প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবুর ৫০ পদের অন্যরকম চায়ের দোকান

ডেস্ক রিপোর্ট: আমরা সাধারণত দুই প্রকার চা পান করে থাকি। রং চা আর দুধ চা। এর বাইরে স্বাস্থ্য সচেতনরা পান করেন সবুজ চা। কিন্তু স্বাদ ও গন্ধে ৫০ প্রকারের চায়ের কথা কেউ শুনেছেন? আপনি শুনে না থাকলেও ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ আর গন্ধের ৫০ প্রকারের চা পান করছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবসহ আশপাশের হাজারও মানুষ। এনটিভি

ভৈরব উপজেলার শিমূলকান্দি ইউনিয়নের রাজনগর গ্রাম। সেই গ্রামের বাজারে একটি টিনের চালার দোকানে বসে এই ৫০ রকমের চা তৈরি করেন স্থানীয় যুবক নজরুল ইসলাম আবু। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলে তাঁর চায়ের পসরা। আর সেই চা পান করতে প্রতিদিন ভৈরবের বিভিন্ন এলাকাসহ পাশের উপজেলা আশুগঞ্জ, রায়পুরা, বেলাবো, কুলিয়ারচরের লোকজন ছুটে আসেন তাদের বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে।

তারা জানান, ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ আর গন্ধের এই অন্যরকম চা তাদের খুব ভালো লাগে। একেক দিন তারা একেক স্বাদের চা পান করেন। কেউ কেউ একই দিন একাধিক স্বাদের চা পান করে থাকেন।

তাদের কেউ কেউ জানান, শুধু স্বাদ আর ভিন্ন গন্ধ নয়, এই মহামারি করোনাকালে নজরুলের কিছু চা পান করলে ঠাণ্ডা, কাশি ইত্যাদি নিরাময় হয়। তাই তারা প্রতিদিন এই চা পানে ছুটে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আহম্মদ হোসেন মাইজভাণ্ডারী ও মো. আকবর আলী জানান, রাজনগর বাজার শিমূলকান্দি ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী পুরাতন বাজার। এই বাজারে অন্য চা দোকানির মতো নজরুলও সাধারণ একজন চা বিক্রেতা ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে হরেক রকম বাহারী চা বানানো শুরু করলে তিনি আলোচনায় চলে আসেন। বর্তমানে নজরুলের বাহারী চায়ের কারণে এই বাজারটি নতুন করে খ্যাতি অর্জন করছে।

পাশের গ্রাম জগমোহনপুর থেকে নজরুলের বাহারী চায়ের টানে আসা প্রবাসী পারভেজ ও সোহাগ জানান, তাঁরা সৌদি আরব থাকেন। দেশে এসেছেন ছুটিতে। প্রায় প্রতি বিকেলেই তাঁরা রাজনগর বাজারে চলে আসেন এই অন্যরকম স্বাদ আর গন্ধের চা পান করতে। এই চা পান করে তাঁরা বেশ তৃপ্ত বলে জানালেন।

একই মতামত ভৈরব পৌর শহরের চণ্ডিবের মোল্লাবাড়ীর দুবাই প্রবাসী জুয়েল মিয়া। তিনি এসেছেন এক মামাকে নিয়ে, নজরুলের চায়ের ভিন্নতা দেখাতে।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ৫০ পদের অন্যরকম চায়ের দোকানে তরুণদের ভিড়।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কর্মী জহিরুল হক, আলম খান, আনোয়ার হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন জানান, তাঁরা চাকরি সূত্রে ভৈরবে বসবাস করলেও নজরুলের নিয়মিত ভোক্তা। প্রতিদিন অফিস শেষে তাঁরা এখানে চলে আসেন। আড্ডা আর চায়ের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে তাদের কেটে যায় সময়।

জহিরুলের অভিমত, নজরুলের বেশ কয়েক প্রকার চা সর্দি-কাশির প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে আদা-রসুন, আদা-কালোজিরা-মধু, আদা-লেবু-গরম মসলার চা ইত্যাদি।

৫০ প্রকারের চায়ের উদ্ভাবক নজরুল ইসলাম আবু জানান, তিনি আগে এই বাজারে রং ও দুধ চা বিক্রি করতেন। একদিন এক লোক এসে তাঁকে বলেন, তাঁর ঠাণ্ডা লেগেছে। ঠাণ্ডায় ভালো লাগবে এমন একটি চা যেনো তৈরি করে দেন। তখন তিনি বেশি করে আদা ছেঁচে মিশিয়ে একটি চা তৈরি করে দেন। পরদিন দোকানে এসে ওই লোক তাঁর চায়ের বেশ প্রশংসা করেন। তখন তিনি এই ভাবনা থেকে আদা চা, আদা-রসুনের চা, আদা-কালোজিরা-মধু চা ইত্যাদি তৈরি করতে থাকেন। আর ক্রেতাও তার বৃদ্ধি পেতে থাকে।

পরে তিনি নিজের ভাবনা থেকে তৈরি করতে থাকেন জিরা চা, কমলা চা, মালটা চা, কমলা চা, তেঁতুল চা, চকলেট চা, তরমুজ চা, লেমন চা, কাঁচা আমের চা, কামরাঙার চা, পায়েস চা, আঙ্গুর চা, মাসালা চা, আচার চা, বড়ই চা, জামের চা, কাঁঠাল চা, খেজুর চা, দিল্লিকা লাড্ডু চা, টক-ঝাল চা, টক-ঝাল-মিষ্টি চা, বাদামের চা, ঝাল কফি চা, জলপাই চা, বুলেট চা, দুধ-কলা চা, আদা-লেমন চা, সরিষা চা, আদা-কালোজিরা-মধু চা, গাঁজরের চা, বিস্কুট চা, নারকেলি চা, মধু চা, কাঁচা মরিচ চা, মনপুরা চা এবং নজরুলের স্পেশাল মিক্সসহ ৫০ প্রকারের চা। আবুর এই চায়ের একেক প্রকারের মূল্য একেক রকম। ৫, ১০, ১৫, ২০, ৩০ ও ৫০ টাকা প্রতিকাপ।

নজরুল আরও জানান, প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক কাপ চা তিনি বিক্রি করেন। আগে অনেক মুনাফা হলেও, বর্তমানে করোনার জন্য ফল ও মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন হাজার টাকার মতো তাঁর মুনাফা হয়। তবে শুক্রবার আর রোববার ক্রেতার ভিড় বেশি থাকে। ওই দুইদিন বিক্রি বেশি হয়। তাই মুনাফাও বেশি। সব বয়সী ক্রেতা তাঁর চায়ের ভক্ত হলেও, তরুণ বয়সী ক্রেতারাই তাঁর এই চায়ের বেশি ভক্ত।

নজরুল দাবি করেন, ঠাণ্ডা-কাশি সারাতে লোকজন তাঁর আদা-রসুন-লেবু-কালোজিরা-মধুর চা বেশি পান করেন। অনেকে ঠাণ্ডা-কাশির সিরাপ খেয়ে ব্যর্থ হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসেন।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ৫০ পদের অন্যরকম চায়ের দোকানে তরুণদের ভিড়।

নজরুল জানান, ভৈরব উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিমাদ্রী খীসা তাঁর দোকানে আসেন এবং চা পান করে বেশ প্রশংসা করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিমাদ্রী খীসা জানান, তিনি একদিন ঘুরতে ঘুরতে ভৈরবের পল্লী এলাকার রাজনগর বাজারে যান। সেখানে গিয়ে নজরুলের ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধের অন্যরকম এই চায়ের খবর জানতে পারেন। তখন তিনি ওই দোকানে গিয়ে তেঁতুলের চা পান করেন। তাঁর খুবই ভালো লাগে। এরপর থেকে তিনি সুযোগ পেলেই ওইখানে ছুটে যান। কখনও একা, কখনও পরিবার-পরিজন, বন্ধুদের নিয়ে পান করেন একাধিক স্বাদের চা।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও জানান, নজরুলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, দোকানের পরিবেশ তাঁকে আকৃষ্ট করেছে।

সর্বাধিক পঠিত