প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নতুন তারিখ বসিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী আবারও বিক্রি!

সুজন কৈরী : [২] নামি-দামি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী পণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত মার্কেট থেকে সংগ্রহের পর পুরাতন তারিখ মুছে ফেলা হয়। এরপর সেখানে নতুন তারিখ বসিয়ে আবারও সরবরাহ করা হয় বিভিন্ন বিপণীবিতানে। এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে অভিযান চালিয়ে ১১ লাখ ১৫ হাজার ১০০ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধীন সামগ্রী জব্দ করা হয়।

[৩] সিআইডি বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী আইনত ধ্বংস করার কথা থাকলেও কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী তা না করে অধিক মুনাফার লোভে আংশিক দামে অসাধু সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে বিক্রি করছেন। এতে বাড়তি দামে এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি জনসাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছেন।

[৪] গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ নামী-দামি ব্রাণ্ডের বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন কসমেটিকস জব্দ করে সিআইডি। গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের সদস্য আকতার হোসেনকে (৪৮)। বাসাটি থেকে প্রসাধনীর গায়ে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য বিপুল পরিরিমাণ নকল লেবেলও জব্দ করা হয়েছে। সিআইডি জানায়, এহসান কবির (৫২) নামের আরেকজনের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী পণ্য সরবরাহ করছিলেন আকতার। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন সিআইডির এসআই সাইফুল ইসলাম।

[৬] গ্রেপ্তার আকতারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই মো. আকসাদুজ্জামান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী সামগ্রী বাজারজাতের জন্য মামলার পলাতক আসামি এহসান দীর্ঘদিন আগে আকতারের কাছে সরবরাহ করেন। তারা উভয়েই যোগসাযোশে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী সামগ্রী অসাধুভাবে মেয়াদ বাড়িয়ে তা আবারও বাজারজাত করছিলেন। এ চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার বিষয়ে জানা গেছে। তবে তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।

[৭] গত ৮ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার চকবাজারের মৌলভীবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার নকল বিদেশি কসমেটিক্স জব্দ করে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানকালে ৫ জনকে আটকের পর প্রত্যেককে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ওই সময় সারওয়ার আলম বলেছিলেন, অভিযানকালে আদালত দেখতে পেয়েছে, তিন ক্যাটাগরিতে তারা পণ্য নকল করে থাকে। প্রথমত চায়না থেকে শুধু প্রডাক্টের খালি বোতল আমদানি করে, দ্বিতীয়ত নিজেরাই বিভিন্ন কোম্পানির নামে পণ্য এবং বোতল তৈরি ও সর্বশেষ বাজার থেকে ব্যবহৃত পণ্যের খালি বোতল কিনে এনে ওয়াশ করে নকল পণ্য রিফিল করে বাজারে বিক্রি করে। অভিযানে অংশ নেয়া বিএসটিআই’র ফিল্ড অফিসার মো. শরিফ হোসেন বলেন, ফর্সাকারী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্রিম, লোশন, শ্যাম্পু, সাবানসহ প্রায় ৫০ ধরণের প্রোডাক্ট তৈরির পর বাজারজাত করা হচ্ছিলো। ফর্সাকারী ক্রিম মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলোতে হাইড্রোক্লিন এবং মার্কারি নামক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ফলে মানব দেহেও ক্ষতি হয়। সেইসঙ্গে ক্যান্সারও হতে পারে।

[৮] এর আগে গত ২৫ আগস্ট রাজধানীর ভাটারার সাঈদ নগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ নষ্ট প্রসাধনী সামগ্রী সরবরাহকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। এসপিএস কর্পোরেশন নামক একটি প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস পণ্য মেয়াদ টেম্পারিং করে আবারও বিক্রি করছিল। অভিযানকালে ইয়ার্ডলি লোশন, সাবান, পাউডার, বডি স্প্রেসহ ১০ কোটি টাকার বেশি মালামাল জব্দ করে সিআইডি। প্রসাধনীর গায়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ পরিবর্তনে ব্যবহৃত কেমিক্যাল, কালি ও একটি মেশিন উদ্ধার করা হয়।

[৯] ওই ঘটনায় ২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, বৈধ আমদানী লাইসেন্সের মাধ্যমে দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানীকৃত বিশ্বের নামী-দামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী বাংলাদেশে আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতরা এসপিএস কর্পোরেশন নামক কোম্পানি খুলে ইপরো এন্টারপ্রাইজ ও হানকেল কোম্পানির মাল বিক্রি করছিলো। এসব আমদানিকৃত পণ্য রাজধানীর গুলশান-বনানী ও উত্তরার অভিজাত এলাকার বিপণী বিতানসহ বিভিন্ন জেলা শহরগুলোর বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করা হয়। আমদানিকৃত এসব পণ্যের গায়ে প্রায় সবগুলোতেই মেয়াদউত্তীর্ণের তারিখ লেখা থাকে। সচেতন ক্রেতা সাধারণ অধিক মূল্যে বিশ্বের নামী-দামী ব্র্যান্ডের পণ্য দোকান থেকে কেনেন। অধিকাংশ সময় পণ্যের মেয়াদের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য মেয়াদের তারিখ লেখা দেখে ক্রেতারা পণ্য কেনেন। আমদানীকৃত এসব পণ্যের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর অবিক্রিত থেকে যায়।

[১০] রেজাউল হায়দার বলেন, বিএসটিআইর বিধিমালা ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব পণ্য বিক্রেতারা নিজ উদ্যোগে অথবা সরবরাহকারীর কাছে ফেরত দিয়ে ধ্বংস করে ফেলার কথা। কেননা মেয়াদোত্তীর্ণ বডি লোশন, সাবান, পাউডার কসমেটিকস পণ্য ব্যবহারে ত্বক ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি বা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল কিছু অবৈধ ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্র দোকানে থাকা এসব অবিক্রিত মেয়াদোত্তীর্ণ দেশি-বিদেশি পণ্য নামমাত্র মূলে কেনে সেগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণের সিল বিশেষ পক্রিয়ায় মুছে ফেলে। এরপর সেগুলোতে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সমমানের মেশিনের সাহায্যে আবারও ইচ্ছে অনুযায়ী নতুন মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ বসিয়ে গুলশান বনানীসহ দেশের অভিজাত এলাকায় নামী-দামী বিপণী কেন্দ্রগুলোতে বিক্রি করতো। এ কাজের জন্য আলাদা বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক মেশিনও আমদানি করেছে তারা। যার মাধ্যমে জালিয়াতি করলেও কোনোভাবে ভোক্তাদের বোঝার সুযোগ ছিল না। এসপিএস কর্পোরেশন গত ১০ বছর ধরে বিদেশি কসমেটিকস পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করছিল।

সর্বাধিক পঠিত