প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টিকার মজুদ আছে মাত্র ১৭ দিনের

নিউজ ডেস্ক: দেশজুড়ে করোনাভাইরাসের টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ শুরুর পর এ পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন ১১ লাখ ৫১ হাজার ৭৬৭ জন। গত ৮ এপ্রিল থেকে দেশে দ্বিতীয় ডোজের টিকা প্রয়োগ শুরু হয়। গতকাল শনিবার একদিনেই টিকা নিয়েছেন ২ লাখ ২১ হাজার ৫১৬ জন। আগের দিন গত বৃহস্পতিবার টিকা নিয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭৬ জন। গতকাল প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ১২ হাজার ১৫৭ জন। বৃহস্পতিবার নিয়েছেন ১০ হাজার ৫৭২ জন। এ পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৭ লাখ। টিকার প্রথম ডোজ নেয়াদের অনুযায়ী তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজ ব্যবস্থা করলে এখন পর্যন্ত টিকা প্রয়োজন ১ কোটি ১৪ লাখ। অথচ বাংলাদেশ বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে তিন কোটি ডোজ ক্রয়ের চুক্তি থেকে টিকা পেয়েছে ফেব্রুয়ারিতে ৫০ লাখ এবং মার্চে ২০ লাখ। দুই দফায় মাত্র ৭০ লাখ ডোজ। অথচ চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার কথা। এছাড়া ভারত সরকার ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ লাখ ডোজ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে গত ২৬ মার্চ ১২ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ। হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ মোট টিকা পেয়েছে চুক্তির ৭০ লাখ এবং উপহারের ৩২ লাখ, মোট ১ কোটি ২ লাখ ডোজ।
সরকারি হিসাব মতে, এখন পর্যন্ত যারা প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন তাদের জন্যই এখনো টিকা প্রয়োজন আরো ১২ লাখ। ইতোমধ্যে টিকা শেষ হয়েছে প্রথম ডোজের ৫৭ লাখ এবং দ্বিতীয় ডোজের ১১ লাখ ৫১ হাজার মোট ৬৮ লাখ ৫১ হাজার ডোজ। টিকা হাতে রয়েছে ৩৩ লাখ ৪৯ হাজার। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের পরবর্তী চালান দেশে আসার বিষয়ে সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট করে জানতে না পারায় চলমান টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান ধারা অনুযায়ী প্রতিদিন ২ লাখ দ্বিতীয় ডোজের প্রদান করলে আর মাত্র ১৭ দিনের (১১ মে) মধ্যে মজুদ টিকা শেষ হয়ে যাবে। আর প্রথম ডোজ চলমান থাকলে মজুদ টিকা আরো আগেই শেষ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সিরামের টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দেশে প্রতিদিন টিকার চাহিদা বাড়ায় নতুন উৎস থেকে টিকা খুঁজছিল বাংলাদেশ। আর এরই অংশ হিসেবে টিকা পাওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে চীনের ওষুধ-প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিনোফার্ম। সিনোফার্ম বাংলাদেশকে করোনাভাইরাসের ৬০ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঊর্ধ্বমুখী, এমন সময়ে সিনোফার্ম এই প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট ছয় ধাপে তিন কোটি ডোজ টিকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা রক্ষা করতে পারেনি দেশটি। ভারতের সিরাম টিকা দিতে না পারায় করোনা প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম চলমান রাখতে টিকার বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে সরকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও চীনের সিনোফার্মের ৬০ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। সমঝোতা চলছে। টিকার মূল্য, কখন দিতে পারবে এবং কতগুলো দিতে পারবে-এই বিষয়গুলো আমরা জানতে চেয়েছি। সিনোফার্ম এই তথ্যগুলো দিলেই আমরা চীনের টিকা কেনার দিকে অগ্রসর হতে পারব বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এছাড়াও সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে চীন এবং রাশিয়ার উৎপাদিত টিকা। এই দুটি দেশের পক্ষ থেকে টিকাদানের আগ্রহ দেখানো হলেও বাংলাদেশ সরকারে পক্ষ থেকে আশানরূপ সাড়া মিলছিল না। তবে এখন তা থেকে কিছুটা সরে এসছে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এক জায়গার ওপর নির্ভর করার কারণে টিকাদান কার্যক্রম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখনই যদি বিকল্প পন্থায় টিকার সংস্থান করা না হয় তাহলে করোনা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। তাই বিকল্প উৎস থেকে টিকা আনার চেষ্টা চালানো উচিত।
চীন এবং রাশিয়ার উৎপাদিত টিকার অনুমোদনের বিষয়ে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তো জটিল নয়। টিকার মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে যত বেশি ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে ততোই ভাল। ট্রায়ালে যদি অবস্থা ভালো হয়, তাহলে আমরা ওই টিকা নেব। ভালো না হলে নেব না। তবে সরকার কেন ট্রায়ালের অনুমোদন দিচ্ছে না, সেটি বোধগাম্য নয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেছেন, টিকা কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়লে সংক্রমণের বিস্তার প্রতিরোধে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর নাসরিন সুলতানা বলেছেন, সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ যখন চলছে, তখন টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হলে ঝুঁকি বাড়বে।
সূত্র মতে, সিরাম থেকে এ পর্যন্ত অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা যতটা পাওয়া গেছে, সেই টিকাই প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু এই টিকার প্রথম ডোজ যারা নিয়েছেন, তাদের কাউকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া সম্ভব না হলে তার শরীরে টিকা কার্যকর হবে না। এটাকে বড় সমস্যা হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, পুরো ডোজ না দিতে টিকা সঠিকভাবে কাজ করবে না। এখনও যারা প্রথম ডোজ নিচ্ছেন, তাদের আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। একটা সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ে টিকা ম্যানেজ করা সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেয়া নিশ্চিতে প্রথম ডোজ দেয়া যে কোনো সময় বন্ধ করা হতে পারে। তিনি বলেছেন, নতুন টিকা এলে তখন আবার প্রথম ডোজ দেয়া যেতে পারে। এমনটা তারা ভাবছেন।
এদিকে টিকা পাওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে চীনের ওষুধ-প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিনোফার্ম। ২০২০ সালের শুরুতে চীনের বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস বিবিআইবিপি- কোরভি নামে করোনাভাইরাসের ইনঅ্যাকটিভেটেড টিকা তৈরি করে। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ এই টিকাটি ব্যবহার করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিøউএইচও) এখনো টিকাটির অনুমোদন দেয়নি। তবে, ডবিøউএইচওর উপদেষ্টা প্যানেল বলেছে, সিনোফার্ম তাদের টিকার কার্যকারিতার মাত্রার ওপর তথ্য উপস্থাপন করেছে।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর সিনোফার্ম জানায়, তাদের টিকার কার্যকারিতা ৭৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এরপরই চীন সরকার টিকাটি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে সিনোফার্ম টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয় আরব আমিরাত। তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, টিকাটির কার্যকারিতা ৮৬ শতাংশ।
এ ছাড়াও, বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার স্পুতনিক-ভি টিকার জন্য যোগাযোগ করছে। নিজ দেশের ভেতরে ব্যবহারের জন্য ২০২০ সালের আগস্টে স্পুতনিক-ভি টিকার অনুমোদন দেয় রাশিয়া। রাশিয়ার টিকার আপডেট জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছেন। আলোচনা চলমান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনা করতে চায় চীনের ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল বায়োলজি চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্স (আইএমবিসিএএমএস)। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোনীত একটি বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে তারা সার্সকোভ-২ নামের একটি টিকা উদ্ভাবন করেছে। যা আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসারে প্রাণীদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মানবদেহে পরীক্ষামূলক ফেজ-১ ও ফেজ-২ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
আইএমবিএএমএএমএস’র মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক মি. ইন টিকার বিষয়ে জানান, তারা বাংলাদেশকে টিকা দিতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে তাদের টিকার ব্রাজিল, মেক্সিকো, মালয়শিয়া ট্রায়াল পরিচালিত হচ্ছে। এসব ট্রায়ালে ফলাফল বেশ ভাল পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া এই টিকা চীনে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্টির ওপর প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে তারা। টিকার দাম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি অবশ্যই প্রতিযোগীতামূলক দামেই প্রদান করা হবে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য সিরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা রফতানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, সিরাম আমাদেরকে জানিয়েছে যে, তারা (টিকা) রফতানি করতে প্রস্তুত। কিন্তু, এজন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে ছাড়পত্র প্রয়োজন। সিরাম এখনো সে ছাড়পত্রটি পায়নি। সিরাম কখন এ তথ্য জানিয়েছে, জানতে চাইলে বেক্সিমকো এমডি বলেন, যখনই আমরা যোগাযোগ করি, তখনই তারা এটা বলে। এ সপ্তাহেও সেরাম একই কথা জানিয়েছে। ছাড়পত্রটি পেলেই আমরা জানতে পারব, সিরাম ভ্যাকসিনের কতগুলো ডোজ আমাদেরকে পাঠাতে পারবে এবং কখন পাঠাতে পারবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, চলমান টিকাদান কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে একই ধরনের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে রাশিয়া এবং চীন থেকে টিকা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। মহাপরিচালক বলেন, টিকার ঘাটতি থাকছেই। হিসাবে তাই বলে। আমরা বার বার বলছি, তাগাদা দিয়েছি। এর মধ্যে আমরা আমাদের অধিদফতর এবং মন্ত্রণালয় দুই দুই বার তাকে (সিরামকে) চিঠিও দিয়েছি। তারাও প্রত্যেকবার বলছে যে এটা অসুবিধ হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাশিয়া এবং চীন থেকে টিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে কি না- এ বিষয়ে প্রফেসর খুরশীদ আলম বলেন, এটা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তবে রাশিয়া এবং চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে যে তারা দিতে চায়। ইতিমধ্যে আমাদের দুই তিনটা বৈঠকও হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক বলেছেন, মুশকিল হচ্ছে, কেউ না করছে না। টিকা দেবে না, একথা কেউ বলছে না। কিন্তু কবে পাওয়া যাবে, সেই নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম ধাপে বাংলাদেশকে যে এক কোটি ডোজ টিকা দিতে চেয়েছিল, তাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে উল্লেখ করেন মহাপরিচালক। -ইনকিলাব

সর্বাধিক পঠিত