প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা:  স্বাধীনতা দিবসে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের বিষয়ে সতর্কতা!

মাসুদ রানা: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ভারত ছিলো আশ্রয়দাতা ও সাহায্যকারী বন্ধুরাষ্ট্র। এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্য ঘটনা। এর অস্বীকৃতি হবে সত্যের অস্বীকৃতি। বাঙালীর স্বাধীনতা-যুদ্ধে ভারতের সাহায্যের পেছনে থাকতে পারে শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানের ভাঙ্গন ও দুর্বলীকরণের সাথে-সাথে বিশাল জনসংখ্যার একটি বিশাল বাজার-সমেত একটি দেশকে নিজের প্রভাব বলয়ের রাখার এবং এমনকি ভবিষ্যতে অঙ্গীভূত করার ভাবনা। কিন্তু ভারতের কী ভাবনা ছিলো, তা ভেবে তার ইতিবাচক কর্মকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আবার, অতীতের সুকর্মের লাইসেন্স দেখিয়ে বর্তমানের কুকর্মকেও মেনে নিতে পারি না। গতকাল বাংলাদেশ যখন তার ৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করলো, তখন সে-অনুষ্ঠান ভারতকে নিমন্ত্রণ করাই ছিলো ন্যায়সঙ্গত। না করলে, এটি হতো সাংঘাতিক ধরণের অকৃতজ্ঞতা ও অসভ্যতা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না হয়ে যদি খালেদা জিয়াও হতেন, তাঁকেও স্টেইটসওম্যান হিসেবে এটি করতে হতো।

এর মানে এমনটি নাও  হতে পারে যে, খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর রাজনীতিকে পছন্দ করেন। আমি ২০১৬ সাল থেকে দেখাচ্ছি যে, শেখ হাসিনার সাথে ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর সম্পর্ক আর আগের মতো মধুর নয়। এখানে চীন হচ্ছে একটি ‘ফ্যাক্টর’। শেখ হাসিনা চীনের দিকে ঝুঁকছেন ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে। ভারত এটি পছন্দ করছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশকে তাঁর ৫০তম স্বাধীনতা দিবসে নিমন্ত্রণ করতেই হচ্ছে ভারতকে এবং ভারতকেও সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতি সাধারণভাবে ভারতের এবং বিশেষভাবে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের কারণে বাঙালী সাধারণ তাঁর ওপর বিক্ষুব্ধ। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আছে রাজপথে শান্তিপূর্ণভাবে মোদীর প্রতি তাঁদের ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করার।

আমি জানি, বাংলাদেশের বামপন্থীদের মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন ও ইসলামবাদীদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্যে কারণ ও উদ্দেশ্যগত পার্থক্য আছে। বামপন্থীদের কাছে (কয়েকটি নগণ্য মার্ক্সবাদী গ্রুপ ছাড়া) নরেন্দ্র মোদী যেখানে ফ্যাশিস্ট, ইসলামবাদীদের কাছে তিনি নিতান্তই ‘মুসলমানের শত্রু’। এছাড়াও, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ভারত তথা হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করার একটি প্রেষণা ঐ ইসলামবাদীদের মধ্যে থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের অধিকার আছে নরেন্দ্র মোদীর আগমনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রাকশ করার, যদিও তাণ্ডব করার অধিকার কারও নেই। আমি দার্শনিক ও ঐতিহাসিক কারণে হিন্দুত্ববাদী, ইসলামবাদী, জায়নবাদী-সহ সকল প্রকারের বর্ণবাদী, ধর্মবাদী ও আদর্শবাদী রাজনীতির বিরোধিতা করি। আর, এরই অংশ হিসেবে হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটির ১৩-দফা-সহ এর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করছি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এদের উপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণের বিরোধিতা করেছি এবং আজও করছি ঐ একই দার্শনিক কারণে। স্বাধীনতা দিবসে বিদেশী অতিথির আগমণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের কারণে বিক্ষোভেকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও পাঁচজনকে হত্যার ঘটনাটি স্বাধীনতার ধারণার বিরোধী। আমি এর তীব্র নিন্দা করছি এবং এ-ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার দাবী করছি।

তবে, ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করার মতো নরেন্দ্র মোদীর বিরোধিতা করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধীরা যে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ অস্তিত্বকে ধ্বংস করে পাকিস্তান ও ভারতের মতো ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সকল ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিপ্লবে গঠিত রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের অধিকার কারও নেই। বাংলাদেশ রিপাবলিকের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য নস্যাৎকারীদের বিরুদ্ধে শুধু রাষ্ট্রেই নয়, জনগণেরও অধিকার আছে রোখার, তা যে-কোনো মূল্যেই হোক! লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড। আমিরুল

সর্বাধিক পঠিত