প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আর বাড়বে না

ডেস্ক রিপোর্ট: দ্রুত বিদ্যুতের জন্য চালু হওয়া কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট যুগের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। সরকার বলছে, নবায়ন করা হবে না আর কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ। আগামী ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে বেসরকারি খাতের প্রায় ৪২০০ উৎপাদন ক্ষমতার ৪২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের চুক্তিতে উৎপাদনে এলেও পরবর্তী সময়ে অধিকাংশেরই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বেজড লোড বা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসেনি।

পিডিবি বলছে, ইতোমধ্যে পায়রার ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে চলে এসেছে। পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে মাতারবাড়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হবে। ফলে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার কোনো দরকার হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিডিবি সূত্রে জানা যায়, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২১ থেকে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে- বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সেসবের একটি তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে গ্যাস, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৪২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের। পিডিবি এগুলোর সঙ্গে আর চুক্তি করতে চায় না।

পিডিবির তালিকা থেকে দেখা যায়, মেয়াদ শেষ হবে এমন ব্যক্তিমালিকানাধীন পাওয়ার প্ল্যান্ট (আইপিপি) রয়েছে ১৯টি। এদের উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৭৮৯ মেগাওয়াট। ভাড়াভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট (আরপিপি) বিদ্যুৎকেন্দ্র আটটি, যার উৎপাদন ক্ষমতা ৩২১ মেগাওয়াট; সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন (এআইপিপি) পাওয়ার প্ল্যান্ট চারটি, উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৯৯ মেগাওয়াট। এ ছাড়া কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে ১১টি, এদের উৎপাদন ক্ষমতা ৯৩০ মেগাওয়াট।

ইন্ডিপেনডেন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট (আইপিপি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরপিসিএলের কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট। গ্যাসভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ২০২৯ সালের ১৮ জুলাই। ৩৬০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক হরিপুর কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর, ৪৫০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক মেঘনাঘাট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর এবং ৫১ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক আশুগঞ্জ মিডল্যান্ড কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের ৬ ডিসেম্বর। এ ছাড়া গ্যাসভিত্তিক আরও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে আশুগঞ্জ মডিউলার ১৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেয়াদ শেষ হবে ২০৩০ সালের ৭ মে; ঘোড়াশাল (রিজেন্ট) ১০৮ মেগাওয়াট, মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের ১৫ জুলাই; মালঞ্চ চিটাগাং- ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মেয়াদ শেষ হবে।

ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজলংকা ৫২ মেগাওয়াট, বারাকাতুল্লা পাওয়ারের পতেঙ্গা ৫০ মেগাওয়াট, অরিয়ন কোম্পানির গঙ্গানগর ৫০ মেগাওয়াট, জাঙ্গালিয়া ৫২ মেগাওয়াট, চিটাগাং (ইসিপিভি) ১০৮ মেগাওয়াট ও কাঠপট্টি ৫১ মেগাওয়াট।

ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দাউদকান্দি ২০০ মেগাওয়াট, বাংলা ট্রাকের নোয়াপাড়া ১০০ মেগাওয়াট, এগ্রিকোর ব্রাহ্মণনগর ১০০ মেগাওয়াট, এগ্রিকোর আওয়াহাটি ১০০ মেগাওয়াট, কেরানীগঞ্জে এপিআর এনার্জির ৩০০ মেগাওয়াট, প্রামাউন্টের বাঘাবাড়ী ২০০ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে।

স্মল আইপিপির মধ্যে রয়েছে রিজেন্টের বাড়বকু- ২২ মেগাওয়াট, ডরিন পাওয়ারের ফেনী ২২ মেগাওয়াট, সামিটের জাঙ্গালিয়া ৩৩ মেগাওয়াট ও ডরিনের টঙ্গী ২২ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের মধ্যে।

রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের মধ্যে রয়েছে গ্যাসভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলোর মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হলো এনার্জি প্রিমিয়ার বগুড়া ২০ মেগাওয়াট, প্রিসিসনের আশুগঞ্জ ৫৫ মেগাওয়াট, এনার্জি প্রিমিয়ার ফেঞ্চুগঞ্জ ৪৪ মেগাওয়াট, বগুড়া ২২ মেগাওয়াট, বারাকাতুল্লার ফেঞ্চুগঞ্জ ৫১ মেগাওয়াট, শাহজীবাজার ৮৬ মেগাওয়াট, দেশ এনার্জির সিলেট ১০ মেগাওয়াট।

কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলোর অধিকাংশের মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘোড়াশাল ৭৮.৫ মেগাওয়াট, এগ্রিকোর ভোলা ৯৫ মেগাওয়াট। এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সামিটের মদনগঞ্জ ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট আইইএল ১০০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ (ডাচ্-বাংলা) ১০০ মেগাওয়াট, কেরানীগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট, খানজাহান আলীর নোয়াপাড়া ৪০ মেগাওয়াট, কেপিসিএল খুলনার ১১৫ মেগাওয়াট, আমুরা ৫০ মেগাওয়াট, নর্দান কোম্পানির কাটাখালী ৫০ মেগাওয়াট এবং একর্ন পাওয়ারের জুলদা ১০০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন কে বলেন, তেলভিত্তিক এবং ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ শেষে বন্ধ করে দেওয়া হবে। পিডিবির যে মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, এগুলো বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় অনেক বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার দরকার নেই। তিন বছরের চুক্তিতে আসা অনেক তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় নবায়ন করা হয়েছে। মেয়াদ শেষে আবার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো নবায়ন করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন করে আর কোনো বেসরকারি খাতের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়ন করা হবে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আরও অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়ার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণেই বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। সরকার তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আনতে পারছে না।

ড. শামসুল আলম বলেন, তেলভিত্তিক, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বা চুক্তি নবায়ন না করে এখন বন্ধ করে দেওয়ার সময় এসেছে। ভুল পরিকল্পনার খেসারত মানুষকে বারবার দিতে হচ্ছে। এখনো নতুন করে পুরনো কোনো ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়ন করা হচ্ছে, যা উচিত নয়।

প্রসঙ্গত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে তখন প্রচ- বিদ্যুৎ সংকট ছিল। মাত্র সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল। পরে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। টেন্ডার ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যেতে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০’ প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে বিদ্যুৎ খাতে অধিকাংশ ছোট ছোট ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে সক্ষম হয় সরকার।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, সরকার তেলভিত্তিক ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসছে। আগামী দিনে বড় বড় বেজড লোড বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও হবে সাশ্রয়ী। সরকার নিরলসভাবে চেষ্টা করছে কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে। আরও কয়েক বছর সময় লাগবে মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করতে।বিডি নিউজ

 

সর্বাধিক পঠিত