প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘বাংলাদেশ’ নামের আগে ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক’ বিশেষণটি কী বুঝাতে যোগ করা হয়েছে, ভেবেছেন কখনো?

আলিম আর রাজি: ‘বাংলাদেশ’ নামের আগে ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক’ বিশেষণটি কী বুঝাতে যোগ করা হয়েছে, ভেবেছেন কখনো?। ১৯৭১ সালে ১৭ই এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ গ্রহণের পর পরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রথম বারের মতো দেওয়া তাঁর বক্তৃতায় এ দেশের নাম উল্লেখ করেছিলেন এভাবে- “স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের উপরাষ্ট্রপতির শপথ আমি গ্রহণ করেছি।” এই ‘জনগণতান্ত্রিক’ কথাটা উনি কি আকস্মিকভাবে বলেছিলেন, না কি ভেবে-চিন্তে বলেছিলেন? ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করার পরও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কেন ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নামে এই রাষ্ট্রকে অভিহিত করেছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ‘জন’ শব্দটা কী অর্থে ব্যবহৃত হয় তা দেখে নেওয়া যেতে পারে। বঙ্গীয়শব্দ কোষে বলা হচ্ছে- ‘জন্’ ‘দেবাদিগণীয়, আত্মনেপদী ও সংস্কৃত ধাতু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই জন্ ধাতুটির অর্থ জনন, উৎপত্তি, সত্তা, হওয়া থেকে শুরু করে জন্মী, প্রাণীমাত্র, জীব ইত্যাদি অর্থ বহন করে। বাংলা ভাষায় ‘জন’ ‘পুরুষ’ অর্থেও ব্যবহৃত হয় – ‘জানেন যে জন (অন্তর্যামী যিনি)’ কিন্তু মৈথিলি ভাষায় ‘জন’ শব্দের অর্থ শ্রমজীবী, মজুর।
বঙ্গীয় শব্দকোষে হরিচরণ ‘আলালের ঘরে দুলাল’ থেকে ‘জন’ শব্দ ব্যবহারের যে উদাহরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে- ‘জনখাটা ভরসা’। বাংলা ভাষাতেও এমন অসংখ্য ব্যবহার আছে যেখানে ‘জন’ হচ্ছে একক মানুষ, ব্যক্তি মানুষ। যেমন- কতো জন এলো আজ?, জনে জনে কথা বলে এ চাঁদা ধার্য্য হয়েছে, সে আমার আপন জন ইত্যাদি।

‘জন’ শব্দের সাথে যুক্ত যে ‘গণ’, সেই ‘গণ’ শব্দ দিয়েই বা কী বুঝায়? হরিচরণ তার বঙ্গীয় শব্দকোষে প্রথমেই সমূহ, নিচয়, সমুদয় অর্থে ‘গণ’-এর ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন, উদাহরণ দিয়েছেন অরিগণ, গুণিগণ, পিতৃগণ, সখীগণ ইত্যাদি। কিন্তু লক্ষ্যযোগ্য হচ্ছে, উনি ‘গণ’ শব্দটির যে অর্থ দিয়েছেন সেটি হচ্ছে- ‘যাহারা মিলিতভাবে এক কার্য্যদ্বারা জীবিকার্জ্জন করে (মেধাতিথি), সমবায়, সঙ্ঘ।’ এই ‘গণ’ থেকেই গং। এই যেমন বাংলাদেশের সংবিধানের নানান প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন ‘হাসনাত গং’। ‘গং’ হচ্ছে আদতে ইংরেজি ভাষার ‘গ্যাং’, একদল মানুষ।

এ দেশে মানুষকে আদিতে নাকি ‘জন’ আর ‘গণ’ বর্গে চিহ্নিত করা হতো। যারা একা একা জীবিকা উপার্জন করত তারা হচ্ছে ‘জন’; আর যারা দল বেঁধে জীবিকা করত তারা হচ্ছে ‘গণ’। যারা মাছ ধরত তারা সবাই একসাথে থাকত, তারা ‘মৎসজীবীগণ’, যারা মাটির জিনিসপত্র বানাত তারাও এক সাথে থাকত-‘কুমোরগণ’, চাষ যারা করত তারাও সবাই একসাথে থাকত, তারা ‘চাষাগণ’।
কলিম খান-রবি চক্রবর্তী যেমনটি অনুমান করেছেন- রাজা দক্ষের কালে তার অনুগত সমাজ প্রথমবারের মতো বর্ণে বিভক্ত হয়েছিল কিন্তু শিবানুসারীরা অস্বীকার করে কোন একটি বর্ণে বা বর্গে আশ্রয় নিতে। এই শিবানুসারীরা কেউ কেউ একা একা ‘জন’ হিসেবে খেটে খাবার যোগাড় করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আর কিছু মানুষ ‘গণ’ বা ‘গ্যাং’ হিসেবে “মিলিতভাবে এক কার্য্যদ্বারা জীবিকার্জ্জন” করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই হচ্ছে ‘জন’ ও ‘গণ’ সম্পর্কে প্রকল্প এবং এ থেকে অনুমান করা যায় যে- এই ‘জন’ আর ‘গণ’ মিলেই আমাদের এই দেশের বাসিন্দারা ‘জনগণ’। এই জনগণের নির্ধারণ করে দেওয়া তন্ত্রে শাসিত হবে যেই রাষ্ট্র তার নাম সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে তাই ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিলও ছিল- ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’।

সুতরাং বেশ কিছু বিবেচনাতেই বলা যায়, এই রাষ্ট্রটিকে তার প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ‘জনগণতান্ত্রিক’ নামে অভিহিত করে অধিকতর শুদ্ধ অবস্থানে ছিলেন। আনোয়ার পাশা তাঁর ১৯৭১ এর এপ্রিলে শুরু করে জুনে শেষ করা রাইফেল রোটি আওরাত-এও এই দেশের মানুষকে অভিহিত করেছেন, ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের মানুষ’ হিসেবে। দেখা যাচ্ছে, ‘জনগণতান্ত্রিক’ অভিধার পেছনে ইতিহাসবোধ ও ভাষাবোধের যথেষ্ট সমর্থন ছিল। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আমরা এই রাষ্ট্রটির নাম ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক’ করলাম কোন বিবেচনায়? সম্পূর্ণ নতুন ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক’ প্রত্যয়টি কি অধিকতর শুদ্ধ ও জনবোধ্য হলো? সে প্রশ্নের আলোচনা আগামী পর্বে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত