প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শামীম আহমেদ: এক-পিস, দুই-পিস, আস্ত!

শামীম আহমেদ: ছোটকালে ভারত বলতে বুঝতামই কোলকাতা। আর কোলকাতা মানে কিপটা মানুষের বসবাস। ভারতীয়রা একে অপরের বাসায় গেলে “দাদা খেয়ে এসেছেন, না যেয়ে খাবেন” বলে অভ্যর্থনা জানায়, এমনটা শুনেই বড় হয়েছি। একটা রসগোল্লা দিলে তারা অর্ধেকটা খায় আর বাকি অর্ধেকটা বাসায় নিয়ে যায় এমনটাও শুনেছি। সম্প্রতি বাংলাদেশের ভারতে ইলিশ রপ্তানীর সিদ্ধান্তের পর হঠাত করেই আবার কোলকাতার বাজারে ইলিশের পিস বিক্রি হয়, এই খবর নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একচোট হাসাহাসি হচ্ছে। কোলকাতার বাঙ্গালিরা কৃপণ, একটা আস্ত ইলিশ কিনে খাবার মুরোদ নেই – এমন আলোচনায় ভরে গেছে ফেইসবুক। এমন আলোচনা আগে হয়নি তা না, তবে এবারই প্রথম বাংলাদেশীদের মধ্যেই এর বিপরীত আলোচনাও দেখতে পাচ্ছি।
কোলকাতার মানুষকে সমালোচনার বিপরীতে সোচ্চার হয়েছেন কিছু বাংলাদেশীও। মূলত প্রবাসী বাংলাদেশীদের কন্ঠেই এই আলোচনা শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের বাংলাদেশীরাও কেউ কেউ যোগ দিয়েছেন।
আমি চিন্তা করছিলাম কেন প্রবাসী বাংলাদেশীরাই প্রথম এই নিয়ে উচ্চকিত হলেন। ব্যাপারটা বোঝা বেশ সহজ। দেশে থাকতে যেহেতু আমরা ‘ধার করে ঘি খাওয়া’কে বড়লোকি ভাবতাম, তাই নিজের টাকায় ইলিশ মাছে ২ পিস কেনাকে ছোটলোকি মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরে যারা থাকেন, তারা নিয়মিতই দেখে থাকবেন শত শত বিদেশী নাগরিকের এক-দুই পিস করে আলু, পেঁয়াজ কেনার দৃশ্য। সত্য বলতে কী এখনও আমি যখন ৮ কেজির চালের বস্তা কিনি, বা ১০ পাউন্ডের আলু বা পেঁয়াজের ব্যাগ কিনি, তখন ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে লজ্জাবোধ করি। ভদ্রতার কারণে কেউ এখানে মুখে প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু আমার মনে হয় যে তারা আমার বাজার করা দেখে হাসছে। এই যে ১০ পাউন্ডের আলু বা পেঁয়াজ কিনি, তার মধ্যে ন্যূনতম ১ পাউন্ড যে প্রায়ই পচে নষ্ট হয় না, তা অস্বীকার করতে পারি না। নষ্ট হয়।
এই যে বিদেশীরা অল্প করে খাবার কেনে, এটি যে শুধু অর্থ সাশ্রয় করার জন্য তা কিন্তু নয়, এটি অপ্রয়োজনীয় খাবার না consume করার জন্যও। যারা এক পিস দুই পিস করে আলু, পেঁয়াজ কেনেন, তাদের পোশাক-আশাক, কিংবা গাড়ি-বাড়ি দেখলে বুঝবেন, টাকা বাঁচানোটা এখানে মুখ্য নয়। শুধু যে আলু, পেঁয়াজ তারা এক-দুই পিস করে কেনেন তাই নয়, এখানকার গ্রোসারি স্টোরগুলোতে থরে থরে সাজানো থাকে এক পিস করে মাছের টুকরো কিংবা এক মিস চিকেনের বুকের মাংস। এইগুলো কিনেই বেশীরভাগ অভ্যস্ত। এতে করে তাদের অপচয় কম হয়, অর্থ সাশ্রয় হয় এবং শরীরও ফিট থাকে বহুবছর।
আমার এক কাজিন ছিল, খাবার টেবিলে তাকে কেউ খাবার তুলে দিতে গেলে তিনি না না করতে করতে সানন্দে প্লেট বাড়িয়ে দিতেন। ছোটকালে মুরুব্বীদের এমনটা বলতে শুনেছি, “আরে গোটা মুরগী অথবা আস্ত খাসীর রান না খেতে পারলে জামাই খাওয়ায় মজা আছে নাকি?”। আমাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে খাবার দাবার। টেবিলে ৬ পদের তরকারি না থাকলে সেই বাড়ির গিন্নীর কোন কদর নেই। পাড়ার দোকানে বাকির খাতা থাকবে। কিন্তু টেবিলে খাবার থাকতে হবে হরেক পদের।
কোলকাতার মানুষের এক পিস ইলিশ বা দুই পিস চিকেন কেনার অভ্যাসে আমার কোন মোহ নেই। বাংলাদেশীদের আস্ত খাসী কিংবা ৬টা ইলিশ একসাথে কেনায়ও আমার আপত্তি নাই। আপত্তি হচ্ছে অন্যের সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখবার প্রয়াসে। একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত বাংলাদেশী বাজার করতে গেলে প্রতিনিয়ত ছোট হবেন নিজের কাছে। ছোটকাল থেকেই বাজার করতে গিয়ে দেখেছি, দোকানির প্রথম কথা, “স্যার মুরগী কয় হালি দিমু? ইলিশ কয় জোড়া দিমু?”, সেটা মিরপুর থেকে গুলশান সব জায়গায়। আপনি যদি একটা বলেন, তাহলে সে আপনার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকাবে, আপনার মনে হবে মাটির ভিতর গুটিয়ে ঢুকে যেতে। ছোটকাল থেকেই কোলকাতার উপন্যাস বা সিরিয়াল বা সিনেমায় দেখেছি পাস করে চাকরিতে ঢুকে ৫-৭ বছরের মধ্যে সবাই নিজের গাড়ি, বাড়ি করে।
একজোড়া ইলিশের টাকা বাঁচিয়ে নিশ্চয় তা করে না, কিন্তু ছোটকাল থেকেই তাদের মধ্যে কিছু ভ্যালুজ ঢুকিয়ে দেয়া হয় যার মধ্যে বাপ-দাদার সম্পত্তি বেচে টাকার গরম দেখানো অন্তর্ভূক্ত না। যা আয় তার একটা বড় অংশ যে সাশ্রয় সেই ধারণাটা আমাদের চাইতে ওরা অনেক বেশী বোঝে।
বিদেশের রেস্তোরায় খেতে গেলে ওয়েটার এসে স্প্লিট বিল (মাথা পিছু) দ্যায়। যার খাবার, খরচ তার। দুজনেই চাকরি করে (ইমোশোনাল রিলেসনশীপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), যার খাবার খরচ সেই দিবে – এটাই স্বাভাবিক। আমি ক্যানাডায় আসার দ্বিতীয় বছর এক এমেরিকান মেয়ে আমাকে খাবার দাওয়াত দিল কেনিংস্টন মার্কেটে। দুপুরবেলা ভরপেট খাবার আর আড্ডা দেবার পর যখন ওয়েটার আসল সে বলে দিল দুটো আলাদা বিল করে দিতে, আমি যদিও ব্যাপারটা সম্পর্কে একদম অজ্ঞাত ছিলাম না, কিন্তু বেশ অবাকই হয়েছিলাম।
আমাদের উদারতা আমার ভালো লাগে। এক বন্ধু সবার খাবার খরচ দিয়ে দেয়া, কাউকে বাসায় দাওয়াত দিলে মাসের বেতনের অর্ধেক খরচ করে ফেলা – এই জিনিসগুলো করা যাবে না, এমনটা নয়। কিন্তু ওই যে মেহমানদের দাওয়াত দিয়ে আমাদের সাইডে ডেকে ছোটবেলায় বলা হতো, আগে মেহমানরা খেয়ে যাবে, তারপর তোমরা খাবে, অথবা ওদের জন্য ভালো পিসগুলো, তোমাদের জন্য যা বাঁচবে তা – এই ধারণাগুলো আমাদের দেউলিয়া করে। কোথাকার কোন মেহমানের জন্য আপনি ছেলে-মেয়ে-স্বামী-স্ত্রীকে অগ্রাহ্য করেন? রাত ৩টায় হার্ট এটাক করলে তো ওই স্বামী-স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে-বাবা-মাই হাসপাতালে নিয়ে যায়? মেহমানদের তখন পাওয়া যায় না।
কোলকাতার মানুষদের এক পিস ইলিশ মাছ খেতে দিন। পারলে আমাদের বাজারেও এই রীতি চালু করুন। গরীব রিকশাওয়ালা অথবা শ্রমিক যাতে চাইলে ছেলে-মেয়েকে একবেলা ইলিশ অথবা শুক্রবারে মুরগী খাওয়াতে পারে। রেস্তোরায় খাবার পরে বিল চাইতে বা দেখতে লজ্জা পাবেন না, ওটা আপনার টাকায় খাওয়া জিনিস। খাবার শেষ হলে যদি টেবিলে খাবার থেকে যায়, সেটা প্যাকেট করে নিয়ে আসুন, নিজে খান অথবা বাড়ির দারোয়ান, পথিমধ্যে কোন গরীব মানুষকে দেখলে তাকে দিয়ে দিন। খাবারটা আপনার গাঁটের পয়সায় কেনা, ওটা টেবিলের উপর রেখে এসে আপনি কি ওই বেয়ারাদের কাছে বড়লোকি দেখান?
আমাদের ঔদার্য হোক ক্ষমায়, মহানুভবতায়, না-পরশ্রীকাতরায়, না-গীবতে কেন্দ্রীভূত। যাদের এত সমালোচনা করি, দিনের শেষে বিয়ের বাজার বা বুকের চিকিৎসা তো তাদের কাছে না করলে চলে না? যাদের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী বিরক্তি, তাদের দেশের ভিসায় তো ভর্তি আমার-আপনার পাসপোর্ট, তাই না? ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত