শিরোনাম
◈ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সতর্ক পুলিশ, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কড়া নজরদারি ◈ বাধ্যতামূলক হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই: শিক্ষামন্ত্রী ◈ সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তকমা নিয়ে যা বললেন ◈ মাসে কত টাকা পাবেন জুলাইযোদ্ধার, জানালেন মন্ত্রী ◈ বিদেশি ঋণ নয়, নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার ◈ ‘সিক্সটিন হানড্রেড মাইল অফ কাঁচা রাস্তা বলার যে ব্যাখ্যা দিলেন আলোচিত সেই এমপি জেবা আমিন (ভিডিও) ◈ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধটি আসলে কেন হয়েছিল? ◈ বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের হাঙর সাব‌মে‌রিন, বাংলাদেশকে নি‌য়েও জল্পনা তু‌ঙ্গে, ভারতের জন্য কতটা চিন্তার? ◈ যুক্তরা‌স্ট্রের স‌ঙ্গে আলোচনার মানে এটা নয় যে, শত্রুর মতামত মেনে নেয়া হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ◈ ‌বিশ্বকা‌পে হাইতির বিরু‌দ্ধে নতুন  কৌশল নিয়ে নামবেন ব্রা‌জি‌লের কোচ কা‌র্লো আনচেলত্তি

প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর, ২০২০, ০৯:৫৩ সকাল
আপডেট : ১৫ নভেম্বর, ২০২০, ০৯:৫৩ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কমছে না কিশোর গ্যাংয়ের দাপট ও বিপদ

ডেস্ক রিপোর্ট: ছোট ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড, রাস্তায় উৎপাত থেকে শুরু করে ধর্ষণ, ছিনতাই থেকে মাদকাসক্তি— গত কয়েক মাসে কিশোর গ্যাংদের এ রকম অনেক সংবাদ গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। ডেইলি স্টার

অভিযোগ রয়েছে, এই কিশোর গ্যাংদের প্রায়শই পেছন থেকে সমর্থন দেয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের একাংশ। তারা ‘বড় ভাই’ হিসেবে এই কিশোরদের কাজে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।

গ্যাং সদস্যদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি মাদক চোরাচালানেও জড়িত। কেউ কেউ নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য দেখাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র বহন করে। তারা এলাকায় প্রভাব বজায় রাখতে গিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

গত চার মাসে সন্দেহভাজন কিশোরদের হাতে এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজটি খুবই কঠিন হতে পারে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গত ১৮ অক্টোবর অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কিত মাসিক পর্যালোচনা বৈঠকে রাজধানীতে কিশোর গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন।

তিনি ডিএমপির অপরাধ বিভাগকে সতকর্তার সঙ্গে বিষয়টি দেখতে বলেছেন। পাশাপাশি, তিনি পুলিশ সদস্যদের বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের চিহ্নিত ও নজরদারিতে রাখতে। গ্যাং কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় তিনি নগরীর বিভিন্ন সড়কে অস্থায়ী চেকপয়েন্ট বসানোর ওপরও তাগিদ দিয়েছেন।

২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় ১৪ বছর বয়সী স্কুলছাত্র আদনান কবিরকে তার সমবয়সী কিশোররা পিটিয়ে হত্যা করলে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম সংবাদ শিরোনাম হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শুধুমাত্র উত্তরাতেই এক ডজনের বেশি গ্যাংয়ের সন্ধান পান।

গত সেপ্টেম্বরে সাভারে স্থানীয় গ্যাং সদস্যদের হাতে নিহত হয় স্কুলছাত্রী নীলা রায়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার দুই ছেলের হাত থাকার অভিযোগ উঠেছে। গত ৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে নাঈম নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

গ্যাং কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করায় গত ১ এপ্রিল একই এলাকায় ৩০ বছর বয়সী শরিফ হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় শীতলক্ষ্যায় ডুবে মারা যায় দুই কিশোর। ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কিশোরদের ধাওয়া থেকে বাঁচতে তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে ৪০টির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। প্রতিটি গ্যাংয়ে সদস্য রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জন করে।

তাদের মতে, এই গ্যাংগুলো উত্তরা, তুরাগ, খিলগাঁও, দক্ষিণ খান, টঙ্গী, সূত্রাপুর, ডেমরা, সবুজবাগ, খিলক্ষেত, কোতোয়ালি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি আগারগাঁও ও হাতিরঝিলে সক্রিয় রয়েছে।

বরগুনার কুখ্যাত নয়ন বন্ড ০০৭ গ্রুপ গত বছর দিনের বেলায় রাস্তায় জনসম্মুখে রিফাত শরিফকে কুপিয়ে হত্যা করে। অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি তরুণ গ্যাং সংস্কৃতির একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতার ছেলের সম্পৃক্ত থাকার প্রসঙ্গটিও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

এ হত্যার জন্যে ১১ কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত পর্যালোচনায় বলেন যে সারাদেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। গডফাদাররা এই তরুণ-কিশোরদের ব্যবহার করছেন। আদালতের ভাষ্য মতে, এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দেওয়া হলে অন্যরা অনুগ্রাণিত হবে।

সম্প্রতি, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দেলোয়ার বাহিনী নামে তরুণ গ্যাংয়ের হাতে একজন গণধর্ষণের শিকারের সংবাদটি সারাদেশে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। শুধুমাত্র বেগমগঞ্জেই অন্তত দুই ডজন গ্যাং রয়েছে যারা ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার আশীর্বাদপুষ্ট বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর উত্তর খান এলাকায় কলেজছাত্র মো. সোহাগ নিহত হন। জানা গেছে, এক রিকশাচালককে হেনস্থা করার প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মতে, এই গ্যাংটির নেতৃত্বে রয়েছে ছাত্রলীগের পূর্ব উত্তরা শাখার সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক সাকিবুল ইসলাম সানি ও সেই শাখার সহ-সভাপতি ও তার বড়ভাই আরফিন শাকিল। সোহাগ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সানি। এই দুই ভাইকে সম্প্রতি তাদের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কয়েক মাস আগে, টিকটক ও লাইকি তারকা ইয়াসিন আরাফাত ওরফে অপু ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উত্তরায় তার অনুসারীরা তিন স্থানীয় তরুণকে ছুরিকাঘাত ও মারধর করে। স্থানীয়দের অভিযোগ এই গ্রুপটিকেও সেই দুই ভাই পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। তাদের আরও অভিযোগ, শাকিল ও সানির সমর্থিত গ্যাংটি গত কয়েক বছর থেকে উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় বিভিন্ন অবরাধে জড়িত।

২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও মাদক রাখার অভিযোগে পূর্ব উত্তরা ও দক্ষিণ খান থানায় অন্তত ছয়টি মামলা রয়েছে। এ রকম আরও গ্যাং সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় রয়েছে।

আশুলিয়ায় স্থানীয় যুবলীগের আহ্বায়ক আবুল হোসেন আপন এলাকায় তার প্রভাব ধরে রাখতে এ রকম একটি গ্যাংকে কয়েক বছর ধরে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এক কিশোরকে অপহরণ ও মুক্তিপণ না দেওয়ায় তাকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে আপন ও তার তিন সহযোগীকে গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিলেটের দরিয়াপাড়া এলাকার ১৮ বছরের কিশোর রাকিবুল হোসেন নিঝুকে গত ৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয় ১৪ বছরের এক শিশু ধষর্ণ মামলায়। এর আগে ৭ আগস্ট তিন প্রবাসীকে হেনস্থা করার অভিযোগে রাকিবুল ও আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জামিনে বের হয়ে আসার পর এক সিটি কাউন্সিলর তাদেরকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিলেন। এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তাদেরকে আশ্রয়-প্রশয় দেন বলে অনেকের অভিযোগ।

পুলিশ জানিয়েছে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এ রকম কয়েকশ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের অন্তত ১২ জন নেতা এই গ্যাংদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বন্দরনগরীর চকবাজার, কোতোয়ালি, পাঁচলাইশ, খুলশী, চাঁদগাঁও ও বাকলিয়া এলাকা কিশোর গ্যাংদের নিরাপদ স্থান। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ আহমেদ তানভির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, এই গ্যাংগুলোকে দমন করতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) সম্প্রতি কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। সে সময় প্রায় ৪০০ গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরে এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ দমনে সচেতনতা তৈরিতে আমরা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সারাদেশে কাজ করে যাচ্ছি।’

অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত দুটি কারণে তরুণ-কিশোররা গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। একটি হলো— অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার এবং অন্যটি হলো— ক্ষমতার সঙ্গে থাকার মানসিকতা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যারা ক্ষমতার রাজনীতি করেন তারা ত্রাসের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে এই কিশোরদের ব্যবহার করেন।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দেন তিনি। বলেন, ‘পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাবের কারণে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ডেইলি স্টারকে জানান, রাজনৈতিক দলগুলো কিশোর গ্যাংগুলোকে আশ্রয় দেয় কি না তা তাদের জানা নেই। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা দেখেছি যে, এই কিশোররা ফেরারি আসামিদের নির্দেশনা মেনে চলে। বিষয়টা আমাদের নজরে আছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, ‘কিশোররা নিজেরাই দল গঠন করে। তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে লেখার দায়িত্ব সংবাদিকদের।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়