প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাংস্কৃতিক দুর্বলতায় জঙ্গিবাদের হুঙ্কার

কবীর চৌধুরী তন্ময় : কাক হচ্ছে একমাত্র পাখি যে ঈগলের ঘাড়ের উপর বসে ঈগলকেই ঠোকর মেরে বিরক্ত করতে পারে! কাকের মতো এই ধরনের দুঃসাহস সহসাই অন্য কোনো পাখির মধ্যে দেখা যায় না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঈগল রাগান্বিত হয়ে কাকের সঙ্গে লড়াই করে না বা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না, কিংবা কাককে মেরে ফেলার চেষ্টাও করে না। অযথা কাকের পিছনে ছুটে নিজের সময় ও শক্তির অপচয় করার মতো ঈগল বোকামি করে না। নিউজ বাংলা ২৪

ঈগল তখন দ্রুতগতিতে উপরের দিকে উঠতে থাকে। আর ঈগল দ্রুতগতি নিয়ে এতোটাই উপরে উঠে যায় যে, কাক অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং টিকে থাকতে না পেরে একটা সময় ঈগলের ঘাড় থেকে বাধ্য হয়ে খসে পড়ে। এই গল্পটা বাবার মুখে শুনেছি, বহুবার। আবার স্কুলজীবনে শিক্ষকের কাছেও শুনেছি। সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুকে, বেশ ভাইরাল হয়েছে এই গল্প।

গল্পটির যাথার্থ্য হচ্ছে, আজ বাংলাদেশের পঞ্চাশে দাঁড়িয়েও আমরা কাক-তাড়ানো ঈগল তৈরি করতে পারিনি। কাক সবচেয়ে কুৎসিত পাখি। আর মৌলবাদী, ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী, জঙ্গি মন-মগজের ব্যক্তি ও মহল শুধু একক কোনো দেশ ও জাতির জন্য হুমকি নয়, বরং বিশ্বমানবতার জন্য হুমকি, যা কাকের চেয়েও কুৎসিত ও ভয়ঙ্কর।

দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলসামস, যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়াসহ সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পদায়নের বিপরীতে আমরা কী করেছি, কী করার প্রয়োজন ছিল, কী কী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার জরুরি ছিল -এগুলো গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

অনেকে বলেন যে, তারা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ’, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী’। কিন্তু আলাপ-আলোচনায় হতাশা ছাড়া তেমন কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না। আবার কিছু ব্যক্তি ও মহলের কর্মকাণ্ড নিয়ে পর্যালোচনা করলে হতাশার পাশাপাশি লজ্জাও যুক্ত হয়।

বঙ্গবন্ধু তার চিন্তা-দর্শনে ‘আমাদের জাতীয়তাবাদ বাঙালি’র পরে আমাদের সবার ব্যক্তি পরিচয় ‘আমরা মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসকে তিনি রেখেছন এর পরে। তবে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে আমরা যেন ধর্মবিশ্বাসকে সবার সামনে আনার চেষ্টা করছি। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে দলীয় বা রাজনৈতিক পর্যায়, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবেও সুকৌশলে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিয়েছি বা ‘সচেতন মুসলমান’ হওয়ার চেষ্টা করছি। এমনকি কতিপয় করপোরেট হাউজ থেকে গণমাধ্যম হাউজগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। বিজ্ঞাপন, পোস্টার-ব্যানার থেকে স্লোগানেও ধর্মকে যুক্ত করে খাঁটি ধার্মিক হওয়ার চেষ্টা করছি।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘বাঙালি’ ‘মানুষ’ এবং ‘মুসলমান’ – আজ আমরা কতটুকু ধারন ও পালন করছি, সেই সঙ্গে রাষ্ট্র কিভাবে এই ‘দর্শন’কে গুরুত্ব দিচ্ছে কিংবা বাস্তবায়ন করছে– এটি গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ, জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশলের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে বিশেষ শ্রেণীর সমর্থন অর্জন যা ভোটের রাজনীতি, যাকে বলা হয় ‘ক্ষমতার রাজনীতি’, তার ভবিষ্যত কী, তা বেলা থাকতেই বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ, ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর রন্ধ্রে-রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকীরণের নীতির বিস্তার ঘটছে সুকৌশলে। যেমন, নারীর হিজাব, পুরুষের টাকনুর ওপর পোশাক পরার বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। এখানে সরকারি বিধি অনুযায়ী নয়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আব্দুর রহিম তার অফিস চালাতে চেয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত মনমর্জি বা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। রাষ্ট্র টের পেয়েছে বা অনুধাবন করতে পেরেছে যখন তিনি তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ড্রেস কোড নির্ধারণ করে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন, তখন।

এই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী আবারও মনগড়া ফতোয়া জারি করে দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করবে – এটি রাষ্ট্র বুঝেছে কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার পরে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি দেশের ভবিষ্যত নির্ভর করে তার জনগণের উপর। যে দেশের জনগণ যতটা দেশপ্রেমিক, সে দেশ ততটা শক্তিশালী। আর এই শক্তিশালী জনগণ সৃষ্টি হয় একটি দেশের সঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে রীতিমত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেই ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে, মুছে ফেলা হয়েছে এবং অলিখিতভাবে নিষিদ্ধও করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কী করেছি – এই প্রশ্ন স্বাধীনতাকামী বাঙালি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে করতেই পারেন। আবার স্বাধীনতার পক্ষের সরকার কী করেছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি জাতি গঠনে কী কী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে – এটিও দেখা দরকার।

তবে তথ্যপ্রমাণ বলে, আমরা জেনে কিংবা অজ্ঞাতে স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছি, দল কিংবা গ্রুপ ভারি করতে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের নিজের করে নিয়েছি। ধর্মের কথা বলে ‘ছাড়’ দেয়ার প্রবণতায় আজ আমার দেশকে জঙ্গি পাকিস্তান-আফগানিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে। দেশের অগ্রযাত্রাকে বহির্বিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ করার নীলনকশা প্রণয়ন করা হচ্ছে। কারণ, আমার ব্যর্থতার সুযোগটাই তারা নিতে চেষ্টা করছে। আমি কেন ঈগল সৃষ্টি করতে পারিনি। তাই কুৎসিত কাকও আজ আমাকে ঠোকর দিতে চেষ্টা করছে। ভাস্কর্যের অজুহাতে দেশের শিল্প-সাহিত্য আর সাংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে, হুমকি ধামকি দিচ্ছে।

আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, একটি দেশের শিল্প-সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে যখন দেশের ইতিহাস-দর্শন চর্চা ঝিমিয়ে পড়ে, তখনই জঙ্গি-মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। হুমকির মুখে পড়ে দেশ ও মানবতা, নষ্ট হয় দেশের ভাবমূর্তি। আর এখানেই আমাদের গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কারণ সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, জঙ্গিগোষ্ঠীর ‘ভাইরাস’ রাষ্ট্রযন্ত্র-প্রশাসন দ্বারা নিরাময় করা সম্ভব নয়। এটির অ্যান্টিভাইরাস হলো সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক বিল্পব এবং ধর্মীয় রাজনীতির মূল উৎপাটন। সেদিকে মনোযোগী হওয়া সময়ের দাবি।

লেখক: সভাপতি-বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত