প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় নিরাপত্তায় টিকা

ডঃ শোয়েব সাঈদ, ভ্যাকসিনকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতর আর বাইরে থেকে মিডিয়ায় রাজনীতিবিদদের ষাঁড়ের লড়াইয়ে জড়িয়ে দিয়ে ভিউয়ার বাজিমাত করার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জনগণের জন্যে কল্যাণকর কিছু ছিল না। দুর্ভাগা দেশে মিডিয়ায় ভ্যাকসিন সেফটি নিয়ে কথা বলছেন রাজনীতিবিদরা অদ্ভুত সব তথ্য উপাত্তে, বিজ্ঞান নয় কেবল নিজের মতাদর্শের ১০০% আনুগত্যে, আমাদের কালচারে এরাই চূড়ান্ত বিনোদন আর এই বিনোদনটাই দরকার অনুষ্ঠানের এঙ্করদের কাঙ্ক্ষিত টিআরপি বাড়াতে, তাতে জনগণ আর দেশটির কল্যাণ নিহিত থাকুক আর না থাকুক।

জনমত মিথ্যাটাকে সত্য বলে জানলেই মিথ্যাটি সত্য হয়ে যায় না, যুগে যুগে এরকম উদাহরণ অনেক আছে। এই ক্ষেত্রে দরকার সততার সাথে আচরণ করা। কোভিড আর ভ্যাকসিন নিয়ে চর্চাকারী বিশেষজ্ঞদের নির্ভীক আলোচনায় জনগণের আস্থা ফেরানো, সত্যটা জানানো ভীষণ জরুরী।

নতুন প্রযুক্তি যখন মাঠে যায়, প্রযুক্তি হস্তান্তরের সময় কিছু বাধা বিপত্তি পেরোতে হয় এবং এই বাস্তবতাটুকু বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক কারণে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি বিষয়ে সমস্যাটি অনেক জটিল। এর সমাধানে সরকারের আর মিডিয়ার ভূমিকাটা মুখ্য।

ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী কমবেশি পরিলক্ষিত। কানাডাও এই সমস্যায় আক্রান্ত। পার্থক্যটা হচ্ছে কানাডায় দ্বিধাটি কেউ উসকে দিচ্ছে না আর সরকার চেষ্টা করেছে দ্বিধা দূর করতে। মিডিয়ার আচরণ দেখার মত দায়িত্বশীল।

কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ইমিউনাইজেশন পার্টনারশীপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভ্যাকসিন নিয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্যে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের বাজেট দিয়েছেন। শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধা, ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে ভ্যাকসিন বান্ধব করার জন্যে এই আয়োজন। কানাডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্যাটি হাজদু প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যেমে এই বাজেটের কথা জানান।

কোভিড সংকট নিরসনে ভ্যাকসিনের ভূমিকা অপরিসীম। কানাডার প্রধানমন্ত্রী ত্রুদ্যু বারবারই বলছেন ভ্যাকসিন কার্যকর আর নিরাপদ, নিয়ম মাফিক যখন ভ্যাকসিনের ডাক আসবে প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ নিয়ে নেবেন। কানাডায় অবশ্য টিকা নেবার জন্যে ভিআইপি কিউ তৈরি করা লজ্জা শরমের বিষয়।

ভারতের পুনেতে অবস্থিত সেরাম ইন্সটিটিউট বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় ভ্যাকসিন উৎপাদক, অর্ধশত বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে বিশ্বে বেশ পরিচিত। বছরে প্রায় দেড়শ কোটি বিভিন্ন ধরণের ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতায় বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ব্যবসায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে যথেষ্ট। সক্ষমতাজনিত এই ফ্যাসভ্যালুর কারণে কোভিড সংকটের শুরুতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় যখন ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে গাঁটছড়া বাঁধল ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্মা কর্পোরেট এসট্রাজেনেকার সাথে তখন উৎপাদন আর বিপণনে বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে সাথে নেয় ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটকে।

যে কোন একটি নির্দিষ্ট অসুখ বিসুখে বিশ্বের হয়তো ৫-১০% জনসংখ্যা আক্রান্ত হয় ফলে ঔষধ বা ভ্যাকসিন উৎপাদনের চাহিদা ঐ অনুপাতে। কিন্তু কোভিড প্যান্ডেমিকে অবস্থা ভিন্ন, এই মুহূর্তে ঔষধ বা ভ্যাকসিনের চাহিদা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। কোন ফার্মা কর্পোরেটের পক্ষেই এই চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়, দরকার বিশ্বস্ত আর যোগ্য পার্টনার।

প্রাইভেট, পাবলিক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাযুক্তিক সহযোগিতার সাথে যারা পরিচিত তাঁরা জানেন “টুল ম্যানুফেকচারিং” এর অর্থ কি। “টুল ম্যানুফেকচারিং” সিস্টেমে লজিস্টিক সক্ষমতায় একই ধরণের প্রযুক্তিতে পণ্য উৎপাদন অভ্যস্ত কোন উৎপাদক অন্যের প্রযুক্তি দিয়ে উদ্ভাবিত পণ্যটি শুধু নিজের কারখানায় উৎপাদন করে দেয় নিজেদের মধ্যে কঠোর গোপনীয়তার আর দায়দায়িত্ব পালনের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে। কর্পোরেট বিশ্বে এটি নিয়মিত সহযোগিতা।

অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন AZD1222 সেরাম ইন্সিটিটিউট তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা, কারিগরী আর কোয়ালিটি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় উৎপাদন করে দিয়েছে মাত্র। মূল প্রযুক্তিটি অক্সফোর্ডের। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সার্বিক দায়িত্বে ছিল অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকা।

ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দৌড়ে প্রথমেই এগিয়ে এসেছিল এই অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকা এবং বিপুল বিনোয়েগের কর্পোরেট ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ জুটে ঐ দুই দেশকে প্রথম ভ্যাকসিন সরবরাহের চুক্তি করে।

গত জুন মাসে অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকার সাথে কোয়ালিশন ফোর এপিডেমিক প্রিপারডনেস ইনোভেশন (সেপি), গ্লোবাল ভ্যাকসিন এলায়েন্স গাভি আর সেরাম ইন্সিটিটিউটের সাথে বৈশ্বিক চুক্তি হয় নিম্ন আর মধ্য আয়ের দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্যে। আর এভাবেই ভ্যাকসিন উৎপাদনে সেরামের অংশগ্রহণ। সেরামের সাথে বাংলাদেশের টিকা নিয়ে চুক্তির আগ পর্যন্ত পর্বটি কিন্তু বিজ্ঞান সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, তাতে বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কের কোন সংযোগ ছিলনা, পছন্দ অপছন্দের রাজনীতি ছিলনা।

কোভিশিল্ড উৎপাদনে সেরামের ভূমিকা বৈশ্বিক আর ভারতের বিপুল চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে। ভ্যাকসিন নিয়ে এই কারিগরি উদ্ভাবন, উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকার কঠোর নজরধারী আর সার্বিক সহযোগিতায় ভ্যাকসিনের মান আর সেফটি নিয়ে বাংলাদেশ ভিত্তিক রাজনীতির কোন উপাদান খুঁজতে যাওয়া বাস্তবতাবর্জিত এক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। এই সমস্যাটি উসকে দিয়ে ভ্যাকসিন বিমুখ করার ফলে বাংলাদেশের কোভিড ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে যাবে।

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের ফলে ফাইজার আর মডার্নার ভ্যাকসিনে বিপুল লগ্নি করেও সরবরাহ পেতে কানাডার মত দেশকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান বোধগম্য না হবার তো কারণ নেই। ভ্যাকসিনের সংরক্ষণ আর সাপ্লাই চেইনের সুবিধে পেতে এসট্রাজেনেকা বা সেরামের কোভিশিল্ড সবচেয়ে সুবিধেজনক অবস্থানে। কোভিশিল্ডে আপত্তি যে সমস্ত বিজ্ঞজনের তাঁরা কিন্তু বিকল্পটি কি এবং কেন এই বিষয়ে মুখ খুলছেন না, ইউটোপিক অবস্থানে বিদ্বেষটা উসকে দিচ্ছেন।

অক্সফোর্ড-এসট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা, সেফটি প্রায় ২৪ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে ইউকে, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত এবং বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিশ্বাস যোগ্যতার “কাঠগড়া” পিয়ারড রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত। গত ৮ ই ডিসেম্বর বিখ্যাত ল্যান্সেট জার্নালে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে সেফটি বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ৭৫ হাজার “পারসন মাসের” সেফটি ডাটায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ১৬৮ জনের, যার মধ্যে ৮৪ জন ছিল ভ্যাকসিন গ্রুপে আর ৯১ জন ছিল ভ্যাকসিন না নেওয়া কন্ট্রোল বা প্লাসেবো গ্রুপে। ভ্যাকসিন নিয়ে ৮৪ জনের সমস্যা হলে আর ভ্যাকসিন না নিয়ে ৯১ জনের সমস্যা হলে পরিসংখ্যানগতভাবে ভ্যাকসিনের সেফটি উৎরে যায়। তাছাড়া ভ্যাকসিনে কিছুটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা তো নতুন নয়। ব্রিটিশ আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কঠোর যাচাই বাছাই মানদণ্ডে ভ্যাকসিনটি অনুমোদিত।

ইইউ তার ৪৫ কোটি জনগণের জন্যে মোট ২০০ কোটি ডোজের ব্যবস্থা করেছে যার ৪০ কোটি ডোজ আসবে ইউরোপের এসট্রাজেনেকার বিভিন্ন প্লান্ট থেকে। ইউকে নিচ্ছে তাঁদের দেশের প্লান্ট থেকে।

সেরামের কারখানায় অক্সফোর্ডের একই প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের জড়তা রাজনীতি আর ভূগোলনীতির সংশয়পূর্ণ চাহনি ছাড়া ভ্যাকসিন প্রযুক্তির বাস্তবতায় কোন ভিত্তি নেই।

রাজনীতি, অবিশ্বাস আর আবেগকে একপাশে রেখে জনস্বাস্থ্যে আমাদের উচিত ভ্যাকসিন বিজ্ঞানের আলোকে উৎসাহ যোগানো, সেফটি বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করা।

ভ্যাকসিন গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে আখেরে পার পাওয়া যাবে না। বৈশ্বিক বলয়ে তাল মেলাতে হলে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন গ্রহণের বাস্তবতায় মিশে যেতেই হবে। কোভিড সংকট উত্তরণে ভ্যাকসিন দরকার, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্যের দায়, অর্থনীতির দায়, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার দায়।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োটেক বিষয়ে বহুজাতিক কর্পোরেটে ডিরেক্টর পদে কর্মরত।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত