প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গালিগালাজ এবং এর ভয়ানক ফলাফল

শেখ সাখাওয়াত হোসেন: গালিগালাজ মানে কাউকে তির‌স্কার করে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের ব্যবহার। এটি মানুষের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাই গালিগালাজকে খুবই নিন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষকে গালি দেওয়া বা অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলা কোনো উত্তম চরিত্রের ব্যক্তির হতে পারে না। আমরা জানি সৃষ্টিকর্তা অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের সকল প্রাণীর সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সকল সৃষ্টির সেরা হওয়ার কারণটি হচ্ছে আমাদের বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল কাজ করার ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ কোন কাজটি অন্যের জন্য ভালো কিংবা কোন আচারণ অন্যের মনে সুপ্রভাব বা কুপ্রভাব পড়বে তা উপলব্ধি করতে পারে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমরা পান থেকে চুন খসলেই মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করি। এমনকি অশ্লীল শব্দসমূহ উচ্চারণ করতেও দ্বিধাবোধ করি না। এমনকি আমাদের নীতি নৈতিকতার মানসিকতা মানদন্ড এতই অবনতি হয়েছে অন্য কোনো মতাদর্শের ব্যক্তিকে সহ্যই করতে পারি না। আমরা সবসময় খোঁজে বেড়াই অন্যজন কোথায়, কোন জায়গায় ভুল করেছে আর তা সোশাল মিডিয়ায় বা চা আড্ডায় প্রচার করি। এটি করার একটিই কারণ তা হচ্ছে প্রতিপক্ষ মানুষটি অপমান অপদস্থ করা। প্রকৃতপক্ষে আমাদের চিন্তা চেতনা কি এই রকমই হওয়ার কথা ছিল? উত্তরটি হবে, মোটেও না। তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে কেউ ভুল তথ্য দিলে তাকে শোধরানোর উদ্দেশ্যে ভুল ধরে দেওয়া কোনো অনৈতিক কাজ নয়,বরং ভালো কাজ। আর এই শোধরানোর কাজটিও হতে হবে উত্তম ভাষায়। কিন্তু কারো ভুল পেয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করতে না পেরে বা ব্যক্তিগতভাবে সুন্দর ভাষায় ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝানোর ক্ষমতা না থাকলে চুপ থাকায় শ্রেয়। তবুও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়।

কারণ কোনও উত্তম চরিত্রের দাবিদার ও সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী ব্যক্তির এমনটি হতে পারে না। তাই আমাদের বিশ্বনবী বলেছেন, ‘ হয় উত্তম কথা বলো নতুবা চুপ থাকো।’ আরও বিস্ময়কর লাগে যখন দেখি কোনো অনলাইন বা টেলিভিশন টকশোতে একজন আরেকজনকে আক্রমণাত্মক শব্দ ব্যবহার করে। আর আজকাল ত সোশাল মিডিয়ায় কারও লেখা কোনো মতাদর্শের বিপক্ষে অবস্থান করলে বা কারোও মতের সাথে সামন্যতম অমিল দেখা দিলে সোশাল মিডিয়ায় কমেন্ট বক্সে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এমনকি উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণির লোকজনও যেন এই অসভ্য আচারণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছেন না।

আমরা জানি আমাদের দেশে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ এই চারটি প্রধান ধর্মের লোক বসবাস করে। কেউ যদি এই ধর্মগুলোর ধর্মীয় নীতি নৈতিকতার বিষয়াদি বিশ্লেষণ করে তাহলে সুস্পষ্ট বলতে বাধ্য হবে যে, কাউকে গালিগালাজ করা, হোক নিজ ধর্মের লোক বা অন্য কোনো ধর্মের, তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তাহলে কেন আমরা পান থেকে চুন খসলেই একজন আরেকজনকে গালিগালাজ করি। ধর্ম কি লোকজনের প্রতি উত্তম ব্যবহার মাধ্যমেও সৃষ্টিকর্তাকে সন্তষ্ট করা যায়, এটা আমরা ভুলে যাচ্ছি?

যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাই কোরআন ও হাদিসের আলোকে গালিগালাজ করা কতটুকু ঘৃণিত কাজ তা তোলে ধরা হলো। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী,অভিশাপ দাতা, অশ্লীলভাষী ও গালালাকারী হয় না।(তিরমিজি,হাদিস:২০৪৩)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়,তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।(সুরা আহজাব,আয়াত:৫৮)

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে,কবিরা গুনাহগুলোর একটি হলো নিজের মা-বাবাকে অভিশাপ করা। ‘আল্লাহর রাসূলকে’ জিজ্ঞেস করা হলো মানুষ নিজের মা-বাবাকে কিভাবে অভিশাপ করে?

তিনি বলেন, ‘যখন সে অন্যের বাবাকে গালাগাল করে,তখন সে নিজের বাবাকেও গালাগাল করে থাকে।আর যে অন্যের মাকে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার তার মাকেও গালি দেয়।'(বুখারি, হাদিস:৫৯৭৩)

পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এটাও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে হোক মুসলিম বা অমুসলিম কাউকে বিনা অপরাধে কোনো প্রকার গালিগালাজ করলে পরকালে আল্লাহর বিচার ব্যবস্থায় কঠিন শাস্তির আওতায় আসতে হবে। ত বুঝতেই পারছেন কোনো ধর্ম ও সভ্য মানুষ গালিগালাজের পক্ষে নাই।

ত এখন এই গালিগালাজের কুফল সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক।‌ এই অসভ্য আচারণ কতটুকু ভয়াবহ সমস্যা ডেকে আনে নিচের সংবাদপত্রের নিউজগুলো সুস্পষ্ট প্রমাণ।

শ্রীনগর উপজেলার দেউলভোগ গরুর হাট এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে করে রবিউল (১৮) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায়, স্থানীয় ভূমি অফিসের নৈশ প্রহরী সোহেলের ধুমপানকে কেন্দ্র করে বাঁক বিতন্ডা (বাঁক বিতন্ডা মানে গালিগালাজ) শুরু হয়। এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রবিউল নামে ছেলেকে হত্যা করা হয়। (ডেইলী ইনকিলাব, অনলাইনে প্রকাশিত, ৯ মে,২০২০)

চট্টগ্রামের খুশীতে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বাকবিতন্ডার জেরে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। (ডেইলি বাংলাদেশ,অনলাইনে প্রকাশিত, ২৮ মে,২০২০)

নগরীতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোঃ মাহবুব (২৪) নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে খুন করেছে তার কথিত বন্ধু। পুলিশ সূত্রে জানা যায়,কাট্টলি এলাকায় কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল মাহবুব। এর মধ্যে একজনের সাথে তার কথা কাটাকাটি (কথা কাটাকাটি মানে এখানেও গালিগালাজ) হয়। এক পর্যায়ে মাহবুবকে ছুরিকাঘাতে খুন করে তার বন্ধু। (যুগান্তর, অনলাইনে প্রকাশিত,০৮ ডিসেম্বর ২০২০)

এই রকম যত অপ্রত্যাশিত ঘটনার খবর আমরা পেয়ে থাকি এর অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে গালিগালাজ বা কটাক্ষ ভাষা। আমাদের সমাজে একজনের প্রতি আরেকজন সম্মানের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা না বলায়, খুনের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এই অসভ্য গালিগালাজের সংষ্কৃতি মানুষের কতটুকু বিপদ বয়ে আনতে পারে, তা নিচের লেখা থেকে আরও স্পষ্ট বোঝা যাবে।

১.উগ্ৰ মেজাজ তৈরি: আমরা যখন বড়রা উগ্ৰভাষায় কথা বলি তখন ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মধ্যে উগ্ৰ মেজাজ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।যা সভ্য সমাজের জন্য মোটেও কাম্য নহে।

২.পারিবারিক অর্থনৈতিক সমস্যা: আমরা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে একজন আরেকজনকে গালিগালাজ করি। ফলস্বরূপ প্রায়ই খুনের মতো ঘটনা ঘটে। এরপর উভয় খুনী ও নিহত পরিবারের আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। একজন পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার কারণে অন্যজন জেলে থাকার কারণে।

৩.মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত: খুন করা ব্যক্তি যদি পরিবারের অভিভাবক হয়ে থাকে বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে থাকে তাহলে পরিবার মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৪.পরিবারের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত: খুন করে মানুষ বাঁচতে পারে না। তাকে আইনের আওতায় যেতেই হয়।তাই খুনী ব্যক্তি জেল জরিমানার কারণে তার পরিবারের মা,বাবা,ভাই,বোন,ও সন্তানদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। নিশ্চয়ই পরিবারের ভালোবাসা কোটি কোটি টাকা ও অশ্রাব্য গালিগালাজ থেকে বহু বহু গুণ দামী।

৫.সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি: যদি কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় গুরুকে কটাক্ষ বা গালিগালাজ করে এটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে দিতে পারে। এর ফলস্বরূপ দেশে অশান্তি বিরাজমান করবে।

তাই পরিশেষে স্বীকার করতেই হবে গালিগালাজ বা কটাক্ষ একটি অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এটি কোনো ধর্ম বা মতাদর্শই সমর্থন করে না। এটি সমাজের মানুষের বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আমাদের পরিবার ও সমাজ এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং ছেলেমেয়েদেরকে শৈশবকাল কাল থেকে নীতি নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি সমাজের ও রাষ্ট্রের সকল শ্রেণির শিক্ষিত এবং বুদ্ধিজীবী মানুষ এটা নিয়ে ভাবার এখনই উপযুক্ত সময়। তাই আসুন, সকলে ধর্ম,বর্ণ, নির্বিশেষে সবার সাথে উত্তম ব্যবহার করি ও একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত