প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১০টার পর

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১০টার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক, কামান, বন্দুক ও ভারী ভারী অস্ত্রসহ সেনাবাহিনীর বহর ফার্মগেট অভিমুখে অভিযান শুরু করে। তখনো তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ঢাকা শহরে নিরস্ত্র মানুষ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে শ্রোগান দিয়ে যাচ্ছিলো। পথে পথে গাছ কেটে বেরিকেড দেওয়া হচ্ছিলো। কারণ তখন চারদিকে খরব ছড়িয়ে পরেছিলো ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। ভুট্টো সম্পর্কেও একই খবর ছড়িয়েছিলো। বর্তমান শেরাটন, তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছিলো। এরপর তিনি ঢাকা ছাড়েন।

তবে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে যে সাজোয়া বাহিনী ঢাকার উদ্দেশে অভিযানে নেমে পরেছিলো, সেটিকে অপারেশন সার্চলাইট নাম দেওয়া হয়েছিলো। এটি পহেলা মার্চের পর পরই পরিকল্পনা মতো গড়ে তোলার গোপন উদ্যোগ সেনানিবাসে চলছিলো। রাও ফরমান আলী এবং মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন এই পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। পূর্ব বাংলায় তখন যে উত্তাল বিদ্রোহ বিক্ষোভ বেগবান হচ্ছিলো, এটিকে নির্মূল করার জন্য অন্য সেনাবাহিনীর আক্রমণের প্রস্ততি নিতেই অপারেশন সার্চ লাইটের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছিলো।

পরে টিক্কা খান যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আসেন তখন তিনিও অপারেশন সার্চলাইটে অভিযান কখন কীভাবে শুরু করা হবে সেটি রাও ফরমান আলী এবং খাদেম খানের সঙ্গে গোপনে তৈরি করেন। ১৭ মার্চ তারিখে এ তিন পাকিস্তানি জেনারেল অপারেশন সার্চ লাইটের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সমাপ্ত করেন এবং ইয়াহিয়া খানকে অবহিত করেন। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার সেসব বৈঠক করছিলেন, তা ছিলো লোক দেখানো। ভেতরের অবস্থা ছিলো অপারেশন সার্চলাইটের প্রস্ততি সমাপ্ত করা। কোনো অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তর কিংবা ২৫ মার্চ তারিখে জাতীয় সংসদ বসতে না দেওয়া। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন আর তখনই টিককা খান রাওয়া ফরমান আলী এবং জেনারেল খাদেম খান অপারেশন সার্চলাটের অভিযান শুরু।

এই বাহিনী ট্যাংক, কামান, বন্দুক, গোলা বারুদ ও ভারী অস্ত্র নিয়ে ক্যান্টমেন্ট থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বের হতে থাকে। সম্মুখে  রাস্তার ওপর যেসব গাছের গুড়ি ছিলো তা ট্যাংক দিয়ে গুড়িয়ে ফেলে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। ফার্মগেটেই তখন অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষ অবস্থান করছিলো, তাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি  ছোড়া হচ্ছিলো। অসংখ্য মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছিলো, তাদের ওপর দিয়ে ট্যাংক সাজোয়া বাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে সম্মুখে এগিয়ে যেতে থাকলো। তারা কিছুদূর এগিয়ে ডানে-বামে ভাগ ভাগ হয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগোতে থাকলো, ঢাকার আকাশে তখন আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছিলো আর গুলির কানফাটা আওয়াজ ভেসে আসছিলো। সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে জগন্নাথ হল-সহ বিভিন্ন ছাত্রাবাস শিক্ষকদের আবাসিক ভবনসমূহে পাকিস্তানি জান্তারা তালিকা অনুযায়ী খুঁজে খুঁজে শিক্ষকদের হত্যা করছিলো, আবার সে ছাত্রাবাসে যেখানে যাকে পাচ্ছিলো তাকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করছিলো। জগন্নাথ হলের মাঠে তখন লাসের স্ত‚প জমা হচ্ছিলো। রক্তে ভেজা মৃত-অর্ধমৃত আহত মানুষের কান্না ও চিৎকারে আকাশ-বাতাশ ভারী হয়ে ওঠছিলো। রেসর্কোস ময়দানে অবস্থিত কালি মন্দিরেও একইভাবে হামলা হয়েছিলো।

আরেক অংশ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হামলা করলো। সেখানে অবস্থিত বাঙালি পুলিশরাও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো। পিলখানায় ইপিআরের হেড কোয়াটারেও একই অবস্থা, সেখানেও প্রতিরোধ সংঘঠিত হয়। পুরান ঢাকার দিকেও অপারেশন সার্চলাইটের অভিযান, আবার সে এলাকায় নিরীহ মানুষের ওপর শুরু হয়। মিরপুর ও মোহাম্মাদপুরেও অপারেশন সার্চলাইটের অভিযান ছড়িয়ে পরে। বলা চলে ২৫ মার্চ রাতে পুরো ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর, ইপিআর, সদরদপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ দপ্তরসহ সর্বত্র নিরবিচারে মানুষ হত্যা করে পূর্ববাংলা জনগণের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে দমন করতে চেয়েছিলো। ওই রাতে কম মানুষ এভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলো তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। তবে কোনো কোনো সূত্র ওই রাতের মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক ৫০ হাজারের মতো বলে দাবি করেছেন। পরের তথা ২৬ মার্চ ঢাকা শহরে কারফিউ ছিলো কেউ ঘর থেকে বের হতে পারেনি, আহতদের হাসপালে নেওয়ার সুযোগও কম ছিলো। অধিক রক্তক্ষরণে অনেকেই ধুকে ধুকে মারা গেছেন। ২৭ তারিখ কারফিউ কিছু সময়ের জন্য তোলে দেওয়া হলে লোকজন ঢাকা থেকে চার দিকে পরিবার পরিজনদের নিয়ে পালিয়ে যাওয়া চেষ্টা করেন। বুড়িগঙ্গ পার হতে গিয়ে অনেক মানুষ পাকিস্তানিদের হামলার শিকার হন এবং নদীতেই সলীন সমাধি ঘটে। তারপরও হাজার হাজার মানুষ ঢাকার চারদিকে পায়ে হেটে নিরাপদ গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

২৫ মার্চ তারিখের ঢাকায় শুরু হওয়া গণহত্যা চট্টগ্রাম,সৈয়দপুর, রংপুর, কুমিল্লা, যশোর শহর, সেনানিবাস সংলগ্ন  জনপদগুলো প্রায় একই সময় শুরু হয়। তাতে এসব অঞ্চলেও ভয়াবহ গণহত্যায় অনেক মানুষের প্রাণ কেরে নেওয়া হয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ধারণা করেছিলো এমন আকস্মিক গণহত্যায় বাঙালিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ত্যাগ করবে। কিন্তু প্রাথমিক কিছু প্রতিরোধ বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ঘটলেও জনমনে পাকিস্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা, প্রস্তুতি এবং নির্দেশনা আসতে থাকে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে তার বাস ভবন থেকে গ্রেফতার করে নেওয়া খবর যতোটা অজানা ছিলো, তার দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার কথা ২৬ মার্চ তারিখে বিদেশি গণমাধ্যম এবং চট্টগ্রাম বেতার ও বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হওয়ার পর মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতার  ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে। জনপ্রতিধিরা দেশের অভ্যন্তরে সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্যোগ নেন। একইসঙ্গে ১০ এপ্রিল সরকার গঠনের ঘোষণার পর মানুষ দলে দলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করার জন্য ভারতে আশ্রয়গ্রহণ করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরে রাজাকার বাহিনী, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আলবদর ও আলসামস বাহিনী, নেজামে ইসলামির নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনী এবং মুসলিম লীগের উদ্যোগে শান্তি কমিটি গঠনের মাধ্যমে সর্বত্র তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। একইসঙ্গে গ্রামগঞ্জে এসব বাহিনীর সহায়তায় অতর্কিত হামলা আক্রমণ, গণহত্যা , অগ্নিসংযোগ ও নারী ধর্ষণ এবং নিরীহ মানুষকে ধরে ধরে হত্যা করতে থাকে। এটি ডিসেম্বর মাসে আরও পরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধি করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর ব্যাপকভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পন করার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় লাভ করে। স্বাধীনতার লাভের জন্য ৩০ লাখ মানুষকে আত্মাহতি দিতে হয়। যাদের সিংহভাগ পাকিস্তানিদের গণহত্যার শিকার হয়েছিলো। ২৫ মার্চ তারিখ আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানিদের গণহত্যার এক বর্বর দিন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। নতুন প্রজন্মের কাছে এ গণহত্যার বিস্তারিত চিত্র তোলে ধরতে হবে, তাহলেই দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাগ্রত হবে। লেখক : শিক্ষাবিদ। অনুলিখন : মাসুদ হাসান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত