ে সমাজ বিনির্মানে নিজের ভুমিকাটুকু না রেখে যান, এসব নিন্দেমন্দ জানানো ঐ সিগারেটের ধোয়ার মতোই দুটো কুন্ডুলি পাকিয়ে মিলিয়ে যাবে, সমাজের কোনো লাভ হবে না।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত