প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত

ডেস্ক রিপোর্ট: করোনার মধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পেশাজীবী মানুষ। কোভিড-১৯ এর কারণে এমনিতেই আয় কমে গেছে; কারো কারো রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রতিটি নিত্যপণ্য ছাড়াও ওষুধ, পরিবহন ব্যয়, বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গেছে। ফলে বেড়ে গেছে মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয়। অথচ আয় বাড়েনি। এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষকে তিন বেলা পেটপুরে খাদ্য সংগ্রহে রীতিমত খাবি খেতে হচ্ছে। আর মধ্যবিত্তদের আয়ের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রতিদিনের বাজার তালিকা কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে জমানো পুঁজি ভাঙ্গিয়ে খরচ করছেন।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মানুষের এখন আয়-রোজগার নেই। যারা আয় করছেন তাদের রোজগারও কমে গেছে। অনেকেই জমানো টাকা ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। এতে ‘পণ্যমূল্য বৃদ্ধি’ মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। অসহায় হয়ে পড়েছেন পেশাজীবী নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ।

যাপিত জীবন নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের অসহায়ত্বের কথা জানা যায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, মাসের থাকা-খাওয়ার ব্যয় এতই বেড়েছে যে, ঢাকা শহরে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। দূর্দশার চিত্র তুলে ধরে তারা বলেন, বাজার ব্যবস্থার উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিনিয়ত একটার পর একটা পণ্যের মূল্য বাড়ছে। দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও আমলাদের স্ববিরোধী কথাবার্তার কারণে কোনো ভাবেই নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ে গেছেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী মানুষে। গত সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি সংবাদ সম্মেলন করে ২৫ টাকা আলুর কেজি দরে বিক্রি করার ঘোষণা দেন। কিন্তু গতকাল কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক স্পষ্ট জানিয়ে দেন ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আলুর দাম বৃদ্ধি করা হবে। মন্ত্রীদের এই লাগামহীন কথাবার্তার সুযোগ নিয়ে অসৎ ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটধারীরা দাম বাড়াতে বাজারে পণ্যের কৃতিম সংকট সৃষ্টি করছেন। ইচ্ছা মতো মজুত করছেন, দাম বাড়াচ্ছেন। এতে জীবন যাত্রায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কথাবার্তায় মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। নিত্যব্যয় মেটাতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ বর্তমানে জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
রাজধানীর ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবার মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও ১৪টি সেবার তথ্য পর্যালোচনা করে ক্যাব একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়, পেঁয়াজ, এলাচি, রসুন, আদা, চাল, আটা, ডিম, শাক-সবজি, ভোজ্য তেল, লবণ, চিনি, সাবান ও পান-সুপারিসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম অস্থিতিশীল। গত বছর মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। পণ্য ও সেবামূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৬ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৭ সালে ছিল ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। চলতি বছর এই ব্যয় বেড়েছে ৮.১৩ শতাংশ।

চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আটা-চালের বাজার দেখার দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালযের নয়। এ কাজ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আমাদের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের সংস্থা নেই। এ ধরনের সংস্থা আছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। আবার খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত চিঠি দিয়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের অনুরোধ জানানো হলেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দর নির্ধারণ করে দেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদফতরের। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাটি দরদাম বেঁধে দিলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা দেখার ক্ষমতা নেই তাদের। প্রশাসনে কাদের কি ‘এখতিয়ার’ এই চক্রে পড়ে দ্রব্যমূল্যের ঘুড়ি উদ্ধমুখে উড়ছে তো উড়ছেই। প্রশাসনে এই সমন্বয়হীনতা বুঝে ব্যবসায়ীরা চাল, তেল, আটা, পেঁয়াজ, ডিম, সবজির দাম তো বাড়িয়েছেনই, ছাড় দেননি শিশুদের গুঁড়োদুধেও।

ইতোমধ্যেই চাল, আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। সরকারের বেঁধে দেয়া দাম আমলেই নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। তারা চাল ও আলু বিক্রি করছেন খেয়ালখুশি মতো। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেও লাভ হচ্ছে না। একদিকে করোনার থাবায় আয় কমেছে মানুষের, বেড়েছে বেকার। বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে দ্রব্যমূল্য।

হঠাৎ করে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার মিলগেটসহ পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিত্যপণ্যটির দাম ঠিক করে দিয়েছে। কোল্ডস্টোরেজে বিপুল পরিমান আলু সংরক্ষিত থাকায় আলুর মূল্য নিয়ন্ত্রণে দামও ঠিক করে দেয়া হয়। সচিবালয়ে বৈঠক করে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘোষণা দেন টিসিবির মাধ্যমে খোলা ট্রাকে করে ২৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করা হবে। টিসিবি বিকি করবে ২৫ টাকা কেজি আর বাজারে আলুর কেজি ৩০ টাকা নির্ধারন করে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্দেশ মানেননি। অসৎ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে পণ্যগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে বিপন্নবোধ করছেন ভোক্তারা। এ অবস্থায় অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে উল্টো সপ্তাহ যেতে না যেতেই কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নতুন করে আলুর দাম নির্ধারণ করা হবে। মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর কৃষি স¤প্রসারণ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সচিবালয়ে বৈঠক করে আলুর কেজি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি পেয়াঁজের দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। আলু এখনও ৫০-৫৫ টাকা। ভালো মানের মিনিকেট চাল ৬০-৬২, মাঝারি মানের মিনিকেট ৫০-৫২ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১০০-১০৫ টাকা লিটারে। গুঁড়োদুধের দাম বেড়েছে কেজিতে ২৫-৩০ টাকা। ৮০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া মুশকিল। কাঁচামরিচের কেজি এখনও ২৫০-৩০০ টাকা। কেজিতে মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৫-১০ টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সাংবাদিকদের জানান, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মিলগেটে চালের দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা দেখার এখতিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন জানিয়েছেন, চালের বাজার দেখার দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের, আমাদের নয়। পেঁয়াজ লবণের দায়িত্ব আমাদের। এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছি।

গত ৩০ দিনের টিসিবি‘র মূল্য তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, নিত্য প্রযোজনীয় প্রতিটি পণ্যে দাম ৫ থেকে ১৫ টাকা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর যে চাল ৪৩ টাকা থেকে ৫৮ টাকা দরে বিক্রি হত্।ো তা অক্টোবরের ৬ তারিখে ৫২ থেকে ৬৮ টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও চালের বাজারে গত কয়েকদিনে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। পেঁয়াজ গত মাসের তুলনায় কেজিতে ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। তেল ২ টাকা থেকে ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রকম প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধি : বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায় করোনার মধ্যেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বাড়িভাড়া বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। বস্তির ঘরভাড়া ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও মেসের ভাড়া বেড়েছে ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ।

পরিবহন ব্যয় কমেনি : হাইওয়ে স¤প্রসারণ এবং জ্বালানি তেলের মূল্য কমলেও যাত্রী ও পরিবহন ব্যয় কমেনি। করোনার মধ্যে অর্ধেক যাত্রী বহনের অজুহাত দেখিয়ে পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ‘যত সিট তত যাত্রী’ শর্তে গণপরিবহণ চললেও বাস্তবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই অধিক যাত্রী এবং বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

ওষুধের দাম বেড়েছে : ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ বিশে^র ১৪২টি দেশে ওষুধ রফতানি করে। এর মধ্যে দেশে ব্যাপকভাবে নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। কোভিড-১৯ এর সময় ওষুধের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। ওষুধ কোম্পানীগুলো যে যেভাবে পারছেন ওষুদের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এমনকি কোনো কোনো ওধুষের দাম দ্বিগুন করা হয়েছে। দেখার যেন কেউ নেই। ওষুধের উচ্চমূল্য দরিদ্র রোগী এবং মধ্যবৃত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল : বিগত এক দশকে বিদ্যুতে অভাবনীয় উন্নতি হলেও বাড়তি ব্যয়ে চালানো কুইক রেন্টালগুলো সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলছে। ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৭বার এবং খুচরা মূল্য ৯ বার বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো ভোক্তাদের কাছে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করা সত্তে¡ও উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় সংকুলান সম্ভব হচ্ছে না এমন অজুহাত তুলে আবারও মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতে মানুষের মধ্যে ভীতি বেড়ে গেছে।

গ্যাস-পানি : গ্যাস ও পানির দাম বেড়েছে দফায় দফায়। অথচ মানুষের আয় বাড়েনি, কমেছে। বাসাবাড়িতে বার্নার গ্যাসের চুলার ব্যয় বেড়েছে ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবে অর্থ সংকটে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। অনেকে হয়ে পড়েছেন বেকার। আবার কারো কাজ আছে কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না। অনেকের বেতন কমে গেছে। ফলে সংসারের খরচ মেটাতেই এখন হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। এমন অবস্থায় সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় কার্যত নিম্নবৃত্ত-মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। ইনকিলাব

সর্বাধিক পঠিত