প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : ইউএনওকে লাঞ্ছিত, ডিসিকে হুঁশিয়ারি, এসব কিসের আলামত?

দীপক চৌধুরী: একশ্রেণির মানুষ মনে করেন, এ দেশটা কেবল তাদেরই। তাদের অঙ্গুলি নির্দেশে আইন চলবে। তারা আইন বানাবেন, ভাঙবেনও, কারো কিছু করার নেই। আইন মানবেন কী মানবেন না এটা যেন তাদের অভিরুচির বিষয়। কামার, কুমার, জেলে, তাঁতী, দিনমজুর ওরা মানুষ নাকি? আইন ওদের জন্য তো নয়ই। দেশটা যখন স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল তখন কিন্তু কামার অস্ত্র হাতে তুলে ধরেছিল, কুমার গুলির বস্তা পিঠে বেঁধে নিয়েছিল, তাঁতী রাইফেল পরিষ্কার করেছিল, তীব্র আপত্তির মুখে দিনমজুর তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে ঘরে তালাবন্দি করে যুদ্ধে গিয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালি যুদ্ধে নেমেছিল। মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, শহীদ হয়েছে ত্রিশ লক্ষ মানুষ। কয়েকলক্ষ মা-বোন ইজ্জত দিয়েছিল। দেড়কোটি মানুষ ভারতের ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৭১-এ দেশটা কীভাবে স্বাধীন হয়েছিল এটা আমরা সবাই জানি। কেউ বেশি জানি, কেউবা কম। অথচ যাঁর নের্তৃত্বে দেশটা স্বাধীন হলো, পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল সেই দেশে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সবাই যেন চুপ হয়ে গেল। কী নিষ্ঠুর ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত বলে যাদের জাতি জানতো, অনুগত বলে আস্থা রাখতো তারাই অর্থাৎ সেইসব আওয়ামী লীগের কুলাঙ্গারেরা শপথ নিলো খুনিদের প্লাটফর্মে। ২১ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার মাথা উঁচু করে দেশ দাঁড়িয়েছে। এরপরের বা আগের বিশাল ইতিহাস সবাই জানেন। খুব সুন্দরভাবে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই নানারকম ষড়যন্ত্র চলছে এখন। ২০১৮-এ নানারকম ষড়যন্ত্র হয়েছে। আজ অনেকে নানারকম ‘নাচাপিচা’ করছেন। আয়নায় একবার নিজেদের চেহারা দেখুন। এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা তথাকথিত জনপ্রতিনিধি হয়েই যদি মনে করেন, ‘আমি কী হনুরে?’ তাহলে সংশয় আছে! কথায় কথায় ক্ষমতা দেখানোর দিন ছোট হয়ে আসছে। একজন পাবনার বেরা উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে হুঙ্কার দিলেন। ইউএনও সাহেব কী রাজনীতি করতে গিয়েছিলেন? না, উনি দেশসেবা করতে গিয়েছিলেন। রাজনীতি তো মেয়র সাহেবই করবেন। অবশ্য, উনি আবার সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ভাই আব্দুল বাতেন। অবশ্য সেই হুঙ্কার শেষ পর্যন্ত টিকেনি। বেলুন চুপসে গেছে। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকারকে (ডিসি) চোখ রাঙিয়ে কথা না বলতে হুমকি দিয়েছেন এমপি মুজিবর রহমান নিক্সন চৌধুরী। চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন পরবর্তী বিজয় সমাবেশে যোগ দিয়ে এ হুমকি দেন নিক্সন। ডিসিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনি যত বড় উপদেষ্টার নাতি হন না কেন; আপনি নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে চোখ রাঙাইয়া কথা বলবেন না।’

গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে নিজের বক্তব্যে শুরু থেকেই নাকি বেশ কড়া কথাবার্তা বলেন নিক্সন চৌধুরী। তিনি নাকি বলেছেন, ‘প্রশাসনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ওই জেলা প্রশাসক শেখ হাসিনার চোখ ফাঁকি দিয়ে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে নৌকার কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছেন, পিটিয়েছেন। ওই জেলা প্রশাসক একজন রাজাকার। মাত্র চার ইউনিয়নে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে আমার নেতাকর্মীদের যেখানে পেয়েছেন সেখানে হামলা করেছেন, পিটিয়েছেন ডিসি।’ অথচ শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিক্সন চৌধুরীর সমর্থিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ১১ হাজারের বেশি ভোটে জয় লাভ করে। অথচ ডিসি, ইউএনও, এসিল্যাণ্ডকে সেদিন অশ্রাব্য গালিগালাজ নাকি করেছেন নিক্সন চৌধুরী। সেদিন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান দিতে শুরু করেন নিক্সনের অনুসারীরা। ওই সমাবেশের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর আজ (মঙ্গলবার) ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে উনি একদম উল্টোটাই বললেন। যারা ফরিদপুরে নিক্সন চৌধুরীর দাপট দেখেছেন তারা তো অবাক। এ কী! সারাদেশে যেখানে তাঁর বক্তব্যর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তারা অবাক এ কারণে যে, জাতীয় প্রেসক্লাবে নিক্সন চৌধুরী বলেছেন, ‘ওই ভয়েসটা আমার না’। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন। ভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানাকে (ইউএনও) গালিগালাজ করার কথা অস্বীকার করেন সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান নিক্সন চৌধুরী। তার দাবি ভাইরাল হওয়া ফোনকলের ভয়েজটি তার নয়। গত শনিবারের (১০ অক্টোবর) ভাইরাল হওয়া ফোনালাপ প্রসঙ্গে নিক্সন চৌধুরী বলেন, প্রথমে আমি এসিল্যান্ডকে ফোন করেছিলাম। তিনি আমাকে ‘আমি দেখতেছি’ বলে ফোন রেখে দেন। এরপর ফোনটা বন্ধ করে দেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নবানে তিনি দিশেহারা হওয়ার মতো চেহারা বানিয়েছিলেন। বারবার আশপাশে তাকাচ্ছিলেন। এটাকে বিকৃত বলবো না তবে ‘ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল তার চোখ-মুখ। মাঝখানে একটি কথা বলে রাখতে চাই, গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান খানকেও অশ্লীল ইঙ্গিতে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন নিক্সন চৌধুরী। তাতে এই দলে কানাঘুষা চলে। যদিও শাহজাহান খান দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। ডিসি-ইউএনওসহ নির্বাচনে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অত্যন্ত মানহানিকর ও অশ্রাব্য ভাষায় হুমকি ও গালিগালাজের কথা উল্লেখ করে বিষয়টিকে নির্বাচনী আচরণবিধির পরিপন্থী উল্লেখ করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দিয়েছেন ফরিদপুরের ডিসি অতুল সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়সহ অফিসপাড়ায়। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অত্যন্ত মানহানিকর ও অশোভন উক্তি জেলা পর্যায়ের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়কারী জেলা প্রশাসনের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের জন্য অবমাননাকর। এ ধরনের হীন বক্তব্য স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে সরকারের সাফল্য সম্পর্কে ভুল বার্তা দেবে। তেমনি মাঠ প্রশাসনের সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার পথেও চরম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান ডিসি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এ সাংবাদিককে বলেন, ‘নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য কোনোভাবেই স্থানীয় নির্বাচনে সম্পৃক্ত হতে পারেন না। এর সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সর্বত্র ভুল মেসেজ যাবে।’ দেশের স্বার্থে যিনি বা যারাই দায়ী হন তাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রয়োগ জরুরি। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তেই সম্ভব। কোনো গুজন বা ষড়যন্ত্র মানুষ গ্রহণ করবে না।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত