প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গরু পালনে স্বয়ম্ভরতায় মুক্তির স্বাদ

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম অংশীদার ভারত। একই সভ্যতা ও ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে দুটি দেশ ও অঞ্চলের মানুষের রয়েছে একসঙ্গে বসবাসের দীর্ঘ ইতিহাস। রয়েছে সংস্কৃতির গভীর আদান-প্রদান। আছে অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতাও। তবে কিছু বিষয় দুই দেশের সাংস্কৃতিক তিক্ততা ও বৈরিতা তৈরি করেছিল। তার মধ্যে অন্যতম হলো গরু।

এক দেশের সংস্কৃতিতে গরু পবিত্রতার প্রতীক। অন্য দেশে আমিষের অন্যতম প্রধান উপকরণ। ফলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যের সূত্র ধরে নানা উপায়ে বাংলাদেশে ভারত থেকে গরু সরবরাহ হয়। এর বড় একটি অংশই হতো সীমান্তবর্তী এলাকার অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরে এ বাণিজ্যপ্রথা চালু থাকলেও ২০১৪ সালে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গরু রফতানি নিষিদ্ধ করে। গরুনির্ভর বিশাল এক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল উভয় দেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ আকস্মিক এ বিধিনিষেধে চরম বিপর্যয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও আমিষের চাহিদা পূরণকারী গরুর বাজার হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার নতুন বাস্তবতায় গরু উৎপাদন ও পালনে স্বয়ম্ভরতার পথে হাঁটার পথ অনুসরণ করে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ গরু উৎপাদন ও পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে গরুর যে চাহিদা, তার চেয়ে জোগানের পরিমাণ বেশি।

ভারতে গরু রফতানি নিষিদ্ধ হওয়ার পর মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় দেশে গরুর জোগান বাড়াতে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়। স্থানীয় পর্যায়ে গরুর জাত উন্নয়ন, মোটাতাজাকরণ ও কৃত্রিম প্রজনন, মানসম্পন্ন ব্রিড তৈরির কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে জোর দেয়া হয়। বাড়ানো হয় খামারিদের আর্থিক ও নীতি সহায়তা। খামারিদের প্রশিক্ষণ, বিপণন কৌশল ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর কার্যক্রম জোরদার করা হয়। এর ফলে সংকটকে দুই বছরের মধ্যেই সম্ভাবনায় পরিণত করে বাংলাদেশ। সমৃদ্ধি আসে দেশের পশুপালন খাতে যুক্ত কৃষকদের জীবন-জীবিকাতেও। গরু উৎপাদনে স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক গরু বাণিজ্য নিয়ে এখন আর আগের মতো অস্বস্তি নেই। স্থানীয় মাংসের বাজার নিয়েও বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আস্বাদ এনে দিয়েছে গরু পালনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন।

অন্যদিকে পশুটি পালনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সামনের সারিতে। গরু পালনের দিক থেকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান এখন দ্বাদশ। সামনের দিনগুলোতেও এ অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ শিগগিরই গো-পালনে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় প্রবেশে সমর্থ হবে।

দেশে এখন মাংসের স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে খামারগুলোয় পালিত গবাদি পশু দিয়েই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, গত বছর বিশ্বে গরু পালন হয়েছে প্রায় ১৪৬ কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে বাংলাদেশে পালন করা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ। অথচ দুই দশক আগেও দেশে পালিত গরুর সংখ্যা ছিল দুই কোটির নিচে। এতে বড় উল্লম্ফন হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর। ভারত থেকে গবাদি পশু আসা বন্ধ হওয়ার কয়েক বছরের মাথায় দেখা যাচ্ছে, দেশে শুধু গবাদি পশুর খামারই বাড়ছে প্রতি বছর গড়ে ১৫-২০ শতাংশ হারে। দেশে মোট নিবন্ধিত খামার প্রায় এক লাখ। অনিবন্ধিত খামার আরো বেশি। কোরবানির সময়ও দেখা যায়, চাহিদার সমান পশুর সরবরাহ দেশের খামারগুলো থেকেই আসছে। অন্যদিকে গত বছরও কোরবানির সময় চাহিদা পূরণের পরও উদ্বৃত্ত ছিল নয় লাখের বেশি পশু।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃত্রিম প্রজনন ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তি দুটি মূলত গরু উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশের নীতি-সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এক সময় প্রায় ২৫ লাখ গরু আমদানি হতো। সেটি এখন অর্ধলাখে নেমে এসেছে। এটিই বাংলাদেশের অর্জন ও সামর্থ্যের বড় বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ছাড়াও খামারিদের আগ্রহও ভূমিকা রেখেছে। বেসরকারি উদ্যোগ এ সফলতায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

গরু পালনে এ অর্জনের পেছনে বেসরকারি খাত অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। অন্যদিকে খামারিরাও বলছেন, ভালো মুনাফার কারণে তারা এতে এখন বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে এ খাতটিকে আরো লাভজনক করতে বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ গরু পালনকারী খামার সাদিক অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী মো. শাহ এমরান বলেন, দেশের এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে শিক্ষিত তরুণ ও খামারিরা। বেকার তরুণদের বড় অংশ এখন বাণিজ্যিক খামারে মনোনিবেশ করছে। ভালো লাভ পাওয়ায় সাধারণ খামারিরা লালন-পালন বাড়িয়ে দিয়েছেন। দেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের আরো প্রতিযোগী সক্ষম করতে হবে। বিদেশ থেকে মাংস আমদানি বন্ধের পাশাপাশি দেশী জাত উন্নয়নের জন্য গবেষণাতেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার শতভাগ দেশে উৎপাদিত পশুর মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি রফতানি বাজারে মাংসের চাহিদা মেটানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। এজন্য খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করতে ঋণ ব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে। উৎপাদনশীল গরু জবাই বন্ধে আইন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কম সময়ে বা কম খাবারে গরু উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বেসরকারি পর্যায়েও সিমেন আমদানি, উন্নত ব্রিডের মাধ্যমে গরু উৎপাদন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এছাড়াও সবখানেই গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রমের বিজ্ঞানসম্মততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে দেশী খামারিদের নীতি সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাংস আমদানিও বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এজন্য মাংস আমদানিতে শুল্কারোপের পাশাপাশি অশুল্ক বাধার প্রয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া মাংস প্রক্রিয়াজাতসহ গরু পালন প্রক্রিয়ার নানা মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে আরো এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে হবে।

এ বিষয়ে এসিআই অ্যানিমেল হেলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফা হ আনসারী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে গত ৫০ বছরের অর্জন বেশ ভালো। আর গত এক দশকে এ খাত বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। দেশকে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নেও খাতটির অবদান অনস্বীকার্য। পশুপালনকে লাভজনক হিসেবে দাঁড় করাতে বেসরকারি খাতের অবারিত সুযোগ বিকশিত করতে হবে। প্রক্রিয়াজাতসহ নানা প্রক্রিয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণের পদক্ষেপ নেয়াও অপরিহার্য। তাহলেই এ অর্জন টেকসই হবে।

গরু পালনে দেশের এ অর্জন অনেকটা রাতারাতি হলেও এ নিয়ে প্রয়াস চালু ছিল অনেক দিন ধরেই। দেশী গরু দুর্বল, কৃষকায় ও জীর্ণশীর্ণ হয় বলে দুর্নাম ছিল দীর্ঘদিন। সে অবস্থার পরিবর্তনে ১৯৩৭-৩৮ সালে পাঞ্জাবের হরিয়ানা থেকে নিয়ে আসা হয় এক হাজার উন্নত ষাঁড়। গো-খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে আনা হয় নেপিয়ার ঘাস। অন্যদিকে কৃত্রিম প্রজনন শুরু হয় ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে।

স্বাধীনতার পর দেশে পালিত গরুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম প্রজননে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হয়। গরু মোটাতাজা বা হূষ্টপুষ্টকরণ কার্যক্রম চালু রয়েছে দুই দশক ধরে। দেড় যুগ আগে মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আনা হয় ব্রাহামা জাত। গরু দ্রুততম সময়ের মধ্যে বেড়ে ওঠার জন্য কয়েক বছর আগে প্রচলন করা হয় ব্রাজিলিয়ান বুলের। ফলে দেশী গরু পরিপক্ব হওয়ার সময়ও দুই বছরের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) সাবেক মহাপরিচালক কাজী আবদুল ফাত্তাহ্ বলেন, ভারতের দুগ্ধ শিল্পের বিকাশে ড. ভি কুরিয়েন এককভাবে অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশে এমন একজন মানুষ তৈরি না হওয়ায় মাংস ও দুধে স্বয়ম্ভরতা আসতে দেরি হয়েছে। কেননা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত বেশ কয়েকটি ভালো প্রযুক্তি থাকলেও গরু উৎপাদনে তা সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করা হয়নি। আবার এ খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাতের উদ্যোগ ছিল সীমিত। কিন্তু ২০১৪ পরবর্তী সময়েই সবগুলো প্রযুক্তির ব্যবহার ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে গরু উৎপাদনে এখন স্বয়ম্ভরতা এসেছে। - বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত