প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিঝুম মজুমদার: আনুশকা হত্যা মামলা : ছেলেটি অতিরিক্ত ধূর্ত, যাতে কেউ সন্দেহ না করে সে কারণেই ভিক্টিমের মাকে ফোন দিয়েছে

নিঝুম মজুমদার : আনুশকা হত্যা মামলাটি নিয়ে যখনই ভাবতে শুরু করলাম, আমার স্ত্রী শুরুতেই আমাকে যে পয়েন্টটি নোট করতে বললেন, সেটি হচ্ছে ভিকটিম-এর যোনীপথ ও পায়ূপথ, এই দুই যায়গা দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছিলো কেন, এটা একটু ভালো করে ভাবতে। কেন তিনি এই পয়েন্ট নোট করতে বললেন? এর কারণ হচ্ছে, অভিযুক্ত ছেলেটি কি কোনোভাবে রেকলেস ছিলো কিনা, অর্থাৎ, যদি উভয়ের সম্মতিতে ইন্টারকোর্স শুরু হয়েও থাকে, সেক্ষেত্রেও ছেলেটি কোনো একটি পর্যায়ে মেয়েটির সম্মতি ব্যাতিরেকে এক্ট করেছিলো কি না। আর সম্মতি না থাকলে তো এটা খুব স্ট্রেট ফরোয়ার্ড কেসই। ফলে এসব খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা দু’জনই আইনজীবি হলেও, এই ধরনের মামলার ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ফ্রেম দাঁড় করানো যায় তখনই, যখন মামলার সমস্ত নথি-পত্র হাতে থাকে। আমাদের কাছে যেহেতু যা আছে সবই ভাসা-ভাসা- অল্প-বিস্তর এমন একটি মামলাতে একটা সিদ্ধান্তে আসাটা একদিকে যেমন দুষ্কর অন্যদিকে হাস্যকরও হয়ে যায়। ফলে আমি চেষ্টা করলাম কিছু সম্ভাবনাকে একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে একটা আইনী ফ্রেম-ওয়ার্ক সাজাতে। এটা অনেকটা আমাদের দুজনের কৌতূহল থেকেই এক ধরনের আলোচনা আর সে হিসেবেই এই লেখাটি লেখা যাতে করে এই লেখাটির সঙ্গে নতুন ভাবনা আপনারা সংযুক্ত করতে পারেন। দুই স্থান থেকে ব্লিডিং বিষয়ে আমি তিনজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে জানতে চাই। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি সো ফার দু’জনের মতামত পাই। ডাক্তার শুভ্র এবং ডাক্তার রাসেল, এই দুইজনের মতেই, পায়ুপথ দিয়ে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করলে কোনোভাবেই ঐ একই মুহূর্তে বা একই সঙ্গে যোনীপথ দিয়ে ব্লিডিং হবার সম্ভাবনা নেই। কিংবা ভাইস ভার্সা। আরেকজন অত্যন্ত স্বনামধন্য চিকিৎসক নাম না প্রকাশ করবার শর্তে তার অবজার্ভেশনে বলেন, ‘এই দুটি স্থান দিয়ে একত্রে ব্লিডিং হওয়া সম্ভব যদি যোনী ও পায়ু পথের মাঝের দেয়ালটি কোনোভাবে ছিঁড়ে যায়’ (তার মতামতটি মাত্র পেয়ে যুক্ত করে দিলাম)। ডাক্তার শুভ্র, আমাকে এই বিষয়ে তার একটি লম্বা অবজারভেশন দিলেন। যে অবজারভেশনে অনেকগুলো সম্ভাবনা তৈরি হয়, অনেকগুলো ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করা যেতে পারে।

ডাক্তার শুভ্র-এর মতে- (যেখানে যদি ধরে নেয়া যায় যে পায়ুপথ দিয়ে ইন্টারকোর্স হয়েছে, সেক্ষেত্রে- ‘এনাল সেক্স যদি নরমাল পেনিস দ্বারা হয় তাহলে এনাল ব্লিডিং হলেও হতে পারে আবার নাও হতে পারে, ডিপেন্ডস অন লুব্লিকেশন এন্ড এনাল স্ট্রেচিং। কিন্তু নরমাল পেনিস দ্বারা এনাল সেক্স করলে লুব্রিকেশন থাকুক আর না থাকুক ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং হবার সুযোগ নেই। ফরেন বডি প্লিজিং টেন্ডেন্সিতে এটা হতে পারে। এনাস দিয়ে সেক্স টয় বা যেকোন ফরেন বডি খুব জোরে ইন্সার্ট করলে সেটা রেক্টাল মাসল ক্রস করে শুধু ভ্যাজাইনা নয়, এবডোমেনেও ঢুকে যেতে পারে’ ডাক্তার শুভ্র তার অবজার্ভেশনে আরো বলেন- ‘পারভার্টেড সেক্স প্লেজারের ক্ষেত্রে এটা হতে পারে। মানে সম্ভাবনা। ১৭ বছরের একজন মেয়ে হাইমেন রাপচার হোক আর না হোক প্রথম ভ্যাজাইনাল সেক্স এর ক্ষেত্রে ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং হলেও হতে পারে আবার না হতে পারে, ওটাও লুব্রিকেশন আর ফোরপ্লে এর উপর নির্ভর করে’
‘মূলতঃ এসব আমরা পাই মেডিকেটেড ইরেকশন হলে যথেষ্ট ফোরপ্লে হয় না অথবা সময়ের অভাবে দ্রুত সেক্সুয়ালি প্লিজড হতে গিয়ে এধরনের ব্লিডিং হয়’ আসলে আমার স্ত্রী আর আমি এই মামলাটি নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রথমেই বুঝবার চেষ্টা করলাম যে দুই স্থান দিয়েই যেহেতু রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে বলে পোস্ট- মর্টেম রিপোর্টে এসেছে ফলে অভিযুক্ত ছেলেটি আসলে ঘটনার সময় কোনোভাবে রেকলেস ধরনের আচরণ করেছে কি না। মানে দাঁড়ায়, মেয়েটির যোনীদ্বার দিয়ে ব্লিডিং হয়েছে এমনটা দেখবার পরেও অভিযুক্ত দিহান পায়ূপথ দিয়ে ইন্টারকোর্স করেছে কিনা। এই প্রশ্নটির উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে একটা সিদ্ধান্তে এখান থেকে আসা যায় যে, যোনীদ্বার দিয়ে ব্লিডিং হতে থাকলে একজন মেয়ে পরবর্তী যে কোনো সেক্সুয়াল ম্যাটারে বাঁধা দেবে এবং ঠিক সে যায়গা থেকেই মেয়েটির পূর্ব সম্মতি থাকলেও সেই সম্মতি উইথড্র হয়ে যাবে। আবার আমি যদি শুরুতেই ধরে নেই যে, ভিক্টিম এর কোনো সম্মতিই ছিলো না তাহলে আসলে এটি স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড রেইপ কেইস হিসেবেই সামনে এসে যায়। অন্য আলোচনা সেক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে যায়। কিন্তু ডাক্তার শুভ্র উপরের মেসেজের বাইরেও টেলিফোনেও আরো কিছু সম্ভাবনার কথা সামনে আনলেন। যেমন- মেয়েটির মাসিক চলছে, এমনও হতে পারে ফলে সে কারণেও এনাল সেক্স হয়ে থাকতে পারে এবং সেখানেই দুর্ঘটনা ঘটে গেছে এমন হতে পারে। ফলে সে কারনে দুই স্থান দিয়েই পরবর্তীতে ব্লিডিং হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে যোনীদ্বার দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছে সেটা সেই ছেলেটি লক্ষ্যই করেনি এবং তার কারণ হতে পারে যদি অভিযুক্ত ছেলেটি কোনো শক্তিশালী মাদকের প্রভাবে তখন থেকে থাকে। এখানে অনেকগুলো সম্ভাবনা আনবার কারণ হচ্ছে, ঘটনার পরবর্তী কিছু ব্যাপার আমাকে কনফিউজড করে দিয়েছে। যেমন- (ক) অভিযুক্ত নিজেই ভিক্টিম এর মাকে ফোন দিয়ে সংবাদ দিয়েছে, (খ) বন্ধুদের ডেকে এনেছে সাহায্য করবার জন্য মেয়েটিকে নিয়ে কি করবে এই অবস্থায়, (গ) খুব দ্রুত জবানবন্দী দিয়েছে যা ঘটেছে সেটি বলে এবং (ঘ) পুলিশের কাছে বক্তব্য আর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বক্তব্য একই ছিলো বলে পুলিশ থেকে বলা হচ্ছে। আবার পালটা যুক্তি দিয়ে এও বলা যায় যে, (ক) ছেলেটি অতিরিক্ত ধূর্ত, যাতে কেউ সন্দেহ না করে সে কারণেই ভিক্টিম এর মাকে ফোন দিয়েছে, (খ) বন্ধুদের ফোন দিয়েছে কিংবা (গ) এমনও হতে পারে বন্ধুরা শুরু থেকেই সঙ্গে ছিলো। এমন অনেক সম্ভাবনা, যোগ-বিয়োগ-অনুমান করা যেতে পারে।

ফলে প্রাইমা ফেসি/ আপাতঃ দৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা এখানে তৈরি হয়। যেমন- [১] শুরু থেকেই মেয়েটির কোনো সম্মতি ছিলো না। মেয়েটিকে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাসায় ডেকে জোর-পূর্বক ধর্ষণ করা হয়।
[২] এটি দু’জনের সম্মতিতে একটি সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স ছিলো কিন্তু সেখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। [৩] শুরুতে মেয়েটির সম্মতি ছিলো কিন্তু কোনো একটি পর্যায়ে সম্মতি ছিলোনা। ছেলেটি সম্মতি না থাকার পরের সময়ে রেক্লেস ছিলো। এই বিষয়ে আমি অনুরোধ করবো কধরঃধসধশর া ঞযব ছঁববহ [১৯৮৫] এবং চবড়ঢ়ষব াং ঔড়যহ ২০০৩ এই দুটো মামলা একটু পড়ে নিতে বা সারমর্ম দেখে নিতে। বুঝতে সুবিধা হবে।
[৪] এটি দু’জনের সম্মতিতে একটি সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স ছিলো কিন্তু এই ইন্টারকোর্সের ফলে যখন ব্লিডিং শুরু হলো এবং অভিযুক্ত পরবর্তী করণীয় অর্থ্যাৎ চিকিৎসা সেবা নিতে দেরী করে ফেলেছিলো অর্থাৎ হাসপাতালে নিতে দেরী করবার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটি মৃত্যুবরণ করেন। (৫) ভিকটিম অভিযুক্তের বাসায় আসবার পর তিনি একাধিক ব্যাক্তির মাধ্যমে যৌন হেনস্থার শিকার হন। উপরের এই পাঁচটি সম্ভাবনার কথা ছাড়াও আরো নানাভাবে শব্দ, বাক্য, অক্ষর, ঘটনার নানাবিধ স্থান থেকে সম্ভাবনার কথা লেখা যায়। আমি সেদিকে যাচ্ছিনা আর। এদিকে ভিক্টিমের শরীরে ফরেন বডি স্যামপ্ল পাবার কথা উঠেছে, অভিযুক্ত -এর ডি এন এ পরীক্ষার কার্যক্রম চলছে, সুতরাং আমরা এসবের জন্যও অপেক্ষা করতে পারি। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে সেটা নারী ও শিশু নির্যাতন আইন- ২০০০ এর ধারা ৯ এর ২ উপধারায়। এই আইনে বলা হয়েছে- ‘ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, ইত্যাদির শাস্তি ৯ (২) যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে [ধর্ষণের শিকার] নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’

লক্ষ্য করে দেখুন এইখানে কি কি প্রমাণ করতে হবে- [১] এখানে ধর্ষন হয়েছে সেটি প্রমাণ করতে হবে প্রথমে [২] সেই ধর্ষনের ফলে-ই মৃত্যু হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে হবে আবার ধর্ষন প্রমাণ করবার জন্য অনেক বিষয় সামনে চলে আসবে। যেমন- অভিযুক্ত ও ভিক্টিমের সম্পর্ক, সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের ক্ষেত্রে সম্মতি, যদি সম্মতি শুরুতেই না থাকে সেটি, যদি শুরুতে সম্মতি থাকে এবং পরে না থাকে তাহলে সেটি ইত্যাদি। এগুলোর সঙ্গে এভিডেন্স হিসেবে অসংখ্য ডকুমেন্ট, নথি ইত্যাদি উপস্থাপিত হবে। সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসবেন, তাদের জেরা এবং পাল্টা জেরা করা হবে ইত্যাদি। সব কিছুর পর বিচারপতি একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুবেন। নিম্ন আদালতের রায়ের পর এই মামলাতে আপীল হবে নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেই আপীল প্রথমে হাইকোর্ট ডিভিশন এবং তারপর আপীলেট ডিভিশান এবং সব শেষ ধাপ রিভিউ পিটিশান। মানে দাঁড়ায়, বিচারের রাস্তা কিংবা আইনের রাস্তা বড় দূর আর দূরের। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত