প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিডাক্রান্ত বছরের অবসানে কল্যাণময় এক সূর্যোদয়

ড.  শোয়েব সাঈদ : কোভিডাক্রান্ত বছরের বিদায়ক্ষণে অন্ধকার টানেলের শেষ প্রান্তের আলোর বলয়টি আরো বড় হয়ে আমাদের আশা জাগাচ্ছে পহেলা জানুয়ারির এক কল্যাণময় সূর্যোদয়ের, যার স্থায়িত্বে মানব সভ্যতা তার প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতায় পরাভূত করবে কোভিড নামক অপশক্তিকে। ইউকে কর্তৃপক্ষ বিষাক্ত বছরের পেনাল্টিমেট দিনে এসট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনটি অনুমোদনের মাধ্যমে কোভিড লড়াইয়ে আরেকটি শক্তিশালী ডিফেন্স লাইন তৈরি করল। দামে, আবহাওয়া আর সাপ্লাই চেইনের সুবিধেজনক অবস্থানের এই ভ্যাকসিনটি বলতে চাই “জোট নিরপেক্ষ” ভ্যাকসিন। বাংলাদেশ সহ এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যে এটি বড় রকমের সুখবর। ফাইজার, মডার্না আর এসট্রাজেনেকার সম্মিলিত শক্তি বা “লড়াই সক্ষমতা’ বিদায় বছরের শেষে এসে কোভিডে ক্লান্ত, শ্রান্ত মানব জাতিকে দুর্দিন অবসানের সুখবর দিচ্ছে।

সমসাময়িক মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচ্য থেকে প্রতীচী, উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে পর্যন্ত বিস্তৃত কোভিড বিষে জর্জরিত দুর্যোগপূর্ণ বছর ২০২০ সাল অবশেষে বিদায় নিতে যাচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে কিছু নিউমেনিয়া জনিত অসুস্থতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর বছর পূর্তিতে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির এই বছরের পেনাল্টিমেট দিনে অর্থাৎ শেষ দিনের আগেরদিনে ১৮ লক্ষের বেশী মানুষের মৃত্যু, ৮ কোটি ২০ লক্ষ সংক্রমণের বোঝা ২১৭ টির অধিক দেশে চাপিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছে অপয়া বছরটি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ১১ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্য চীনের সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক হাব উহানের এই নিউমোনিয়া ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে জানিয়ে দেয় এবং পরের দিন নতুন ভাইরাসের খবরটি রোগ বিস্তারের প্রথম সংবাদ হিসেবে ছাপানো হয়। জানুয়ারির ৫ তারিখ নাগাদ ৫৯ টি সংক্রমণের কথা জানা যায় তবে কোন মৃত্যুর ঘটনা জানানো হয় নি।

জানুয়ারি ১০ তারিখ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটি নিয়ে বিস্তারিত টেকনিক্যাল নির্দেশনা প্রকাশ করেন। জানুয়ারীর ৭ তারিখ চীন এই অজানা ভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স করার কথা জানান আর ১২ তারিখ ভাইরাসটির জেনেটিক সিকোয়েন্স প্রকাশ করে। এভাবে জানা হয়ে যায় চীনের এই অজানা রোগটির নাম হচ্ছে কোভিড-১৯, যার কারণ হচ্ছে নোভেল করোনা ভাইরাস সার্স-সিওভি-২।

জানুয়ারির ১৩ তারিখ চীনের বাইরে থাইল্যান্ডে প্রথম কোভিড-১৯ সনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল চীন সফর করে বিস্তারির জানবার জন্যে। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কানাডা, জার্মানি, কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য কর্মীদের সাথে ব্যাপক শলাপরামর্শ করেন দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে। তখন পর্যন্ত কারো ধারণার মধ্যে ছিলনা কতোটা ভয়াবহ হতে পারে কোভিড-১৯ বিশ্ব সভ্যতা আর বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যে। অতপর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ফার ইস্টের জাপান, কোরিয়া আক্রান্ত হতে শুরু করে। বিশ্বায়নের সুযোগে কোভিড ইরান , ইতালি হয়ে পুরো ইউরোপ তারপর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা হয়ে দখল করে নেয় উত্তর গোলার্ধ। একসময় বিস্তৃত হয় দক্ষিণ গোলার্ধে।

মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ইউরোপে আঘাত করে পূর্ণ শক্তিতে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ণ শক্তিতে আঘাত করে ভারতীয় উপমহাদেশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১০ টি দেশের ১ লক্ষ ১৮ হাজার সংক্রমণের কঠিন পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের মার্চ মাসের ১১ তারিখে নতুন করোনা ভাইরাস উদ্ভূত রোগ কোভিড-১৯ এর বিস্তারকে গ্লোবাল প্যানডেমিক ঘোষণা করলেন।

ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ অনুসারে সার্স-সিওভি-২ এর সূত্রপাত জীবজন্তু থেকে। বাদুড় থেকে পেংগুলিন হয়ে উহান শহরের হুয়ানান মার্কেট থেকে মানুষে সংক্রমণের সম্ভাব্যতা বেশী আলোচিত।

সার্স-সিওভি-২ ভাইরাসটি অবশ্য মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রথম করোনা ভাইরাস নয়, প্রায় ৬টি ভাইরাস ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে যার সবগুলির উৎস জীবজন্তু। সাধারণ সর্দি-কাশির জন্যে চারটিকে দায়ী করা হয়। এরা মূলত স্থানীয় সংক্রমণ কেন্দ্রিক যাকে সংক্রামক রোগের পরিভাষায় এনডেমিক বলা হয়। এনএল৬৩, ২২৯ই নামক ভাইরাসদ্বয়ের উৎস বলা হয় বাদুড় থেকে এবং ওসি৪৩, এইচকেইউ১ এর উৎস ধরা হয় ইঁদুর জাতীয় প্রাণী থেকে। অন্য দুটি নন-এনডেমিক করোনা ভাইরাস গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী।

২০০৩ সালে চীন আর ভিয়েতনামে সিভেয়ার একুউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম করোনা ভাইরাস (সার্স-সিওভি) আর ২০১২ সালে সৌদি আরবে মিডল ইস্টার্ন রেস্পিরেটরি সিনড্রোম করোনা ভাইরাস (মার্স) বেশ ভুগিয়েছে মানব সভ্যতাকে। মার্স ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রায় ২৭ টি দেশে। উটকে মার্সের সংক্রমণের উৎস ধরা হয়। সার্সের উৎস হিসেবে ধারণা করা হয় বাদুড়। সার্স-সিওভি কিংবা মার্স থেকে ভিন্নতর হবার কারণে সার্স-সিওভি-২ কে নোভেল বা নতুন ভাইরাস বলা আখ্যায়িত করা হয়।

২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু খ্যাত ভাইরাস এইচ১এন১ এর পেনডেমিকের পর বিশ্বকে আবারো মোকাবিলা করতে হোল ২০২০ সালে নতুন প্যানডেমিক, সার্স-সিওভি-২ উদ্ভূত কোভিড-১৯ পেনডেমিক।

ইরান, ইতালি স্পেন সহ বিভিন্ন দেশে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মার্চের ১৮ তারিখ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। ভ্যাকসিন উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় জড়িত হয় অনেক গবেষণা আর ভ্যাকসিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের মার্চ মাসটি কোভিড সংকটের এক ভয়াল মাস। সমগ্র ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়া জুড়ে কোভিড-১৯ তাণ্ডবের সূচনাপর্ব।

প্রথম ওয়েভের ধাক্কা সামলিয়ে উঠার আগেই দ্বিতীয় ওয়েভের প্রবলতর ধাক্কা শুরু হল অক্টোবরের দিকে, দ্বিতীয় ওয়েভের প্রবল ধাক্কার মধ্যেই বছরের পালা বদল। বছরের শেষ সময়ে কোভিডের প্রবল চাপে রয়েছে, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা। লক ডাউনের কড়াকড়ি কমাতে পারছেনা কোভিড আগ্রাসন।

বছরের পালা বদলের সময় শুধু খারাপ খবর নয়, আছে সুখবরও, তিন তিনটি ভ্যাকসিনের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে কোভিড যুদ্ধে বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা। মাঝখানে ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তা কিন্তু পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা অভিজ্ঞতার আলোকে খুব একটা আমলে নিতে চাচ্ছেন না এই ভ্যারিয়েন্ট ইস্যুকে।

২০২১ সাল আমাদের জন্যে শুভ হোক, কল্যাণময় হোক।

হোক ভ্যাকসিন, মাস্ক আর দায়িত্বশীলতা দিয়ে কোভিডকে পরাভূত করে বিশ্বময় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার কাঙ্ক্ষিত বছর।

শুভ নববর্ষ।

সর্বাধিক পঠিত